সংহতির রাজনীতি – গাজা থেকে আইসিস

[ Ebela, 4 Sep, 2014]

গণহত্যার ফলে যখন মানুষ মারা যায়ে, তখন ‘সন্তান মোর মার’ গোছের ভাবনার একটা দাম আছে। কিন্তু কত মানুষ মরলো, সেই সংখ্যার বিচার-ও একদম ফেলনা নয়।  তাই তো চোরাগোপ্তা হাজারো হত্যার মাঝেও জ্বলজ্বল করে কলকাতা ৪৬, নোয়াখালি ৪৬, পাঞ্জাব ৪৭, বরিশাল ৫০, দিল্লী ৮৪, গুজরাট ২০০২। গণহত্যা বা জেনোসাইড কথাটিও ঠিক যত্রতত্র ব্যবহারের জিনিস নয়।  পৃথিবীর বুকে থাকার অধিকার আছে সকলের। একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী নিকেষ হবার উপক্রম হলে শুধু কটা মানুষ হারিয়ে যায় না।  হারিয়ে যায়ে পৃথিবীকে ও জীবনকে দেখার একটি প্রণালী। হারিয়ে যায়ে মানুষ হবার নানা বিকল্প পথের একটা।  ফলে আমরা সকলে একটি মোক্ষম চেতনার একটা অংশ হারায়।  সেটা হলো – নানা ভাবে মানুষ হওয়া যায়ে।  এই যুগে যখন জামা-কাপড়-খাওয়া-দাওয়া-শিল্প-সংস্কৃতি-কথন-বলন সবই যখন বিশ্বজুড়ে একরকম হয়ে আসছে, এই চেতনাটি খুব দামি।  মানব জীবনের বৈচিত্র ওই ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’-র মত ছেলেভোলানো সরকারী স্লোগান না।  এটা মানব জাতির ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বিস্তৃত করে।
এজিদী-রা সংখ্যায় খুব বেশি নয়।  ব্রিগেডে বড় মিছিলের দিন নেতা-নেত্রীরা কত লোক এসছে, তার যে করেন , তার মতই সংখ্যা হবে তাদের। ইরাকে তাদের মূল নিবাস।  এরা ক্রিষ্ঠান বা মসলমান নন – এদের ধর্ম অতি প্রাচীন। সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়া-তে ইসলামিক স্টেট নামক জল্লাদতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে।  রক্তের হোলি খেলা এই    সন্ত্রাসী আন্দোলনের নাপসন্দ যে তাদের অধীকৃত এলাকায়ে বিধর্মী-রা বেঁচে-বর্তে থাকবেন।  তাই শুরু হয়েছে ঢালাও জবাই। এজিদী-দের, ক্রিস্টান-দের, এবং ইসলামিক স্টেট-এর সংজ্ঞায় যারা মোসলমান হয়েও ‘সহি’ মোসলমান নন, তাদের। তাদের হত্যা-লীলায়ে মৃতের সংখ্যা বেশ কয়েক হাজার।  এবং এজিদী-দের কে তারা যেমন করে  নিকেশ করছে, তা গনহত্যারই সামিল। কিন্তু এই গণহত্যার প্রতিবাদে অকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে কোনো মোমবাতি, কোনো সহমর্মিতা, কোনো ধিক্কার, কোনো দরদ ফুটে ওঠে নি। লাল-তেরঙ্গা নানা দলের গাজায়ে ইস্রাইলি আগ্রাসনের বিরোধিতা করা  হুড়োহুড়ি দেখে মনে চিন্তা জন্মায়ে।  অন্য সকল ব্যাপারে এমন নিস্তব্ধতা কেন? কোনো কোনো মৃত শিশুর ছবি কি বেশি কান্নার উদ্রেক করে? যদি তাই হয়, তবে কি সেই বেশি দুঃক্ষ ও বেশি সহমর্মিতার মাপকাঠি ?
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আমি ছাত্র ছিলাম, তখন পালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে আমাকে নানা ভাবে হেনস্থা করা হয়।  সে হেনস্থার কারণে  আমার সংহতি আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন্য একটুও আমার একটুও খেদ নেই।  অনেকে এর চেয়ে অনেক, অনেক বেশি দাম চুকিয়েছেন।  কিন্তু পালেস্তাইন সংহতির নাম তার  বিশাল বপুতে কি কি লুকিয়ে থাকে, তার খোজ নেওয়া প্রয়োজন। যদি কোনো সংহতি আন্দোলন ব্যক্তিগত জাতি, ভাষা, ধর্ম  উদ্বুদ্ধ হয় কিন্তু তা প্রকাশ্যে মানবতাবাদের নাম চালানো হয়, তখন সেই ফাঁকিটা বোঝা দরকার।  ফেইসবুক বা  টুইটার-এর কল্যাণে আমার নিরীহ অনেক পালেস্তিনীয় শিশুর বীভত্স মৃতদেহের ছবি দেখেছি।  দেখেছি ইসরাইলী হানায়ে ছিন্ন-ভিন্ন সাধারণ মানুষের ছবি, অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের। কিন্তু কোথায় নাইজেরিয়া-র বোকো হারাম বা ইরাক-সিরিয়ার ইসলামিক স্টেট-এর ততোধিক নৃশংসতার ছবি? এই একচোখামী-র একটা মানে আছে।  এতে কিছু  ধরনের মৃত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা আদায় হয়, কিছু হানাদারের প্রতি ঘৃণা উদ্রেক করানো হয় এবং কিছু ধরনের হানাদারের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকা হয়। এই চুপ থাকা অনেক কিছু বয়ান করে।
মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার হবার সময় এই বাছাবাছি, এই চিত্কার ও নিশ্চুপ থাকার আলো-আধারি খেলার তলার খেলাটা কী? তাহলে বলতেই হয়, এই মৃতের প্রতি সমমর্মিতার ব্যাপারটি ভুয়ো।  যা সত্য, তা হলো হানাদারকে আমি কতটা ঘৃণা করি সেটা প্রকাশ করতে আক্রান্ত ও মৃত-কে ব্যবহার করে।  সেই সংহতির রাজনীতি ন্যক্কারজনক।  হানাদারের  ধর্মীয়/জাতিগত/শ্রেণীগত পরিচয় দিয়ে যদি গণহত্যার জন্য কাঁদবো কি কাঁদবো না, পথে নামবো কি নামবো না, সেসব ঠিক হয়, তাহলে সমস্যা বড় ভয়ানক।  আক্রান্তের ধর্মপরিচয় , আততায়ীর ধর্মপরিচয় – এগুলি দেখে সহমর্মিতার ভঙ্গি, তা যতই সততার সঙ্গে করা হোক, অন্য ভেজালে তা ভুরভুর করে।  ছত্তিস্গরে যখন হিন্দু গ্রামবাসীরা মূলতঃ হিন্দু মিলিটারী দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন হিন্দুত্বের ঠিকাদার-দার মুখে যায়ে না কোনো প্রতিবাদ।  পাকিস্থান,আফ্ঘানিস্থান, সিরিয়া, ইরাক – এসকল জায়েগায়ে গত এক বছরে প্রায় এক লক্ষ্  মোসলমান মারা গেছেন মোসলমানের হাতে সন্ত্রাসী কায়্দায়ে।  তখন হয় না মিছিল।  হত্যালীলা যখন চালায় মূলতঃ ইহুদী ইসরাইল রাষ্ট্র-শক্তি, তখন মাথা চাড়া দেয় মানবাধিকার, সংহতি, ইত্যাদি। এই দুনম্বরিকে পষ্টাপষ্টি দুনম্বরী বলা প্রয়োজন।
গাজায়ে ঘটে যাওয়া হত্যালীলায়ে আমরা ব্যথিত।  আমরা সকলে জানি গাজার গল্প।  আমরা মন থেকেই এই আগ্রাসনকে ঘেন্না করি।  কিন্তু আমাদের এই ঘেন্না করার লিষ্টি-তে কার অগ্রাধিকার , সেটা কিন্তু ঠিক হয় অন্য কোথাও।  আমরা জাগি ঘুম থেকে, কিন্তু ঘড়ির অ্যালার্ম দেওয়া হয় অন্য কোথাও।  কিসের থেকে কি ‘বেশি’ গুরুত্বপূর্ণ, তা ঠিক করে দেয় যে বিশ্বকল্প, তা কি স্রেফ মানবতাবাদের ভিত্তিতে তৈরী? কোন মৃত্যু হয় হেডলাইন আর কোন মৃত্যু হয় সাইডলাইন? তাই ন্যুয়র্ক, লন্ডন, কলকাতা, প্যারিস – সকলে যখন জানায়ে ধিক্কার ও সমবেদনা, তলিয়ে ভাবা দরকার – কেন শুধু  এদেরকে ধিক্কার? কেন আরো বিস্তৃত নয় সমবেদনা ? পালেস্তাইন-এর মুক্তি চাই, মার্কিন সমর্থনে ইস্রাইলি আগ্রাসন মানছি না, ইত্যাদি বলা সহজ।  কঠিন হলো মানুষ হিসেবে গাজার পাশে দাড়ানোর অধিকার অর্জন করা।  ২০১৪-তেই যেসব বৃহত্তর গণহত্যার জন্য বাংলায়ে একটি মিছিল-ও হয় নি, সেই গণহত্যার শিকার যে মানুষ, তারা সেই অধিকার অর্জনের পরীক্ষা নেবে। আমরা তৈরী তো ?

1 Comment

Filed under বাংলা, Our underbellies, Power, Religion, Terror, Under the skin

One response to “সংহতির রাজনীতি – গাজা থেকে আইসিস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s