এই বাংলায় মায়ের দুটি পা, গরুর চারটে

অনেকে হয়তো এই লেখাটি সকালে কাজে যেতে যেতে বাসে-ট্রামে-ট্রেনে-মেট্রোতে পড়বেন। কেউ হয়ত পড়বেন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে, চান করে খাওয়ার টেবিলে। ভেবে দেখুন, খেতে বসেছেন। ফ্রীজে একটু মাংস রাখা আছে।  কাল বা পরশু রাঁধা হবে।  স্ত্রী খাবার বারছেন। বুড়া বাপ সোফায় বসে।  হঠাত শতশত লোক এসে আপনাকে, আপনার বাবাকে টেনে নিয়ে গেল। হঠাতই। তারপর অনেকে মিলে আপনাকে আধমরা করলো, আপনার বাবাকে মেরেই ফেলল।  তারপর চলে গেল। আপনার দুনিয়াটা শেষ হয়ে গেল। কারণ আপনার ফ্রিজে রাখা প্যাকেটে সেই মাংস এই খুনীদের, এই পাপীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত করেছে। উত্তর প্রদেশের দাদরিতে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে।  মহম্মদ আখলাক খুন হয়েছেন। তার লাশের মাংসের চেয়ে তার ফ্রীজের মাংসকে শনাক্ত করতে যে পাপিষ্ঠদের বেশি মাথাব্যথা, তাদেরই গুরু-ভাইরা দিল্লির মাধ্যমে এই বাংলাকেও শাসান এবং কোন একদিন শাসন করার স্বপ্ন দ্যাখেন। দাদরি কোথায় জানেন? নয়ডা-তে।  সেই নয়ডা যেখানে আপনার ছেলে-মেয়েকে আপনি পাঠাতে উত্সুক, যাতে তারা ‘আরো বড়’ হয়। এইটা হলো নয়ডা। শিকড়হীন যুবসমাজের ঝিনচ্যাক আর গরুর জন্য মানুষ খুন, এই নিয়ে সেখানকার সংস্কৃতি। ভাগ্যিস ‘আরো বড়’ হইনি, রয়েছি বঙ্গবাসী হয়ে, নয়ডাবাসী হইনি।

বিহারের মানুষের বড়ই দুর্ভাগ্য।  একটা নির্বাচন যেটা কিনা তাদের সামনে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-নারী অধিকার-জাত ভিত্তিক বৈষম্য এবং আরো কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবার সুযোগ এনে দিয়েছিল, কিছু ঘৃণার কারবারী সেই নির্বাচনকে গরু-কেন্দ্রিক নির্বাচনে পরিনত করতে চায় জনগণকে ভ্যাড়া বানিয়ে। আর বাকি রাজ্যেও তারা ঢোকাতে চায় গরুর পাল, চালাতে চায় গরুর হাড়-শিং-মাংস নিয়ে ফেইসবুক, এসএমএস, হওয়াট্সয়াপের ছবি ও ঘৃণা  চালাচালির রাজনীতি। যে সময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে সামান্য এগিয়ে থাকা আফ্রিকা মহাদেশের সাথে মহাসমেল্লনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে আফ্রিকার থেকেও গড়ে পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সংঘরাষ্ট্র গরীব জনতার টাকায় সস্তা বারফাট্টাই করে আফ্রিকাকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ‘সাহায্য’ করার নানা চুক্তি করে, একই সময়ে আমাদের এই পোড়ার রাষ্ট্রে আত্মহত্যারত কৃষক, বেকার যুবক, ক্ষুধার্ত মা, রোগাক্রান্ত দাদু ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সামনে হাজির করা হচ্ছে তাদের সব সমস্যার এক দাওয়াই – গরুকে মা রূপে পুজো করা। আমরা যারা রোজ পেট পুরে খেতে পাই, যাদের আয় করার মোটামুটি একটা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা আছে, তাদের একটা দায় আছে এই ষড়যন্ত্রের আগুনে হাওয়া না দেবার। বিজয়া দশমী সবে গেল।  সামনে কালী পুজো আসছে। তার মাঝে মানুষের জীবনের ইস্যুগুলিকে তুচ্ছ করে গরু, গরু করা একটা পাপ। আমরা বাঙ্গালী। মা দূর্গা আমাদের মা। মা দূর্গা আমাদের দ্যাখেন  এবং তিনি সব কিছুই দ্যাখেন। হিন্দুস্তানি এলাকায় গরু নিয়ে রাজনীতি দেখে এখানে কিছু লোকের মনে কি কি ফন্দি মাথায় আসছে, তিনি সেটাও দেখছেন। তিনি আমাদের হাড়ে হাড়ে চেনেন। আমাদের একটু সাবধান হওয়া উচিত। পাপ-পূণ্য বলে একটা ব্যাপার আছে – যেটা গরু-ভ্যাড়া-ছাগলের-শুয়োরের অনেক উপরে।

আমরা বঙ্গবাসী।  আমরা মাকে মা বলে জানি আর গরুকে গরু বলে জানি।  আমার মায়ের দুটো পা। গরুর চারটে পা। দুটো যাতে গুলিয়ে না ফেলি, এবং দুনিয়াকে চেনার সঠিক শিক্ষা পাই, তার জন্য আমার মা ও ঠাকুমা ছোটবেলায় আমাকে অনেকবার ‘আস্ত একটা গরু’ বলে বকাবকি করেছেন, উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘শুয়ার’ বলে গালি দিয়েছেন আমাকে আমার মা।  সেই শিক্ষায় আমরা মানুষ হয়েছি। যে মা আমাকে ‘গরু’ বলে গালি দিয়ে শিক্ষা দিত, আজ কারুর প্ররোচনায় যদি গরুকে মা বলে ডাক দিই, তাহলে আমাদের মায়ের শিক্ষা ব্যর্থ। বাংলা মায়ের অযোগ্য সন্তান হবার শখ আমার নেই। আজ বাইরে থেকে নানা তত্ত্ব আমদানি করে বাঙ্গালীকে কেউ কেউ মাকে ও গরুকে নতুন করে চেনানোর ঠিকাদারী নিয়ে বাংলায় ঘনঘন যাতাওয়াত করছে। এদের যাতাওয়াতের খাই-খরচা দিয়ে বাংলার মাটিতে বসেই ১৯৪৩-র মন্বন্তরে অশুভলাভ করা গণশত্রু  মজুতদারের নাতি-পুতিরা আরেকটা মহামৃত্যু ঘটানোর ফন্দি আটছে আরো বড় মুনাফার জন্য। তারা দিল্লীর সাথে ষড়যন্ত্র করে এককালে  বাংলা ভাগ করেছে, কলকাতাকে নিংড়ে নিয়েছে, তারা রক্ত শুষেছে বাংলার মানুষের, কিন্তু তাদের রক্তের খাই মেটে নাই। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ানক হলো অহিংসার কীর্তন করা মানুষের চোরাগোপ্তা সহিংসতা। জল বেশি দূর গড়ানোর আগেই এই খেলার নেপথ্য খেলোয়ারদের জার্সির রং, ক্লাবের তাঁবুর ঠিকানা, সব চিনে নেওয়া প্রয়োজন।  বাংলার স্বার্থে। শান্তি-রক্ষার স্বার্থে। মানবতার স্বার্থে।

বাংলার বাইরে অর্থাৎ  মুম্বই, গুরগাঁও, ছত্তিসগড়, রাজস্থান ইত্যাদি নানা জায়গায় সম্প্রতি গরু পেরিয়ে ভ্যাড়া, ছাগল ও মুরগির দিকেও হাত পড়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। আমি শাক্ত, আমার চৌদ্দ পুরুষ শাক্ত, আমরা কালিঘাটে পাঠা বলি দিই মাকে তুষ্ট করতে, সেই বলির মাংস আমাদের কাছে  মায়ের প্রসাদ। সেই প্রসাদকে যারা হেয় করে, ঘেন্না করে, সেটাকে নিষিদ্ধ করে ধর্মের দোহাই দিয়ে, তাদের ধর্ম আমাদের নয়। সে ধর্মের প্রভাব থেকে মা কালী আমাদের রক্ষা করে আসছেন, করে যাবেন।  মা কালীর বাংলায় আমাদের যারা নিরামিষাশী গরু-ছাগল বানাতে চায়, তাদের ঠাঁই নাই। আজ কলকাতা শহরের বেসরকারী হাসপাতালে মুমূর্ষু রুগীকে নিরামিষ খেতে দেওয়া হয় মালিকের ধর্মীয় ‘অনুভূতি’ অনুযায়ী, চিকিত্সাবিজ্ঞানে কিছু ক্ষেত্রে আমিষ-প্রোটিন পথ্য বলে দেওয়া সত্ত্বেও।  আমাদের অজান্তেই আমাদের ঘর বেদখল হয়ে যাচ্ছে না তো ? এরা গরুতে থামবে না, এরা ছাগলে থামবে না, এরা সুজলা সুফলা বাংলাকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান বানিয়ে তবে থামবে। শুয়োর-গরু-ছাগলের পাল যদি আমাদের এই বাংলার সোনালী-সবুজ ক্ষেতে ঢুকে শত শত বছর ধরে মানুষের রক্তে-ঘামে-ভালবাসায়-বোধে-বিশ্বাসে তৈরী করা সহাবস্থানের ফসল ধ্বংস করতে চায়, তাহলে মা কালিকে সাক্ষী রেখে কালিপটকার চেইন বাঁধা দরকার।  সে কালী পটকার চেইন লাগিয়ে দেওয়া দরকার বহির্শত্রুর ল্যাজে। তারপর আলতো করতে একটু আগুন জ্বালালেই পাপাত্মা থেকে মুক্তি। ব্যাপারটা সিরিয়াস। অনেককালের, অনেক যুগের, অনেক সিঞ্চনের, অনেক প্রেমের ফসল এই বাংলার মাটি। এই মাটিতে আমরা খাল কেটে কুমির ডাকবো নাকি এ মাটির ফসল লালন করব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বঙ্গবাসীর জন্য, সিদ্ধান্তটা আমাদের। ব্যক্তিগত ভাবে সিদ্ধান্তটা আমি নিয়ে ফেলেছি। তাই ঘরে কালিপটকা মজুত রেখেছি জন্ম থেকেই।  আসলে ওই মজুত করা কালী-পটকা আমি কিনিনি।  কিনেছিল আমার পূর্বপুরুষেরা। অনেক শতক আগে।  সেই থেকে ঘরে আছে। মাঝে মাঝে ওগুলোকে ছাদে উঠে রোদে তা দেওয়াই। কে জানে কখন কাজে লাগে। মা দুর্গাকে প্রার্থনা করি যেন কখুনো কাজে না লাগে, কিন্তু হিন্দুস্তানি এলাকার হল-হকিকত দ্যাখে আজকাল একটু ঘনঘনই ছাদে উঠি। রোদে তা দিই এবং মেঘের রং দেখি। আমরা ঘরপোড়া। অনেকের সিঁথির সিঁদুর উজাড় হয়েছে, অনেকের সম্ভ্রম লুন্ঠিত হয়েছে, অনেকের জান-মাল নষ্ট হয়েছে, ভিটামাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ১৯৪৭-এর আগেকার গরু-ভ্যাড়ার রাজনীতিতে। পূর্ব্ববঙ্গে সে রাজনীতি ধিকিধিকি আজও চলছে। ভিটা ছেড়ে তারা আজও আসছে এই বাংলায়। এই বাংলা যে সে মাটি নয়। আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। রোগ না ছড়ানোর। রোগ সারানোর। মা কালী সকলের মঙ্গল করুন।

1 Comment

Filed under বাংলা, Bengal, Kolkata, Religion

One response to “এই বাংলায় মায়ের দুটি পা, গরুর চারটে

  1. বর্গি কারা তা জানার চেস্টা করলাম আর কবে ?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s