ডাক্তার ও মেরুদন্ড

ডাক্তারের অন্যতম কাজ রোগ নির্ণয়। কিন্তু এসএসকেএম হাসপাতাল-এ গত বেশ কয়দিন যাবৎ যে প্রহসন চলল, তাকে রোগ ‘আবিষ্কার’ বলা যেতে পারে। কিন্তু অচেনা ভুতের ভয় ছাড়া অন্য কোন রোগ আবিষ্কৃত হলো না। ডাক্তারবাবুরা কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। খুব চেষ্টা করেছিলেন। কি হতো যদি প্রথম দিনেই দেওয়া হত ‘ফিট’ সার্টিফিকেট? কি হারাতেন তারা? সরকারী চাকরি যা কিনা হারানোর কোন ভয় নেই – মাসে লাখটাকার অনেক বেশি মাইনে। মনুষ্যরুপী দেবতা ইমেজটা তার সাথে একদম ফ্রী। কি হারাতেন তারা যদি তারা বলতেন সূর্য্য পূব দিকে ওঠে , অথবা, যদি জানিয়ে দিতেন যে পৃথিবী সুর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে ? একটা জেলা শহরে ট্রান্সফার, খুব বেশি হলে। বঙ্গবাসীর চরম দুর্ভাগ্য যে কোন এক সুদূর অতীতের পাড়ার মেধাবী ছাত্র জেলার গর্ব বাপমায়ের আশাভরসা এককালে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক-ডাক্তারি প্রবেশিকা-ডাক্তারি পরীক্ষা সবেতে ভালো ভাবে পাশ দিয়ে অভিজ্ঞতায় নুব্জ হওয়া রত্নদের মধ্যে ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ বলার মত একটিও মানুষ পাওয়া গেল না মেডিকেল বোর্ড-এ। অথচ মালিন্গেড়িং বা রোগের নাটক করাকে কি ভাবে ধরতে হয়, তার শিক্ষা তো এমবিবিএস করার সময়েই দেওয়া হয়। এনারাই তো সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে টুক করে গাড়িতে উঠলেন। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হুশ করে বেরোলেন। চেম্বার সেরে বাড়ি ঢুকলেন। হয়ত সন্তানের সাথে চোখাচোখি হলো। সে মুহুর্তে আগামী প্রজন্মের চোখে ছোট হলেন না বড় হলেন নাকি বুদ্ধি খাটিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকলেন , ম্যানেজ দিলেন। হয়তো মনে হলো, কেউ জানতে পারল না। যে মা মুখ দেখলে বুঝে ফেলতেন মিথ্যা বলছেন কিনা, তিনি তো কবেই চোখ বুজেছেন। আর কোন সাক্ষী নেই, আয়না নেই। সভ্যতা ভুলে গেছে, মেরুদন্ডি প্রাণীর উদাহরণে একদিন কি বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মানুষের। কোন পাঠক মনে করাবেন কবির নামটা?

সত্যই কি কেউ জানতে পারল না? এই তো সেদিন অবধি মেডিকেল কলেজে ছাত্রাবস্থায় বন্দেমাতরম জয়ধ্বনী দিয়ে ছাত্রপরিষদ করছিলেন – সরকারী গান্ধীবাদের। কাজে ঢুকে হয়ে গেলেন এইচএসডি – কমরেডি কৃপা ও সান্নিধ্যের লোভে । আজকে পরিবর্তনের যুগে ‘প্রগ্রেসিভ ডক্টর’-এর অগুরু আতর গায় লাগিয়ে আবার সেটিং করে নিয়েছেন, কালকে পদ্মপাতায় নজনের মধ্যে জায়গা হবে কিনা, তার হিসেব ও করছেন আজকাল একটু-আধটু। ছাতা-জার্সি সব বদলেছেন ভয়ে ভয়ে – কখনো প্রোবেশন, কখনো প্রমোশন, কখনো ট্রান্সফার, কখনো উচ্চাকাঙ্খা, কখনো ভিজিলেন্স। খবরটা এবেলা জানিয়ে রাখি – আপনার বিশ্বরূপের সাক্ষী আছে। সেই অন্তরাত্মার মালিক সাক্ষী, এই দিন দুনিয়ার মালিক সাক্ষী, মা দূর্গা-মনসা-চন্ডি-শীতলা সাক্ষী, ধর্মঠাকুর সাক্ষী, নার্স দিদি সাক্ষী, গ্রুপ-ডি ষ্টাফ সাক্ষী, এমনকি আপনার পোষা ড্রাইভার-ও সাক্ষী – অধঃস্তন বলে সামনে কিছু বলে না। দেবতারা ডাক্তারদের খুব ভালবাসেন। নইলে প্রতিদিন পূর্বের পাপস্খালনের এত নিত্য-নৈমিত্তিক সুযোগ তৈরী করে দিতেন না তারা। ভাবেন তারা উপরে বসে ‘এবার তো সুযোগটা নে, কালি মোছ।’ দয়াময় সুযোগের পর সুযোগ দ্যান – আর সুযোগগুলি দিনের শেষে শুকিয়ে যায় উচ্ছিষ্ট ভাতের মতো। আরো টেস্ট করা দরকার – হৃদয়, মল, মুত্র। কিছু একটা পেতেই হবে, অথবা দেখাতে হবে যে পাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। সভ্যতা ভুলে গেছে, মেরুদন্ডি প্রাণীর উদাহরণে একদিন কি বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মানুষের।

মেরুদন্ডী গুরুর ছাত্র হয় মেরুদন্ডি। আর জার্সি-বদল ‘নির্বিবাদ’ ‘ঝামেলা এড়ানো’ গুরুর ছাত্র হয় কোরপান শাহ-এর হত্যাকারীরা। যারা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষটাকে অত্যাচার করে খুন করলো, তারা হত্যাকারী, তারা সংখ্যায় বেশি না , এক বাটি দুধে একটুখানি চোনা । আর যারা, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল – সেই সংখ্যাগুরু সোনার টুকরো প্রত্যক্ষদর্শিরা ? এদের তো বলতেও হবে না , ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি’। এরা এখুনি সব দেখেও না দেখতে, সব জেনেও মুখ বন্ধ রাখতে শিখে গেছে। এরা আসছে দিনে ডাক্তারী মাষ্টারমশাই হবেন। সামনের দিনে আরো দীর্ঘায়িত হবে মেডিকেল বোর্ডের রোগ-আবিষ্কার নাটক। জার্সি-বদল হবে অহোরহ। অনেকে একই জার্সি-তে নানা পতাকার তালি লাগিয়ে কাপড় সাশ্রয় করবেন। নব যুগের ফকিরী সাজ। কারণ দেড় লাখি মাইনের ডাক্তার-ও অমেরুদন্ডি হবার কারণ হিসেবে বলেন ‘পেটের দায়’। সভ্যতা ভুলে গেছে, মেরুদন্ডি প্রাণীর উদাহরণে একদিন কি বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মানুষের।

একদিন ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার পরে বাংলা থেকেই কত ডাক্তার ছুটে গেসলো, আরো পরে পাশে দাঁড়িয়েছিল কানোরিয়া জুট-আন্দোলনের। তাদেরই রেশ দেখা গেছে বন্যা-ত্রাণে, আইলায়ে, নন্দীগ্রামে। ৮০-র দশকে এই বাংলা থেকেই চিকিত্সক-রোগী উভয়ের কল্যাণের দাবি নিয়ে হয়েছিল ঐতিহাসিক জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলন। পাশে দাঁড়িয়েছিল সরকারী ডাক্তারদের অদলীয় সংগঠন। লোভ, ভয় ও হুমকি দিয়ে তত্কালীন সরকার সে সংগঠন ভাঙ্গিয়ে দলদাস ডাক্তার গোষ্ঠী গড়ে তোলে। লজ্জার ইতিহাস বেশ পুরনো। দল-দাসত্বের লাভ অনেকে কড়ায়-গন্ডায় উসুল করেছেন – সল্টলেকে প্লট নিয়ে, ট্রান্সফার আটকে দশকের পর দশক কলকাতায় থেকে গিয়ে, মেরুদন্ডি ডাক্তারদের প্রমোশন আটকে, বারবার দূরে ট্রান্সফার করিয়ে। লাল পতাকাধারী কেষ্টর সুযোগ্য উত্তরসুরী হলো সাদা কেড্স পরা তেরঙ্গা বিষ্টু। আগে পেছনে ‘স্যার স্যার’ করার জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। অথচ, মেরুদন্ডি প্রাণীর উদাহরণে একদিন কি বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মানুষের।

এই তো সেদিন, কোরপান শাহ-এর বধ্যভূমি এনআরএস-এই সূর্য্য উঠেছিল।মিথ্যা কেসে সন্ত্রাসবাদী তকমা পাওয়া ছত্তিশগড়ের আদিবাসী স্কুল-শিক্ষিকা সোনি সোরির যোনির গভীরে পাওয়া গেল পাথরের একাধিক টুকরো ও পুলিশী অত্যাচারের অনেক চিহ্ন। ফরেন্সিক ডাক্তারের রিপোর্ট বুঝিয়ে দিলো ছত্তিশগড়ের পুলিশ-গোয়েন্দারা অপরাধী, মিথ্যাবাদী, অত্যাচারী। আজ-ও এমন শিরদাড়াওয়ালা ডাক্তার থাকতে বিভুষণের শাল দেওয়া হলো দাগী আসামিকে? শাল-এর এতই আকাল ? কোরপান হত্যার নিশ্চুপ সাক্ষীদের কেউকেউ কাল ফরেন্সিক ডাক্তার হবে। তখন যোনির মধ্যে আটকে থাকা রাষ্ট্রের প্রেম-মাখা পাথরের টুকরোর খবর থাকবে কি মেডিকেল রিপোর্ট-এ ? কালকের সোনি সোরীরা, আমার বোনেরা ভায়েরা মায়েরা থার্ড ডিগ্রীর চিহ্ন নিয়ে কোথায় যাবে? আমার যে খুব ভয় করছে।

Leave a comment

Filed under Army / police, বাংলা, Bengal, Terror, Under the skin

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s