লাভ জেহাদ – তথ্য কই ?

[ ArekRakam]
অধিকাংশ মানব সমাজেই বিবাহ বা তারই কোনো অন্য সমাজ-স্বীকৃত রূপকে মানব-মানবীর প্রেমের স্থায়ী বন্ধনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ বলে মনে করা হয়।  যদিও বাজারে প্রেমে ‘অন্ধ’ হওয়ার কথাটি বেশ চালু আছে, সমাজ স্বীকৃত সম্পর্ক বা নিজেদের রেডিকাল বলে প্রচার করা মানুষদিগের তথাকথিত ‘বিকল্প’ সম্পর্ক-ধারনায় হোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার চোখ অন্ধ তো নয়,বন্ধ ও নয়।  যদি বিবাহের দিকেই তাকানো যায় , তাহলেই দেখব যে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, জাত, ভাষা অথবা এ সকল জিনিসের এক সংমিশ্রণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্পষ্ট ভাবে নির্ধারক ভূমিকা নেয়। তাদের ব্যক্তিগত আদর্শ বা চিন্তাধারার কারণে এহেন অবস্থাকে কেউ কেউ অপছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু এটাই সামাজিক বাস্তবতা।  শুধু ‘সাধারণ’ মানুষ নন, স্ব-আখ্যাত ‘অসাধারণ’ ও ‘রেডিকেল’ মানুষজনেরও যুগল ভাবনা মুখের বুলিতে যাই হোক, বাস্তবে তাদের
বাছ-বিচারেও ‘সাধারণ’-এর মাপকাঠিগুলিই প্রকট। চড়া গলায় প্রকাশ্য দ্রোহের অন্তরালে দেখা যায় যে ‘অসাধারণ’ রা আসলে সাধারণ।  ক্রিষ্ঠান ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মানো শ্বেতাঙ্গ পুরুষ-মহিলাগণ, যাদের জীবন ,
আদর্শ ও দর্শন অনেকাংশেই শহুরে দিশি ‘রেডিকেল’ দের অনুপ্রাণিত করে, সেই নরোত্তমেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই ক্রিষ্ঠীয় বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ পরিবারের কাউকেই বিবাহ করে। নানা রকম ‘কসমোপলিটান’ কল্পনার শাক দিয়ে এই মাছ ঢাকার অপচেষ্টা চললেও, এটাই ঘটনা। সংখ্যাগরিষ্ট কে লঘু করে দেখানো আর সংখ্যালঘু কেকে ফাঁপিয়ে দেখানোটা ঈসপের ল্যাজ-কাটা শেয়ালের কৌশলের অংশ।একটা জিনিস বুঝে নেওয়া দরকার। কিছু মহলে, ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা বা জাতীয়তার মানুষের মধ্যে বিবাহকে কিছুটা ‘উচ্চতর’ মর্যাদা দেওয়া হয়। যেন এগুলি সাধারণ বিবাহের থেকে একটু উচ্চকোটির জিনিস।  নিজেদের পারিবারিক
ধর্মের মানুষকেই বিবাহ করেন মানব জাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ। ভালো-মন্দ অপ্রাসঙ্গিক। এইটেই বাস্তব।
‘লাভ জেহাদ’ হলো এমন এক ঘটনা যেখানে মোসলমান পুরুষ পূর্ব-পরিকল্পিত ভাবে অ-মোসলমান নারীকে বাছাই করে, অনেক ক্ষেত্রে নিজের মোসলমান পরিচয় গোপন করে  তার সাথে  প্রেম, বিবাহ বা যৌনাচার বা সবকটিই করে শেষ অবধি তাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার উদেশ্যে বা অ-মোসলমান নারী ও তার সমাজের সম্ভ্রম-হানি ঘটানোর উদ্দেশ্যে। পাকিস্তানে (বিশেষত সিন্ধু প্রদেশে) ও ইংলন্ডে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় ইউনিয়ন-এ কেরল, কর্নাটক ও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশ  থেকে এমন কিছু ঘটনার অভিযোগ এসছে।  এই ঘটনাগুলিতে পুলিশী তদন্ত কিন্তু এমন কোনো ব্যাপক তথা পূর্বপরিকল্পিত ‘লাভ জেহাদ’-এর মত ঘটনার  প্রমাণ পায়নি।  উত্তর প্রদেশের মতো এলাকা, যেখানে সাম্প্রদায়িক রেষারেষির সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, সেখানে এই ‘লাভ জেহাদ’ নিয়ে ব্যাপক প্রচার চলেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী কিছু চক্রের সাহায্যে।
ভারতীয় ইউনিয়ন-এ যে আইন প্রচলিত আছে, তাতে কোনো মোসলমান পুরুষ-এর কোন অ-মোসলমান নারীর সাথে প্রেম বা বিবাহ করতে বাধা নেই, বাধা নেই সেই মহিলাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতেও। একই ভাবে, কোন হিন্দু পুরুষ-এরও কোন অ-হিন্দু নারীর সাথে প্রেম বা বিবাহ করতে বা ধর্মান্তরিত করানোতে বাধা নেই।  যখন এই জিনিসগুলি ঘটে, তখন খাঁটি প্রেমের কারণে হয় নাকি মনের গোপনে গোপনে তা কেউ অপর ধর্মের নারী-দের ফাঁসানোর উদেশ্যে করে, তা জানতে মনের খবর জানার যে প্রযুক্তি প্রয়োজন, তা ভাগ্যিস এখুনো কল্পবিজ্ঞানের স্তরেই আছে। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে পরিচয় গোপন করে (  উদাহরণ স্বরূপ, কোন হিন্দু পুরুষ যদি তার হিন্দু পরিচয় গোপন করে সে মোসলমান , এমন ধারণা দেয়ে কোন মোসলমান নারী-কে আকর্ষিত করতে), সে ক্ষেত্রে ব্যাপারটা জালিয়াতি বলেই গন্য করা উচিত এবং এর পিছনে অন্য অসাধু উদ্দেশ্যের কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।  যদিও এমন জালিয়াতির ঘটনা কিছু পাওয়া-ও যায়, তার ভিত্তিতে এটা বলা  সম্ভব না যে এই ঘটনা বৃহত্তর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ কি না। কিন্তু ‘লাভ জেহাদ’ নিয়ে যে উত্তেজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে পরিষ্কার তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন।  যখন তথ্য থাকে অপ্রতুল, তখন বাগাড়ম্বর, গুজব ও ঘৃণা-উদ্ভূত কল্পিত ‘তথ্য’-ই সত্যের স্থান দখল করে নেয়।  সেটা একটা বিপজ্জনক খেলা। অনেক সময় নিরীহ মানুষকে  রক্তে সে খেলার দাম চোকাতে হয়।
ভারতীয় ইউনিয়ন-এ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে অবিবাহিত যে কোন পুরুষ  বর্তমানে অবিবাহিত যে কোন মহিলাকে বিবাহ করতে পারে।  যদি কোন ধর্মের থেকে অপর ধর্মের মহিলাদের বিশেষ-ভাবে ‘টার্গেট’ না করা হয়, এ ব্যবস্থার ফলশ্রুতি হিসেবে বাস্তবে এই দেখতে পাওয়া উচিত যে হিন্দু স্বামী – মোসলমান স্ত্রী যুগলের সংখ্যা মোসলমান স্বামী – হিন্দু স্ত্রী যুগল সংখ্যার মোটামুটি কাছাকাছি। রাজ্য স্তরে বা জেলা স্তরেও এই প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া উচিত।  তার থেকেও স্থানীয় স্তর-এ সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচার করার মত সংখ্যায় তথ্য নাও থাকতে পারে।  যদি রাজ্য স্তরে বা জেলা স্তরে দেখা যায় এক ধরণের যুগলের সংখ্যার সাথে  অন্য ধরণের যুগলের সংখ্যার অনেকটা অসাম্য রয়েছে, তখন বৃহত্তর কারণের কথা ভাবতে হবে।  কিন্তু ঘটনা হলো, এসব কোন তথ্যই কারো কাছে নেই।  এমন তথ্য কেন নেই, সে প্রশ্ন করা দরকার – বিশেষত যখন এই ধরনের ব্যাপার বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এমন বিভেদকারী পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। ভারতীয় ইউনিয়ন-এ জ্ঞানীগুনী  গবেষকের কোনো অভাব নেই।  ভালো করে সমাজ-বিজ্ঞান ভিত্তিক একটা কাজ করে, জরিপ করে এগুলি জানতে পারা কি এতই শক্ত? দেশ ও দশের সামাজিক-রাজনৈতিক  জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক গবেষণাতে এহেন অনীহা এই উপমহাদেশের জ্ঞানী শ্রেনীর  সমাজ-বিচ্যুত অবস্থানের দিকেই দিক-নির্দেশ করে। অথচ টিভি তথা অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে  প্রায়শই দেখা যায় পন্ডিত ও আলোচকদের , ‘লাভ জেহাদ’ সত্য বা মিথ্যা, এই নিয়ে জোর গলায়ে দাবি রাখতে, এক তিল তথ্য প্রদান না করেও।  এটা শুধু হতাশাব্যঞ্জক নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বটে।
জনসংখ্যার ধর্মভিত্তিক অনুপাত ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, দুইই বাস্তব। গুজরাটের সুরাবর্দি এবং অধুনা ভারতীয় ইউনিয়ন-এর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক সময়  নিয়মিত ভাবে তার রাজনৈতিক জমায়েত-এ মোসলমান সম্প্রদায়-কে ব্যঙ্গ করতেন  ‘হাম পাঁচ , হামারে পচ্চিস ‘ ( আমরা পাঁচজন , আমাদের পচিসজন ) বলে।  অর্থাত , এক মোসলমান পুরুষ, তার ৪ স্ত্রী, ও তার ফলে ২৫ টি সন্তান।  এর মাধ্যমে ইসলাম স্বীকৃত ও ভারতীয় আইন স্বীকৃত  মোসলমান পুরুষের বহুবিবাহের বৈধতার দিকে যেমন খোঁচা আছে, তেমনি আছে বেশি সংখ্যক সন্তান উত্পাদনের মাধ্যমে জন-সংখ্যার ধর্মভিত্তিক অনুপাত বদলানোর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত। এই নিয়ে প্রচার ‘লাভ জেহাদ’ এর থেকে অনেক বেশি।  এই যে দাবি, যা নিয়ে প্রচার-ও বড় কম নয়, তার কি বাস্তব ভিত্তি আছে। অন্ততঃ বহুবিবাহ প্রশ্নে উত্তর স্পষ্টতই না।  কারণ এক্ষেত্রে তথ্য আছে। যতদিন আদমশুমারিতে বিবাহিত স্ত্রীর সংখ্যা গণনা করা হত, তার শেষ তথ্য ১৯৬১ সালের আদমশুমারির। তাতে আমরা কি দেখতে পাই? আমরা দেখি যে ৫.৭% মোসলমান পুরুষের একাধিক স্ত্রী আছে। অর্থাৎ মোটামুটি ২০ জন-এ ১ জন মোসলমান পুরুষের ১৯৬১ নাগাদ একাধিক স্ত্রী ছিল।  সেই একই সময়ে হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহের হার হলো ৫.৮% – অর্থাৎ মোটামুটি এক, এবং চুলচেরা বিচার করলে অতি সামান্য বেশি-ই। অর্থাৎ বাস্তব তথ্য বহুবিবাহ সংক্রান্ত  মুসলমান-বিদ্বেষী প্রচারের বিপরীত।  ঠিক এই কারণেই তথ্য প্রয়োজন, প্রয়োজন সংখ্যার – ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত, আছে না নেই, এই সব দিয়ে পরিস্থিতি বিষনোর আগে।এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো যে ১৯৫৫ অবধি হিন্দু বহুবিবাহ-ও আইনত বৈধ ছিল। আজও মোসলমান সম্প্রদায়ের বিরুধ্যে অন্য সম্প্রদায়ের থেকে বেশি হারে বহুবিবাহের অভিযোগ আনা হয় হরদম কোন তথ্যের ধার না ধেরেই।
তথ্য ভিত্তিহীন প্রচারের ভুক্তভোগী কুলীন ব্রাহ্মণেরাও।  রাজনৈতিক প্রচারে, ব্যঙ্গে এবং ‘অন্তর্জলি যাত্রা’র মতো  চলচ্চিত্রের ফলে এক ধারণা জনমানসে বেশ বদ্ধমূল।  তা হলো এক কালের  কুলীন ব্রাহ্মণ মাত্রেই বহুবিবাহ করা লোক।এ কথা সত্য যে কিছু কুলীন ব্রাহ্মণ বহুবিবাহ করতেন – তাদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ বিশাল সংখ্যায় করতেন এই কদর্য  কাজ।  এ নিয়ে বিতর্ক নেই।  কিন্তু কুলীন ব্রাহ্মণ বলতেই যে একরকম চরিত্র-অঙ্কন তার মধ্যে রয়েছে গোঁজামিল। যে সমাজে কন্যা ভ্রুণ হত্যার সুদীর্ঘ মর্মন্তুদ ইতিহাস রয়েছে এবং বিবাহে জাতের বাছ-বিচারের ফলে নিজের জাতেই বিয়ে হত কুলীন ব্রাহ্মণ-দের, সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেক্স রেসিও (অর্থাত জনসংখ্যায়  ১০০০ পুরুষ প্রতি কজন মহিলা) ১০০০-এর কম হওয়াটাই  স্বাভাবিক।  যেখানে অনেক কুলীন ব্রাহ্মণ পুরুষের স্ত্রী জতারি কথা নয় সরল সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে, সেখানে বহুবিবাহের ব্যাপক প্রসার এক কথায় অসম্ভব।  ঠিক যেমন যে কোন সমাজে একই সাথে একধিক স্ত্রী থাকার ব্যাপারটি এক ক্ষুদ্র অংশেরই আচরণ হতে পারে।  অন্যথা হওয়াটা গাণিতিক-ভাবেই দুষ্কর।
কাউকে কেউ অপছন্দ করতেই পারেন, সে মোসলমান হোক, কুলীন ব্রাহ্মণ হোক, শ্বেতাঙ্গ সাহেব হোক। কিন্তু সে ঘৃণার বর্শায়ে বিষ হিসেবে বাস্তব-ভিত্তিহীন প্রচার মাখানো অন্যায় ও পাপ।  ‘লাভ জেহাদ’ নিয়ে যে বিতর্ক, তা এই ধরনের প্রচারের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ মাত্র।  বরং প্রশ্ন উঠুক – তথ্য নেই কেন ? সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে তথ্যই তো গণ-বিতর্ক-কে শক্তিশালী করে।  অন্যথা চলে ঘৃনা-প্রতিঘৃণার এক প্রাচীন খেলা। প্রশ্ন যখন সংখ্যা নিয়ে, তথ্যই হোক হাতিয়ার। গুজবের মাঞ্জা দিয়ে একে অপরকে ভো-কাট্টা করার অপচেষ্টা বন্ধ হোক।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Community, Gender, Religion, Sex

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s