আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের দেশ, এবং আমাদের সংগ্রামে আজ অবধি গড়ে তোলা যা যা আছে

জুলাই মাসের প্রথম দিকটি মণিপুরের ইম্ফল এলাকায় চলল টানা গণ-আন্দোলন। গণ-আন্দোলনের প্রত্যুত্তরে ভারতে রাষ্ট্র-যন্ত্র মণিপুর বা কাশ্মীর গোছের এলাকায় যা করতে অভ্যস্ত, তাই করলো। অর্থাৎ কারফিউ জারি করলো, নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের সশস্ত্র রাষ্ট্র-শক্তি বেধড়ক মার দিলো দিনের পর দিন, একজন তরুণ আন্দোলনকারী যার নাম রবিনহুড, তাকে গুলি করে পুলিশ হত্যাও করলো। মণিপুরের এই আন্দোলনের একদম সামনের সারিতে রয়েছে হাজার হাজার রাজনৈতিক চেতনা-সম্পন্ন স্কুল ছাত্র-ছাত্রী। তারা পুলিশের মার খেয়েও নিজেদের জাতির ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব-রক্ষার দাবি, অর্থাৎ ‘ইনার লাইন পারমিট’ প্রচলনের দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। যখন ‘ইন্ডিয়া’র ‘কুল ও ট্রেন্ডি’ টিনেজারেরা তাদের ‘এস্পিরেসনাল’ বাপ-মায়ের সুশিক্ষায় ‘পার্সোনাল স্পেইস’, ‘টিম ইন্ডিয়া’ এবং মল-মাল্টিপ্লেক্সে বিভোর থেকে তাদের সমাজ-সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে, ঠিক তখুনই তাদের মণিপুরী ভাই-বোনেরা জানান দিচ্ছে যে তারা অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। মণিপুরী কিশোর-সমাজের এই রাজনৈতিক ভাবে পরিপক্ক ও বিস্ফোরক আন্দোলন নিয়ে আমাদের কিসুই আসে যায় না কারণ, এক, মণিপুরে যে কিছু ঘটছে, সেটাই আমাদের ভাবনার মধ্যে নেই, দুই, ‘ইনার লাইন পারমিট’ জিনিসটি কি, তা আমরা জানিনা, তিন, এতে ভারতীয়ত্বের কোন নামগন্ধ নেই, তেরঙ্গা দ্বিচারিতাও নেই, মোমবাতি নেই, সেলফি তোলার সুযোগ নেই। অতয়েব আমরা এতে নেই। তবু একটু খোঁজ নেওয়াই যাক না, কেসটা কি।  কারণ স্কুল-ছাত্র রবিনহুডকে খুন করা হলো যে ‘আইনরক্ষা’র নাম, সে আইন তো আমার-আপনার সম্মতিতে তৈরী বলেই বৈধতা দাবি করে।

ইনার লাইন পারমিট বা আই.এল.পি হলো অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড (ডিমাপুর বাদে) এবং মিজোরামে ঢোকার জন্য এইসব এলাকার বাইরের ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আবশ্যিক একটি সরকারী ছাড়পত্র। এই আন্দোলন মণিপুরেও আই.এল.পি প্রবর্তনের দাবিতে, যার নেতৃত্বে রয়েছে জয়েন্ট  কমিটি অন আই.এল.পি সিস্টেম নামক দোল-নিরপেক্ষ নাগরিক-রাজনৈতিক জোট। আজকে যে অঞ্চল ‘উত্তর-পূর্ব্ব’ নামে পরিচিত, উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ফিরিঙ্গিরা এই এলাকার স্বাধীন রাজ্যগুলিকে দখল করছিল এবং তাদের তৈরী ইন্ডিয়া-র মধ্যে সেগুলিকে জুড়ে দিচ্ছিল নানা অসৎ উছিলায়। যেহেতু এই এলাকায় স্বাধীন অসম-কে দখল করে  সেখানে চা সমেত নানা ব্যবসা শুরু করলো ফিরিঙ্গিরা, তাদের এই ধান্দাকে সুরক্ষিত করতে তারা আনলো আই.এল.পি।  এর ফলে অসমকে ঘিরে থাকা এলাকার (অর্থাৎ আজকের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম) মধ্যে বাইরের কেউ শুধু অনুমতি সাপেক্ষে ঢুকতে পারতো। ওই এলাকার মানুষজন মোটামুটি স্বায়ত্ত-শাসন-ই চালাত ( যা ছিল বাংলা বা বিহারের মতো সোজাসুজি ভাবে ফিরিঙ্গি-শাসিত এলাকায় কল্পনাতীত), দিল্লী বা লন্ডনের নাক গলানো ছিল নগন্য। বদলে ওই এলাকার রাজ্য তথা জন-গোষ্ঠীগুলিও অসমে ঢুকে পড়ত না এবং ফিরিঙ্গি সরকারের জন্য নিরাপত্তা খাতে খরচা ও মাথাব্যথা কমে গেছিল।  এর ফলে অসমে অর্থনৈতিক মুনাফা প্রকল্পে ফিরিঙ্গিরা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পেরেছিল। এই এলাকারগুলির ‘স্বরাজ’ অবলুপ্ত হলো ১৯৪৭-এ দিল্লী-রাজ শুরু হবার পর থেকে। ১৯৪৯-এ মণিপুরের অনির্বাচিত মহারাজা-কে শিলং-এ গৃহ-বন্দী করে, ভারতীয় বাহিনীর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন করিয়ে ভারতের মধ্যে মনিপুর-কে জুড়ে দেবার চুক্তিপত্রে একপ্রকার তার পূর্ণ সম্মতি ছাড়াই সই আদায় করা হয়। অথচ এই সময়ে মণিপুরে জনগণের দ্বারা অবাধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত একটি সার্বভৌম সরকার বর্তমান ছিল, যারা কিনা সম্পূর্ণ-ভাবে মনিপুরের আলাদা অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষপাতি ছিল। সেই  নির্বাচনে ভারত-পন্থী কংগ্রেসীরা লড়েছিল কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। প্রজা শান্তি দলের নেতৃত্বে, কংগ্রেসকে পর্যদুস্ত করে গড়ে উঠেছিল সেই মণিপুর সরকার – মহারাজা ছিল স্রেফ আনুষ্ঠানিক প্রধান।যেহেতু নেহরুর ভারত ছিল প্রবলভাবে গণতান্ত্রিক, তাই তারা মনিপুরকে জুড়ে নেবার সাথেই সাথেই মনিপুর-বাসীদের নির্বাচিত নিজস্ব সরকারকে বরখাস্ত করে দেয় ! আফ্স্পার মাধ্যমে মিলিটারি শাসনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই নয়া গনত্রন্ত্র এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে, ‘এনকাউন্টার’ খুনের নিরালা পরিবেশে খাকি উর্দির কঠিন নজরদারিতে।

মণিপুরে আগে থেকে আই.এল.পি নেই কারণ এই রাজ্য কখুনো ফিরিঙ্গী শাসনাধীন ছিল না। যে সময়ে ফিরিঙ্গিরা এই এলাকায় তাদের দখলদারি ও শাসন বাড়িয়ে তুলছিল, মণিপুরের  সার্বভৌম মহারাজারা ছলে-বলে-কৌশলে ফিরিঙ্গিদের ‘ইন্ডিয়া’ উপনিবেশ থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখতে পেরেছিল, পেরেছিল নিজেদের বহু-শতাব্দীর রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র। মনিপুরীদের নিজভুমে বাইরের কে প্রবেশ করবে-না করবে, এটা ঠিক করার প্রায় নিরঙ্কুশ অধিকার-ও ছিল মনিপুরি-দের। ফলে মনিপুরের জন-গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতাগত ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বগুলিও মুছে যায়নি। কিন্তু ১৯৪৯-এ ইন্ডিয়া-তে জুড়ে যাওয়ার ফলে, মণিপুরীদের এই বাইরের লোকের ঢোকাকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধিকার আর রইলো না। তাই এই আই.এল.পি প্রবর্তনের দাবীর মূলে আছে মনিপুরের নিজস্ব জনগষ্ঠিগুলির নিজেদের পারম্পরিক আবাদভুমি তথা জন্মভূমিকে নিজেদের জন্য রক্ষা করার স্বাভাবিক বাসনা। তার কারণ, ইন্ডিয়ার মধ্যে বিলয়ের ফলে বাইরে থেকে আসা বিশাল সংখ্যক মানুষের ভিড়ে নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাবার আশঙ্কাটা একদমই অমূলক নয়। উত্তর প্রদেশের জনসংখ্যা মণিপুরের থেকে ৭৫ গুণ বেশি। ইতিমধ্যেই ইম্ফল উপত্যকায় মণিপুরী ও বহিরাগতের সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কাশ্মীর থেকে কন্যা-কুমারী, আমরা সকলে ভারতীয়, এই বহুল-প্রচারিত স্লোগানটা কি সত্যি নয়? আমরা সকলে এক জাতীয় হই বা না হই, যেটা একদম নিশ্চিত সেটা হলে যে আমরা সকলে একই রাষ্ট্রে সহ-নাগরিক। নতুন দিল্লীর কিশোর-যুব সমাজের যেমন নিরাপদ-ভাবে নির্ভয়ে জীবন কাটানোর স্বাধীনতা আছে,  মণিপুরী কিশোর-যুবসমাজের একই-রকম স্বাধীনতা নেই। কেন তাদের সে স্বাধীনতা নেই, তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করলে ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্র সম্বন্ধে কিছু অপ্রিয় সত্যপ্রকাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে।  ওদিকে না যাওয়াই ভালো। পাঠকদের শুধু এটা লক্ষ্য করতে বলি যে দেখবেন ভারতের ‘জাতীয়’ মিডিয়া দিল্লীতে মনিপুরি যুবদের উপর হয়রানির ঘটনা নিয়ে যতটা প্রচার করে,আসল মনিপুরের মণিপুরী যুবসমাজদের জীবনের  দৈনিক ত্রাস ও লাঞ্চনাকে নিয়ে তার সিকিভাগ-ও করে না। করা সম্ভব না। দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

সাম্প্রতিক অতীতেও নিজভূম নিয়ে ব্যাপক অর্থে স্বতন্ত্র ছিল, এমন জাতি-গোষ্ঠীর পক্ষে হঠাত করে কোন বৃহত্তর ব্যবস্থার মধ্যে ‘ক্ষুদ্র’ স্থান পাওয়া বা নিজভূমে সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়াকে খুব সহজ-ভাবে নেওয়া সম্ভব না।  এমনটাই স্বাভাবিক। ভারত-রাষ্ট্রের মধ্যে নানা জাতীয়তার মধ্যে বহিরাগত জনস্রোতের ফলে নিজভূমে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার বাস্তব উদ্বেগ-কে ভারতের সংবিধান সাধারনতঃ কোন স্বীকৃতি দেয় না। কিন্তু তাই বলে উদ্বেগ-গুলি উবে যায় না, বিশেষতঃ যখন কাশ্মীর  থেকে কন্যাকুমারী অবধি বিস্তীর্ণ ভূখন্ডের বিভিন্ন এলাকায় মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা, কাজের সুযোগ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ইত্যাদি বিশাল তারতম্য আছে। অন্গামী জাফু ফিজো, প্রবাদ-প্রতিম নাগা জননেতা, ১৯৫১তে বৃহৎ জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতের মধ্যে নাগাদের নিজস্ব আবাদ-ভূমির সন্ত্রস্ত অবস্থার প্রসঙ্গে বলেছিলেন ,’আমরা খুব সহজেই ডুবে যেতে পারি, হারিয়ে যেতে পারি : আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সভ্যতা, আমাদের প্রতিষ্ঠান, আমাদের দেশ, এবং আমাদের সংগ্রামে আজ অবধি গড়ে তোলা যা যা আছে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তাতে মানবসমাজের সামান্যতম উপকার-ও হবে না’। কেউ নিজেদের পারম্পরিক আবাদভূমিতে প্রান্তিক হয়ে উঠতে চায় না। আজ বৃহৎ জাতীয়তার সামনে  ক্ষুদ্র জাতীয়তার ক্রমশঃ বিলীন হয়ে যাবার সংকটময় সময়ে  হয়তো কোথাও ফিজোর ঘোষণায় নিহিত বহুত্ববাদী ধারণা, অর্থাৎ সকল জাতীয়তার ও জাতি-গোষ্টির নিজ এলাকায় নিজেদের মত বাঁচার অধিকার নিয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তা করার দরকার আছে। বাংলায় বা তামিলনাডুতে কি যথাক্রমে বাঙ্গালীরা বা তামিলরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবার কথা কল্পনাতেও আনতে পারে? তা কি কখুনো মঙ্গলময় হতে পারে? এমন যদি কখুনো ঘটে, তার প্রতিক্রিয়ায় কি ধরনের শক্তির উন্মেষ ঘটবে, আমাদের কোন ধারণা আছে ? কোন জাতি-কে এমন ভাবে কোণঠাসা করা অনুচিত। তাই মণিপুরে আই.এল.পি দাবি এক ন্যায্য দাবী।

1 Comment

Filed under বাংলা, Delhi Durbar, Democracy, Foundational myths, India, Media

One response to “আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের দেশ, এবং আমাদের সংগ্রামে আজ অবধি গড়ে তোলা যা যা আছে

  1. হীরেন সিং মীতৈ

    আপনার লেখাটি পড়ে আপনার প্রতি আমার কৃতগ্জ্ঞতাবোধ জন্ম নিয়েছে এই জন্যে যে আপনি অমণিপুরী হয়েও মণিপুরীদের দাবির যৌক্তিকতা ঊপলব্ধি করতে পেরেছেন যা আপনার এই বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে ৷ আপনাকে মণিপুরীদের পক্ষ থেকে আমি সাধুবাদ জানাই ৷

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s