মেরী কম, তেরঙ্গা বেশি

[ Ebela, 10 Oct 2014]

জাতীয়তাবাদের মার শেষ রাতে, এমনই আমার সাম্প্রতিক উপলব্ধি । নাইটশোতে হিন্দী বই ‘মেরী কম’ শেষ  হলো ‘জনগনমন’ দিয়ে। বইটার-ই অঙ্গ – হলমালিকের অত্যুত্সাহ নয়। প্রায়ে মাঝরাতে রাষ্ট্রপ্রেম পরীক্ষা। কে দাঁড়ায়ে, কে দাঁড়ায়ে না – এই সব পায়তারা। বন্ধুর থেকে খবর পেলাম হিন্দুস্তানের রাজধানীর। সেখানে একটি সিনেমা-হলে নাকি এই দাঁড়ানো-না দাঁড়ানো কেন্দ্র করে হাতাহাতি হয়েছে।  তা ভালো।  ঘুষোঘুষি নিয়ে যে বই, তার যবনিকা মুহুর্তে কিছু মানুষের হাত নিশপিশ করতেই পারে। সেখানেই ছবির সার্থকতা। মশলাদার ডিনার খেয়ে পেট গুরগুর, হল-এ ঠায়ে বসে কোমর অবশ কিন্তু বুকে চাগার দেয়ে ‘ইন্ডিয়া’। পয়সা উসুল।

চ্যাম্পিয়ন মনিপুরি মুষ্টিযোদ্ধা মেরী কম-এর জীবনসংগ্রাম-ই ‘মেরী কম’ বই-এর মূল ব্যাপার। তাতে নানা ভাবে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গের ছোয়াচ – মনিপুরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মনিপুরীদের সঙ্গে হিন্দুস্তানিদের বৈষম্যমূলক ব্যবহার, ভারতীয় বাহিনী, মনিপুরি সন্ত্রাসবাদী ( কারুর কাছে সসস্ত্রসংগ্রামি), ইত্যাদি। ‘মেরী কম’ মালাইকারি-তে নাম চরিত্রের ব্যক্তিগত  সংগ্রাম-সংসার যদি হয় চিংড়ি, তবে এই অন্য গল্পগুলি হলো মশলা। চিংড়ি যতই ভালো হোক, মশলা ঠিকঠাক না পড়লে, ঠিক করে না কষলে, পাতে দেওয়া যায় না – বিশেষতঃ সে পাত যখন ছড়িয়ে আছে ভারত রাষ্ট্রের শহরে-গঞ্জে হলে-মাল্টিপ্লেক্সে। প্রতিদিন বলিউডের হেসেলে তৈরী খাবার হিন্দী-মাতা বেড়ে দ্যান দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার রাষ্ট্রপ্রেমী সন্তানদের পাতে । অশোক-স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো সিংহ-গুলির গায়ে গত্তি লাগে। অনেকেই এখন নানা কুইজিন আস্বাদন করতে চান – একটু মুখ বদলানো, একটু ‘বৈচিত্রের মধ্যে একতা’ আর কি । তাই জমে গেছে ‘মেরী কম’ এর গল্প – এক মেয়ের কাহিনী, এক মায়ের কাহিনী, এক স্ত্রীর কাহিনী, মনেপ্রাণে ভারতীয় এক  মণিপুরীর ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার কাহিনী, প্রান্তিক ভারতীয়তার মঞ্চের কেন্দ্রে আসার কাহিনী, দুষ্টু মেয়ে মনিপুরের সাথে ভারতমাতার মান-অভিমানের কাহিনী। ভারত রাষ্ট্র লিবারেল – এসব এখন নেওয়া যায়।  মনিপুরি-দের কথা জানিনা তবে নাগা-রা নাকি আরো কিসব খায়। সেসব হিন্দুস্তানী পাতে দেওয়া মুশকিল কারণ কিছু স্বাদ এতই ভিন্ন যে অনেক তেরঙ্গা গরম মশলা দিয়েও তা বাগে আনা যায় না। যে সাপের বিষদাঁত আছে, তাকে নিয়ে খেলা দেখানো যে বিপদজনক তা সব সাপুড়ে জানে।

‘মেরী কম’ বইতে অন্তঃসত্ত্বা নায়িকা তার স্বামীর হাত ধরে এগোচ্ছে হাসপাতালের দিকে।  প্রসব বেদনা উঠেছে।  বাইরে চলছে কারফিউ। স্ত্রী-কে একটু অপেক্ষা করতে বলে স্বামী এগিয়ে গেল। রাষ্ট্রবিরোধীদের তাড়া করতে ব্যস্ত  খাঁকি উর্দি পড়া সরকারী বাহিনীর সামনে পরে গেল স্বামী। সে জানালো তার স্ত্রীর কথা।  এক জওয়ান এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল স্ত্রী-কে – ঠিকই বলছে। যেতে দেওয়া হলো। অস্থির মণিপুরের এমন নানা কাল্পনিক খণ্ডচিত্র বারবার ফিরে আসে ‘মেরী কম’-এ। কাল্পনিক বলছি কারণ কিছু বাস্তব বড়ই অন্যরকম। সেই বাস্তবের মণিপুরে সরকারী বাহিনী ইম্ফল-এর ভিড়ের রাস্তায়  দিনে-দুপুরে সকলের সামনে চংখাম সঞ্জিতকে ঘিরে ফেলে। সঞ্জিত বাধা দেয় না। উর্দিধারীরা তাকে নিয়ে যায় রাস্তার পাশে এক ওষুধের দোকানের মধ্যে। কয়েক মিনিট  বাদে সঞ্জিতের রক্তাক্ত মৃতদেহ খাঁকি-ওয়ালারা বাইরে এনে তুলে দেয় একটা ট্রাক-এ। পুলিশ একই সঙ্গে আরেকজন যুবক-কে তাড়া করে এবং গুলি করে মারে পথচলতি রবীনা দেবীকে। রবীনা দেবীও ছিলেন অন্তঃস্বত্ত্বা। রবীনা দেবী ও সঞ্জিতের নিথর দেহদুটি ট্রাক-এ পরে থাকে পাশাপাশি।  প্রায় সিনেমার মতই এই ঘটনাটির সব মুহূর্ত  লাইভ ধারাভাষ্যের মত উঠে যায় কামেরায়ে। আগ্রহী পাঠক গুগুল দেবতার কাছে খোজ করলেই তা দেখতে পাবেন। মাল্টিপ্লেক্সে বর্ণিত অস্থির মণিপুরের যে শিশুভোলানো নকল চিত্র, তার পাল্টা এই অন্তঃসত্বার বিয়োগান্ত পরিণতি। বিশেষ সেনা ক্ষমতা আইন-এর তলায় কাঁপতে থাকা মণিপুরীর দৈনন্দিন বাঁচা ও মরার গল্পের বাজার নেই। নাকে-নল নিয়ে অনশনকারী ইরম সর্মিলার আখ্যান পপকর্নের স্বাদকে একটু তেঁতো করে দিতে পারে।আর সেন্সর-বোর্ড তো আছেই – প্রাপ্তবয়স্ক দেশবাসীকে এই অনুত্তেজক রাষ্ট্রীয় নগ্নতা থেকে বাঁচানোর জন্য। তাই খেলাধুলাই ভালো। মণিপুরী মেয়ের শত প্রতিকূলতায় ভারতীয়ত্ব প্রমানের চেষ্টা এবং আসতে আসতে ভারতমাতার পক্ষ থেকে তাকে বুকে টেনে নেওয়া।  তালি তালি। আর যারা ভারতীয় হতেই চায় না? ওদিকে যেও না ভাই ফটিংটিং-এর ভয়। তেরঙ্গা বুনয়িপ একেবারে কাঁচা খেয়ে ফেলবে – কেউ জানতেই নাও পারতে পারে।

তাই ফিরে আসি ফিলিমেই। বাঙালি বা পাঞ্জাবি অভিনেত্রী দিয়ে ‘অথেন্টিক’ সাঁওতাল বাহা বা দুলি নামানো গেছে ইষ্টিকুটুম থেকে অরণ্যের দিনরাত্রিতে। সঞ্জয় ভনশালী সেদিক থেকে অনন্য নন। তিনি ভালোই জানেন যে তার বই-এর বাজার ইন্ডিয়া নামক চড়া তেরঙ্গা এলাকায়ে, মনিপুর-মিজোরাম-নাগাল্যান্ডের মত ফিকে তেরঙ্গার দেশে নয়। বাস্তব জীবনে মণিপুরী নন ভারতীয়-বাহিনীতে কর্মরত পিতা-মাতার কন্যা প্রিয়াঙ্কা চোপরা। ‘মেরী কম’ সেজে তিনি যা আয় করেছেন, মেরী কম বক্সিং রিং-এ এতদিনে তা আয় করেননি, করতে পারবেন ও না। তবু দুচোখে স্বপ্ন থাকলে ক্ষতি কি? ঠিক যেমন ‘মেরী কম’ বইটি রিলিজ হবার দিনেই শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রিজির ভাষণ শেষে ইম্ফল থেকে তাকে প্রশ্ন করলো ১৭ বছরের এক মিজো তরুণ। আমি কি করে প্রধানমন্ত্রী হতে পারি ? প্রধানমন্ত্রিজি ইয়ার্কিছলে উপদেশ দিলেন ২০২৪-এর নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে। যে সর্বজ্ঞাত সত্য তিনি বলেননি তা হলো অশোক-স্তম্ভের রাষ্ট্রে কোন মিজোর প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব না – আজ না, কাল না, ২০২৪ এও না। তারা বরং চীনা-জাপানী টিপ্পনী শুনতে শুনতে তথাকথিত ভারতীয়ত্বের তথাকথিত মূলস্রোতে গা ভাসানোর চেষ্টা করুক। এই চেনা ছকের বাইরে গেলে যে পরিণাম খুব একটা মনোরম হয় না, তা জানেন মনোরমা। বছর ৩৪-এর থাংজাম মনোরমাকে ২০০৪-এ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আধাসামরিক বাহিনী। অনেক বুলেটে বিদ্ধ এবং পুরুষসিংহদের বীর্যমাখা মৃতদেহ পাওয়া যায় পরদিন। এর প্রতিবাদে ৩০জন মণিপুরী নারী সরকারী বাহিনীর সদরদপ্তরের সামনে উলঙ্গ হয়ে গর্জে ওঠেন – আমরা মনোরমার মা, ভারতীয় বাহিনী আমাদেরও ধর্ষণ করো। যেদেশে মনোরমার ও তার মায়েদের গল্প হিন্দুস্তানী মশলা ছাড়াই নাইট-শো তে পরিবেশিত হবে, সেই দেশের জাতীয় সংগীতের আওয়াজে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a comment

Filed under Army / police, বাংলা, Culture, Hindustan, Nation, Terror

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s