রাম ও রামীর পয়লা ফাল্গুন

কালকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে।  আপনার জীবনে যদি প্রেম-পিরিতির কেউ থাকে এবং  নগদ টেকা-টুকা থাকে, তাহলে এটা আপনার আধুনিক  নাগরিক কর্তব্য যে আপনি কাল চকোলেট কোম্পানি, মাল্টিপ্লেক্স কোম্পানি, রেস্টুরেন্ট কোম্পানি, গ্রিটিং কার্ড কোম্পানির মতো হরেক কোম্পানিকে কাল বেশি মুনাফা দেবেন।  আপনি উত্তরাধুনিক  নাগরিক হলে দেবেন ডার্ক চকোলেট, দেখবেন আর্ট ফিলিম, দেবেন অন্যের হাতে আঁকা কার্ড।  খাবেন  রেস্টুরেন্টে কারণ কুকিং বর্জন প্রগতিশীলতার এক প্রাথমিক শর্ত। এই সকল মাজারে চাদর না চড়ালে আপনার প্রেম খাঁটি নয়। যারা নরসিংহ রাও পরবর্তী যুগে লায়েক হয়েছেন, তাদের অনেকের এতদিনে প্রতি ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে যা যা প্রেমের প্রমাণ জমেছে, তার একটা আর্কাইভ করলে বেশ একটা সমাজতাত্ত্বিক ব্যাপার হবে। কিছু ক্ষেত্রে এই উপহারের আর্কাইভ আবার অনেকের সিরিজ প্রেমের আর্কাইভ ও বটে – কে কার পেছনে কত টাকা খরচ করলো বা করলো না, স্মৃতির মনিকোঠায় সেই অনুযায়ী বরাদ্দ থাকে বর্গফুট কার্পেট-এরিয়া। হয়ত যারা কালচার-ফাল্চার স্টাডি করে শ্বেতাঙ্গদের কাছে দিশি মানুষের জীবনকে উজাগর করে নাম কামান, তারা দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু পুঁথিও লিখে ফেলবেন। আমার কথা নিশ্চই তেকেলে জ্যাঠার মতো  শোনাচ্ছে।  আমার ঠাকুরদার বাপ, আমার ঠাকুরদা, আমার বাপ – এরা সকলেই কুলের বড় ছেলে, অতয়েব নানা মানুষের জ্যাঠা। আমি এদেরই ডাইরেক্ট উত্তরসুরী। আমি মূলতঃ চট্টোপাধ্যায়।  গর্গ নামটি উছিলা মাত্র।

বাংলা জুড়েই একটি খাঁটি বাঙালি জিনিস আমার আপনার সকলের আছে। এটাকে বাংলায়ে বলে ফিলিংস। অনেকে এই মোক্ষম দিনে এহেন মোক্ষম ফিলিংস প্রকাশ করেন প্রথম বার। কে বলে যে শুধু আমরাই পাজি দেখে শুভ কাজ করি? আপনারা যারা আধুনিক-উত্তরাধুনিক – তার বেলা ? এই যে চেনা ছকে চেনা কোম্পানির চেনা উপহার দিয়ে চেনা ফিলিংস-কে দৃঢ় করা, এ কি “রিচুয়াল” না ? যত স্বকীয়তা আর স্বতস্ফুর্ততা, তা আপনাদের ক্রেতা-আচরণে? আর যত দোষ ও ব্যাকওয়ার্ড রিচুয়াল আমাদের সিন্নি চটচটে ধুনো ধূমায়িত পরিসরে ?

যখন প্রেম-পিরিতির সম্পর্কে যা গভীরত্ব জানান দিতে হয় বাজারী জিনিসপত্রের মাধ্যমে, এবং প্রেম-পিরিতির যাচাইও হয় বাজারের নিরিখে, তখন সে ভালবাসা সর্বার্থেই অর্থপূর্ণ। বাজার আজকে মোটামুটি এটা বুঝিয়ে ফেলেছে যে চাষের জন্য যেমন লাঙ্গল দরকার (বড়লোক হলে ট্রাক্টর), তেমনই ১৪ ফেব্রুয়ারী প্রেমের জন্য ফুল-চকোলেট দরকার (ধনকুবের হলে ছোট্ট হীরে)।  মনের সঙ্গে মালের এই সহজ কিন্তু কুটিল সম্পর্ক প্রথমতঃ কল্পনার শত্রু। দুইটি মানুষ যখন এই দিনকেই ইস্পেসাল করে তোলে, এই দিনেই জিনিস -প্রদান করে, তারা নিজেদের স্বকীয়তাকে গৌণ  করে দেয়। রামা-শ্যামা-যদু-মধু সকলেরই প্রেম একদিন বেশি করে জাগে, একই দিনে তারা চেনা চকে চেনা জিনিস করে, তা রাম ও রামীর অথবা রাম ও শ্যামের যে নিজস্বতা, তাকেই নস্যাত করে।  দুই প্রেমীর কাজ হয়ে যায়  গ্লোবাল সংস্কৃতির পাতায় সামান্য ফাঁকা জায়গায় নিজেদের নাম লেখা – ফিল আপ দি ব্ল্যান্ক। বাকিটা এক। কিন্তু মানুষ তো এরকম এক না। তাই পিরিতির এই ভালেন্তিনীয় প্রকাশে কোন কোন সম্ভাবনার মৃত্যু হয় ? নগদ-হীন ভালবাসা প্রকাশে কার লাভ, কার ক্ষতি? কাগজে ছাপাঅশোকস্তম্ভের সিংহের কাঁধে ভর করা এ কোন ভালবাসা ?  অশোক স্তম্ভ ছাড়া যেমন ভারত রাষ্ট্র নেই, চকলেট-খানাপিনা-সিনেমা-ফুল-গিফটের মোড়ক ছাড়ালে যেটা বাকি থাকে, সেটা কি ? এগুলি না থাকলে, কি বাকি থাকে? কাদের ক্ষেত্রে বাকি থাকে, কাদের ক্ষেত্রে থাকে না ? এগুলি স্রেফ প্রশ্ন।  কার ভালবাসা খাঁটি আর কারটা মাটি , সেটা মাপার  জ্ঞান আমার নেই। তবে গদাধর চট্টোপাধ্যায় বলে গেছেন – টাকা মাটি, মাটি টাকা। মা সারদা আজকাল টাকার ব্যাপারে কম বলছেন, মাটি নিয়েই মনোযোগ বেশি। মার্কিন দেশে ২০১৩-তে একেকজন মানুষ গড়ে ৭৮০০ টাকা খরচা করেছেন ভালেন্টাইনস ডে  বাবদ। যদি মার্কিনি হয়োনের শখ থেকে থাকে, তালে ওই ৭৮০০ সংখ্যাটিকে পাখির চোখ মনে করে এগিয়ে চলুন। খ্রিষ্টীয় সন্ত ভালেন্টাইন আপনার সহায় হোন।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমাদের বাংলাদেশের জনজীবনে, বিশেষতঃ শহুরে এলাকায় একটা জায়গা করে নিয়েছে।  জায়গা করে নিয়েছে আরো অনেক কিছুই।  এসবের ক্ষেত্রে একটা কথা খুব শোনা যায়।  চয়েস।  আমি যা চাইব। আমি চাই ভ্যালেন্টাইন্স ডে – এটা আমার চয়েস।  ভালো কথা।  কিন্তু চয়েস বা বাচাবাচির মধ্যে  যা বাছা হয়, তা যাপনে হোক, ভাষায় হোক, বসনে হোক, দিবসে হোক – তার ভৌগোলিক উত্পত্তিস্থল যদি পৃথিবীতে সংখ্যালঘু যে শ্বেতাঙ্গ মানুষজন, তাদের  এলাকা থেকেই আগাপাশতলা আমদানি করা হয়, তাহলে চয়েস আসলে বাড়ে, না কমে ?  বিশ্বায়নের ফলে তো আমাদের  বিশ্ব আরো ব্যাপ্ত হবার কথা ছিল – বসনে, ভূষণে, ভাষায় সবেতে বৈচিত্র বাড়ার কথা ছিল।  তাই না ? গলদটা কোথায়?  তার জন্য হয়ত আমাদের এই ১৪ ফেব্রুয়ারির বাংলায় আমদানির গল্পটি জানতে হবে, সেই আমদানির ফড়েদের কথা জানতে হবে, আমাদের কল্পনা ও ফিলিংস কেমনে  শ্বেতাঙ্গ পপ-কালচারের গারদে আটকা পড়ল, সেটা একটু ভাবতে হবে। শ্বেতাঙ্গ আক্সেন্ট ও জোক্স মুখস্ত করতে করতে আমরা আমাদের বগল ও কুঁচকি দেখতেই ভুলে গেছি। ময়লা জমবেই।  তখন সেন্ট যদি আমদানি করতে হয়, সায়েবের কি দোষ ?

আমি যখন মার্কিন দেশে থাকতাম, তখন ১৪ ফেব্রুয়ারীকে কেন্দ্র করে নানা জিনিস নতুন মোড়কে পাওয়া যেত।  ১8 তারিখ কাটলেই সেগুলির দাম হয়ে যেত অর্ধেক।  আধুনিক ও উত্তর-আধুনিকদের  বিশ্বেও  তিথি অনুযায়ী জিনিসের দর বারে কমে, ঠিক কোজাগরী লক্ষী পুজোর দিনে সবজির মত। এবার ভ্যালেন্টাইন্স পড়েছে পয়লা ফাল্গুনে।  শুনতে কি বোরিং লাগছে না? পয়লা ফাল্গুন আর ১৪ ফেব্রুয়ারী কি এক হলো ?

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Community, Culture, Language, Sahib

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s