মুকুল ঝরবে?

তৃণের নানা ঋতুতে নানা রূপ। ঘোর বর্ষায় তা রসালো। মাটির সঙ্গে তার সংযোগ – মাটি থেকেই তার উদ্ভব। প্রখর গ্রীষ্মে তা শুকনো – বেড়ে ওঠার সময়ের প্রাণরস শুকিয়ে গেলে, মাটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক আলগা হলে, পড়ে থাকে হলুদ বহিরঙ্গ । শুকনো তৃণের একটি বৈশিষ্ট হলো কোথাও একটু আগুন লাগলে, তা দ্রুত ছড়ায়।  নিমেষে শুকনো তৃণের বিরাট মাঠ ছাড়খার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আগুন লাগার জন্য একটা স্ফুলিঙ্গ দরকার। বিনা আগুনে মাঠও পোড়ে না,  আবার বিনা আগুনে ছেলের বিয়েতে কোর্মা বিরিয়ানী রান্নাও হয়না। স্ফুলিঙ্গের অস্তিত্ব তাই অনেকটা বিরিয়ানীর গন্ধের মতো। যা রটে, তা কিছুটা বটে। এই কিছুটা আসলে ঠিক কতটা, নাকি অনেকটা, নাকি পুরোটাই , তা আমরা কেউ-ই জানি না। যে সকল  ঠাকুর-দেবতারা সবার  ভেতরের সব কিছু  জানেন, তারা মানুষের সাথে সচরাচর কথা বলেন না। আর যারা সংবাদমাধ্যমের কানে কানে এই ‘কতটা’র গল্প নিয়মিত চালান করেন, তারা স্রেফ ভানে দেবতা, প্রাণে আর সকলেরই মত ধান্দাবাজ মাত্র। হ্যা ভাই, দিল্লীকে স্যালুট করা ভয়-শুন্য চিত্ত উচ্চ-শীর লোকগুলি ঠিক আর বাকি সকলেরই মতো। শুধু টিকিটি অন্য জায়গায় বাঁধা, তফাত এই যা। ‘বিশেষ’ সূত্রের জনকেরা বড়ই সাধারণ।  তফাৎ নেই শিরদাঁড়ায় – সে শিরদাঁড়ার রং লাল হোক, তেরঙ্গা হোক, গেরুয়া হোক, খাঁকি হোক বা জলপাই হোক। বিশেষতঃ খাঁকি বা জলপাই-দের বিশেষ সুত্র বা ভেতরের সূত্র সাদা পোশাকের পুলিশের মতোই সততা ও সত্যতার মহান প্রতীক। তাই সাধু সাবধান।

তৃণের মাঠ পুড়ে  ছারখার হলে সেখানে স্বপ্নের নীড়  গড়ার যারা স্বপন দেখছে, তারা জানে সে শহর কলকাতার কনক্রিটের মাটির থেকে কলকাতার পাশে জলাজমি, বোজানো জলাজমি ও দখলি ফসলিজমিতেই পদ্ম ফোটার সম্ভাবনা বেশি। ঝুপড়ি-বস্তিহীন এলাকাতেই পদ্ম-তদ্ম বেশি মানায় – বিউটিতা খোলতাই হয় ।  এক সময় শিরে সংক্রান্তি হওয়াতে শহর কলকাতায় কমরেডরা আওয়াজ তুলেছিলেন – মেগাসিটি গড়বে কে? ভাগ্যিস রক্ত দিয়ে মেগাসিটি গড়া যায় না (আসলে রক্তিম ধাপ্পা দিয়ে বক্রেশ্বর-ও গড়া যায়না ওইভাবে , তবে সে অন্য প্রসঙ্গ)। মেগাসিটির অবসরপ্রাপ্ত নায়কেরা বিধান-বাবুর বস্তিহীন নগরে প্লট-টট গুছিয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আর দেকছেন, বুঝছেন, ভাবছেন – দেশ ও দশের কথা। এদিকে মেগাসিটি গড়ার জন্য রাজারহাট-এর নাম থেকে তার পরিচিতি সরিয়ে নিউটাউন হচ্ছে – যা এক-কালে হযেছিল ‘বিধান-নগর’-এ। মানুষের স্মৃতিকে ক্ষমতাবানদের বড় ভয়, বিস্মৃতি বড় ভরসা। তাই তো কলকাতা ও বিধান-নগরের সীমান্তে শানু লাহিড়ীর ‘পরমা’ ভাস্কর্যকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় অবলীলায় – সেই ভাস্কর্য যার নামে পরমা আইল্যান্ড , সেই পরমা যেখানে এসে পার্কসার্কাস থেকে ফ্লাইওভার আসছে তো আসছে, আসছে তো আসছে। ঠিক বাংলার যুব সমাজের কাছে প্রতিশ্রুত লক্ষ লক্ষ চাকরির মত, ঠিক সারদার আমানতকারীদের কাছে প্রতিশ্রুত বিপুল লাভের গুড়ের মত। পরমা নেই, আছে এক গোলক – যাতে পথচলতি মানুষ ঠিকঠাক বুঝে  নেয় বিশ্বে বাংলার স্থান ঠিক কোথায় আর লন্ডনের স্থান-ই বা কোথায় – তাদের মধ্যে দুরত্ব কতটা।  দুরত্ব কমাতে ‘কাছের মানুষ, কাজের মানুষ’রা বদ্ধপরিকর। তাই তো এই বাংলার স্বনামধন্য আপন শিল্পীর স্থাপত্য ধ্বংসের সাথেই চলছে  লন্ডনের বড় ঘরি-স্তম্ভ ‘বিগবেন’-এর  একটি চটুল নকল বানানোর অশ্লীল পরিকল্পনা। টেমস নদীর ন্যায় নদী পার হওয়া ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর মতই আসছে তো আসছে। তাই  দুধের স্বাদ  ঘোলে মেটানোর পরিকল্পনা – খালপাড়ের বিগবেন।  আমরা আশায় আশায় বাঁচি। এই আশা বা ‘হোপ’-এর বাপ হোপ ৮৬-র সম্রাট তার পুত্রের সংগ্রামী মানস-পুত্রের ঘড়িস্তম্ভের কথা শুনে বলতেন ‘বাপ কা বেটা’। কিন্তু আফশোস, দুধ হোক বা ঘোল, তার জন্য নিদেনপক্ষে গরু দরকার। যেদিন ওই নকল বিগবেন-এ বারোটার ঘন্টা বাজবে – সেদিন সকল কাগজেই আধপাতা বিজ্ঞাপন হয়ে তা জানান দেবে। বলদ বলদ-ই। গরু নয়।

মুকুল ধরতে শুরু করেছে শহরের বেঁচে থাকা কয়েকটি আমগাছে।  মুকুল যখন ধরে, তখন সারা গাছ ভরে যায়। অন্য সকল পাতা ঢেকে যায়।  দেখে মনে হয় যেন  মুকুলেরই গাছ। হুগলী  জেলায়  আমার গুষ্টির আদি ভিটা।  সেখানে আমাদের এজমালি আম-বাগান আছে।  তাই আমরা জানি যে মুকুল ধরল মানেই যে সেবার আমের ফলন ভালো হবে, এমন নয়।  মুকুল ঝরে যেতেই পারে – ভেতরের রোগে, বাইরের আবহওয়া বদলে। এই বঙ্গের ভাগ্যবিধাতারা দিল্লিতে থাকেন – তার বঙ্গের লজ্জা। এ লজ্জা অন্য সকল রাজ্যেরও। দিল্লী হতে ঠিক হয় মুকুল ঝড়বে কি ঝড়বে না।  তাই উড়ে চলো দিল্লী। বঙ্গের ভেতরে যে সারদা রোগ তা অবশ্য দিল্লীর সাহারা রোগ ও অন্যান্য মহারোগের তুলনায় নস্যি। কিন্তু রোগ রোগ-ই।  সে ক্যাঁক করে কাকে ধরবে, তা ২৭২+ এর যুগে বলা শক্ত। এখুন পর্যন্ত যাদেরকে রোগে ধরেছে, তারা কিন্তু বেজায় ভয় পেয়েছে।  আমি তো পেতাম।  তবে তাদের  সাথে আমার তুলনা চলে না।  আমি ল্যাম্প-পোস্ট ও নই। আমার পেটে লাথি  মারলেও গৌর-নিতাই ত্রিফলা বাতি জ্বলবে না। এই  সপ্তাহে আমগাছের দিকে চোখ রাখুন – মুকুল ঝড়বে না কি  ঝড়বেনা ?

তবু আমগাছের মুকুলের ঝরঝরে হবার বা ঝরে পড়ার এই দিনে যে সংগ্রামী কমরেডরা পাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন, সেই  দুর্বৃত্ত ফসিল-গুলিই গত  কয়েক দশক ধরে বলত কেন্দ্রের গা-জওয়ারীর কথা। আজ যখন দিল্লী থেকে বর্গি এসে তাদের শত্তুরকে কোণে নিয়ে গিয়ে কম্বল-ধোলাই দিচ্ছে , তখন তাদের একইসাথে হাত-তালি ও  নিস্তব্ধতাকেও মনে রাখা দরকার।  পরে কাজে দেবে। কেউ নিজে খাল কেটে আসে না – কেটে আনানো হয়। দিল্লি থেকে কলকাতা – লম্বা এই খাল। যে চির-সংগ্রামী  কমরেডরা ভাবছেন যে বাংলায় গ্রেফতার ও গুজরাতে  সাত খুন মাফের খেলায় তারা এখানে হাততালি, ওখানে গালি দিয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরবেন, তারা এই ঘোলা জলে কব্জি ডোবালেই  বুঝবেন খাল কেটে কি জীব তারা ঢোকাচ্ছেন। এখুন  তো কলির সন্ধে। আমের ফলন কেমন হবে, তা ঠিক হতে এখুন দেরি  আছে।

Leave a comment

Filed under বাংলা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s