গোবিন্দ হালদারের নিষিদ্ধ ফিসফিস

সে যতই দেখনদারী হোক, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর ওপার বাংলায় যাত্রার ফলে কিছু সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে – যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই একটি জাতির দুই বিভক্ত অংশের একে অপরের দিকে নতুন করে তাকানো। এই বিভক্তির কারণের মধ্যে, তার ঠিক-ভুলের মধ্যে না গিয়েও একটা কথা বলা যায়। দেশভাগ ও তার পরেও ঘটতে থাকা খুন-ধর্ষণ-ধর্মান্তরকরণ-লুঠ-ঘরপোড়ানো-সম্পত্তিদখল ইত্যাদি ভয়ানকের অপরাধের শাস্তি হয়নি, এপারেও – ওপারেও। এই আদি পেপার বোঝা সুদে-আসলে এতই ভারী যে মানুষ সেই বোঝাকে ফেলে দিয়ে ভুলেই গেছে পাপের কথা। প্রায়শ্চিত্ত তো দূরস্থান।

১৯৪৭-এর বাংলা-ভাগের সাথে ব্রিটিশদের দ্বারা উপমহাদেশের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলির হাতে যে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল, আজকের ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন, পাকিস্তান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এক অর্থে তার-ই ফসল। এই ভাগের সাথে সাথেই ‘আমরা’ কারা ,’বন্ধু’ কারা ’, ‘শত্রু’ কারা- এগুলির নানা মিথ রচনার বীজ পোঁতা হয়, যার থেকে বেরোনো মহীরুহ আজকের দিনে আমাদের মনকে, আমাদের কল্পনাকে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। নতুন রাষ্ট্রের পেটের গভীর থেকে জন্মানো এই কল্পকাহিনীগুলি যে আজ পবিত্র সত্যের স্থান নিয়েছে, তা শুধু গল্পের ভাবের জোরে নয়। সরকারী প্রচার এবং সরকারী বাহিনী, ঘুষ ও শাসানি, আঁচড় ও আদর, পুরস্কার ও থার্ড ডিগ্রী, জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও মিথ্যা মামলায় হাজতবাসের এক অসামান্য সংমিশ্রনেই আজকের পবিত্রতা, সংহতি, ‘বিকাশ’, রাষ্ট্রপ্রেমের জন্ম (দেশপ্রেমের নয়)। সাবালক এই সব বিষবৃক্ষের রসালো ফলের আমার দৈনিক কাস্টমার। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে, আমাদের স্বকীয় আত্মপরিচিতকে পিটিয়ে পিটিয়ে রাষ্ট্রীয় ছাঁচে ঢোকানো হয়েছে দিল্লী, ইসলামাবাদ ও ঢাকার মাতব্বরদের স্বার্থে। মানুষের আত্মাকে কেটে সাইজ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার জুজু দেখিয়ে। এই পাপ বঙ্গোপসাগরের থেকেও গভীর।

আমাদের কল্পনা ও স্মৃতির অগভীরতার কারণে আমরা মনে করি যে এক রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বোধয় দৈব নির্ধারিত কোন ‘প্রাকৃতিক’ নিয়ম যা না মানলে আমরা দুনম্বরী বিশ্বাসঘাতক মানুষ। যাদের আনুগত্য, টান ও ভালবাসা রাষ্ট্র-সীমান্ত পেরোলে ঝুপ করে উবে যায় না, তারা বুঝিবা মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং রাষ্ট্রের চোখে নেমকহারাম। রোজ এই ধারণাগুলিকে বিনা বাক্যে মেনে দিয়ে আমরা আমাদের এই মর্ত্যলোকে স্বল্প সময়ের জীবনকে করে তুলি ঘৃণাময়, ভীতিময়, কুঁকড়ে থাকা। ১৯৭১-এ কিছু সময়ের জন্য পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের সময়ে এপার বাংলায় এরকম অনেক তথাকথিত বিকার চোরাগলি ছেড়ে রাজপথে মুখ দেখানোর সাহস ও সুযোগ পেয়েছিল। এ সত্যি যে ১৯৭১-এ ইন্ডিয়ান উনীয়নের নানা এলাকায় পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সমর্থন ও সাহায্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম বাংলায় এই সাহায্যের আড়ালে যে আবেগের প্রকাশ ঘটেছিল, তা আজকের ডেটল-ধোয়া ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্রাষ্ট্রিক সম্পর্কের পবিত্র গণ্ডির বাইরের এক প্রায়-নিষিদ্ধ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের সাথে পূর্ববঙ্গের যে একাত্তুরে ‘ঘনিষ্টতা’, তার সাথে কর্ণাটকের সাথে পশ্চিমবঙ্গের ঘনিষ্টতা বা কর্ণাটকের সাথে পূর্ববঙ্গের ঘনিষ্টতার কোন মিল নেই। এই মিল-অমিলের অঙ্ক মেলাতেই তো ঘনঘন বেজে ওঠে জাতীয় সঙ্গীত, যাতে এরম চিন্তা গুলিয়ে যায় মিলিটারি ব্যান্ডের আওয়াজে। দিল্লি-ও একাত্তরে ভালই জানত এসব ‘নিষিদ্ধ’ প্রেমের কথা – কিন্তু এই প্রেম তখন তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পক্ষে কাজ করেছিল বলে বাড়তে দিয়েছিল কিছুদিন অন্যদিকে তাকুয়ে, তারপর রাশ টেনে সমঝে দিয়েছিল সময়মত। এই আচরণেরও অন্য উদাহরণ আছে। যেমন তামিল নাদুর বিধানসভায় শ্রীলংকার ইলম তামিলদের সমর্থনে যেসব প্রস্তাব পাশ হয়, তা নিয়ে দিল্লীর নিস্তব্ধতা – যেন দেখেও দেখছে না। যেমন কাবুল ও পেশোওয়ারের মধ্যে যে ঠান্ডা-গরম পাখতুন বন্ধন ও তা নিয়ে আজকে ইসলামাবাদের চাপা ভীতি।

১৯৭১ অবশ্যই অতীত। সেই ‘নিষিদ্ধ’ প্রেম আমরা কবে বন্ধক দিয়েছি বেঙ্গালোর-দিল্লী-নয়ডা-গুরগাঁও স্বপ্নে বিভোর হয়ে। তাই তো আজ, আমরা, এই বাংলায়, দিল্লির থেকে ধার করা চশমায় পূব দিকে তাকাই আর দেখি – গরুপাচারকারীর মুখ, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর মিছিল, হিন্দু বাঙালির শেষ আশ্রয়স্থল হোমল্যান্ডটিকেও জনসংখ্যার বিন্যাসে কেড়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র। এই সবই কিছু ঠিক, কিছু ভুল, কিন্তু সেসব ঠিক-ভুলের পরেও মধ্যে লুটোয় দিগন্তজোড়া বাংলাদেশের মাঠ, যে মাঠ শুধু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাঠ নয়, বরং নিখিল বাংলাদেশের মাঠ। সে উত্তরাধিকার আজ প্রায় তামাদি।

বিগতকালের এই যে সম্পর্ক, যার শেষ প্রতিভুদের একজন এই গোবিন্দ হালদার। একরাষ্ট্রের আনুগত্যে বাঁধা আমরা, তাই এ প্রেমের কথা কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার পায় না। এ সম্পর্ক – তা ঠিক পরকীয়া নয়, বরং এমন এক প্রেম যার শুরুর পরে প্রেমিক হয়েছে বিভাজিত। আর প্রেমিকার প্রেম থেকে গেছে একইরকম। কিন্ত অন্যের চোখে সে দুই প্রেমিকের প্রেমিকা, এবং কলঙ্কিনী। এমনই এক প্রেমিকা ছিলেন গোবিন্দ হালদার। গত ১৭ জানুয়ারী, ৮৪ বছর বয়সে মারা গেলেন অতি সাধারণ এক হাসপাতালে। অবিভক্ত যশোর জেলার বনগাঁ এলাকায় জন্ম।বনগাঁ ‘পড়ে’ ‘ইন্ডিয়ায়’।আকাশবাণীর জন্য গান লিখেছেন। একাত্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল আকাশবাণী কলকাতা। পরে যুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য প্রচুর গান লেখেন যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ও পূর্ব বাংলার জনগণের মুখের গান, প্রাণের গান হয়ে ওঠে। মোরা একটি ফুল বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, পূর্ব দিগন্তে সূর্য্য উঠেছে রক্ত লাল, পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা – এগুলি তার প্রবাদপ্রতিম রচনা। শ্রোতার ভোটে তৈরী বিবিসি রেডিওর সর্বকালের সেরা ১০টি বাংলা গানের তালিকায় তার দুটি গান উপস্থিত। এই লোকটি মারা গেল, কোন বঙ্গশ্রী, পদ্মশ্রী ছাড়াই। আসলে সে ঠিক গান লিখেছিল ‘ভুল’ রাষ্ট্রের জন্য। তাই এপারে তার কল্কে নেই। আমাদের মধ্যেই ছিলেন এতদিন। জানতে চেষ্টাও করিনি, কারণ রাষ্ট্রর ক্ষমতা যত বেড়েছে, তা আমাদের মানুষ হিসেবে ছোট করে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-ও একাত্তরে গোবিন্দ হালদারের নাম ফলাও করত না – সে ‘ভুল’ রাষ্ট্রের যে। পরে ঋণ শোধের চেষ্টা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিত্সার খরচ পাঠিয়েছেন, সরকার পুরস্কৃত করেছেন, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কলকাতায় মৃত্যুপথযাত্রী গোবিন্দ হালদারকে দেখে গেছেন। আমার কাছে একটা ছবি আছে – বৃদ্ধ গোবিন্দ হালদার বাংলাদেশের পতাকা নিজের বুকের কাছে ধরে আছেন। পার্টিশন এলাকার যারা নন, একদেশ-একজাতি-একরাষ্ট্র রাষ্ট্রের গর্বে বলিয়ান যারা, হয়ত ভাগ্যশালী তারা,কিন্তু তাদের কি করে বোঝাব এসব ? হয়ত তারা বুঝবে পরজনমে, রাধা হয়ে। তখুন হয়তো তারা অনুভব করবে গোবিন্দ হালদারদের দেশের ঠিকানা।

কেউ কেউ কিন্তু তলে তলে বোঝে। ঢাকার অভিজিত রায় – খ্যাতিমান মুক্তমনা ব্লগার। ২৬ তারিখে , একুশে বইমেলা থেকে ফেরত আসার সময়ে তাকে রামদা দিয়ে হত্যা করা হলো। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। দায় নিয়েছে ইসলামী সংগঠন আনসার বাংলা-৭। প্রতিবাদে এ বাংলার কিছু মানুষ ২৭এই কিন্তু জমায়েত করলেন যাদবপুরে। নিষিদ্ধ প্রেম পরিণত হয় নিষিদ্ধ কান্নায়, কাঁটাতার ভেদী শপথে, চোরাগোপ্তা। সব রং তেরঙ্গায় নেই।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Culture, Delhi Durbar, Dhaka, Foundational myths, Kolkata, Language, Nation, Open futures

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s