পশ্চিম বাংলার সরকারী নাম থেকে পশ্চিম বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে

এটা ক্রোধের মাটি, সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে হাঁসফাঁস করা মাটি। এ মাটি থুথু দেয়,উদ্গিরন করে – প্রাণ উদ্গিরন করে । আমাদের সেই মাটির উপযুক্ত হয়ে ওঠা দরকার । এই সৃজনশীল অংশটিকে সার দিতে হবেই। এই ক্রোধকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে । আমাদের বেঁচে থাকতে হবে । যেন মেনে নেওয়া, হাল ছেড়ে দেওয়া এক ঘুমে আমরা ঢলে না পড়ি । প্রকৃতি থেকে, ইতিহাসের থেকে এটি আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ ।
– তাঁর স্বদেশ ফরাসী উপনিবেশ মারটিনিক প্রসঙ্গে বলছেন এইমে সেজার, মহিরুহসম দারশনিক ও রাজনীতিবিদ, নেগ্রিচুড আন্দলনের অন্যতম পিতা, ফ্রান্স ফ্যাননের গুরু ।

২ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ক্যাবিনেটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে রাজ্যের সরকারী নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে ওয়েস্ট বা পশ্চিম ছেঁটে ফেলা হবে । পরিবর্তে নাম হবে বাংলা অথবা বঙ্গ । সরকারী “ইংরেজি নাম ” হবে বেঙ্গল। উত্তর প্রদেশের নাম নর্থ না বা নর্দার্ন প্রভিন্স নয় । অন্য কোন রাজ্যের এমন এমন আলাদা ইংরেজি নাম নেই – আমাদের কেন বিশেষভাবে ইংরেজি দরকার, তা সরকার খোলসা করেননি । এই বদলের তাৎক্ষনিক কারন হল এক দীর্ঘকালীন সমস্যা । নতুন দিল্লীর সংঘ সরকার (যার “কেন্দ্রীয়” সরকার নামটি ভ্রান্তভাবে প্রচলিত) যখন কোন কারনে রাজ্যগুলির মিটিং ডাকে, তখন বক্তব্য রাখতে রাজ্যগুলিকে আহবান করা হয় ইংরেজি বর্ণমালায় রাজ্যগুলির নামের আদ্যক্ষরের ক্রমসংখ্যা অনুসারে । ফলে ডাবলু দিয়ে নাম শুরু হওয়া ওয়েস্ট বেঙ্গলকে ডাকা হয় একদম শেষে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর বক্তব্য শোনার ধৈর্য বা বক্তব্য রাখতে দেওয়ার জন্য সময়, দুইই থাকে অপ্রতুল । এই উপমহাদেশের নানা ভাষার কোন বর্ণমালাতেই ওয়েস্ট শব্দের “ও” ধ্বনিটি একদম শেষে আসে না । কেন একটি ফিরিঙ্গির অউপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া এলাকায় ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমতালিকা ব্যবহ্রিত হয়, সেটি আরেকটি গভীর প্রশ্ন, যে প্রসঙ্গে আজ আমি যাচ্ছি না । সম্প্রতি নতুন দিল্লীতে আন্তঃ-রাজ্য পরিষদের অধিবেশনে শেষে বলতে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বান্দপাধ্যায়কে এক পর্যায় সময়ের অভাবের জন্য থামিয়ে দেওয়া হয় । একজন গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে যে নতুন দিল্লীর হাটে এই ভাবে অপমান করা যায় সময়ের উছিলা দেখিয়ে, সেটা নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরেও ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন রাষ্ট্রে রাজ্য সরকারগুলির স্ট্যাটাসকেই বয়ান করে । আরেকটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রধান নরেন্দ্র মোদীকে এই ভাবে থামিয়ে দেবার কথা নতুন দিল্লীর কেউ কল্পনা করতে পারেন?

তবুও এটা দুর্ভাগ্যজনক যে রাজ্যের নাম বদলের মত এক্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পিছহনে তাৎক্ষনিক কারন হিসেবে আছে এমন একটি কৃত্রিম আমলাতান্ত্রিক সমস্যা । এই একি সমস্যার কারণেই মোটামুটি ৫ বছর আগে তৃণমূল সরকারই আলাপ-আলছনার মাধ্যমে ঠিক করে যে রাজ্যের সরকারী নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে বদলে হবে পশ্চিমবঙ্গ – ফলে ইংরেজিতেও আদ্যক্ষর “পি” হবার ফলে আর সবশেষে থাকতে হবে না। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে নতুন দিল্লী এই নাম বদলটিকে মান্যতা দেয়নি । এই ভেবে দেখার বিষয় যে একটি রাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনধি ও জনগণ তাদের রাজ্যের নামও ঠিক করতে পারেনা, নতুন দিল্লীর সরকারের অনুমতি ও সীলমোহর ছাড়া । এই অগনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নানা মাশুল বার বার দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দিয়ে চলবে । সে যাই হোক, ওয়েস্ট বা পশ্চিমকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত ফাইনাল । বিধানসভার একটি বিশেষ অধিবেশনে এটি পাশ করানো হবে ।

পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন যে নাম-বদল আমাদের “”সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের” স্বার্থে। মজার কথা হলো, সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গ নামটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং তাকে কি ভাবে মুছে ফেলা যায়? ১৯৪৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে নামটিও “আমরা” হয়ে উঠেছি। অতীতনিষ্ঠ ভাবে। পশ্চিমবঙ্গ নামটির ভিত্তি অন্ততঃ বাস্তব ইতিহাসে, অন্ততঃ স্রেফ “বঙ্গ”র তুলনায়। যে ঐতিহাসিক জনপদএলাকা থেকে বঙ্গ নামটির উদ্ভব, সেটি বর্তমানে পুরোপুরিই পশ্চিমবঙ্গের বাইরে, মূলতঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ফরিদপুর-মাগুরা-শরিয়তপুর-ঢাকা এলাকায়।

১৯৪৭-এর আগে বাংলার পশ্চিম অংশ কখনোই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে একটি রাজনৈতিকভাবে একক ছিল না। সেটা হয়েছে ১৯৪৭-এর পরে, যখন হিন্দু প্রধান পশ্চিম অংশ আর মুসলমান প্রধান পূর্ব্ব অংশে বাংলা ভাগ হলো। ১৯০৫-এর বাংলা ভাগের ফলে উদ্ভূত বেঙ্গল-এ আজকের বিহার, ঝাড়খন্ড ও উড়িষ্যা প্রদেশে ছিল। সেই “বেঙ্গল” হলো একটি ফিরিঙ্গী কল্পনা, সেটি পশ্চিমবঙ্গ ছিল না। ১৯৫৫-তে পূর্ব্ব বাংলা পাকিস্তানের “ওয়ান ইউনিট” প্রকল্পের ফলে হয় পূর্ব্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১-এ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ফলে সে এলাকা রাষ্ট্রিক ভাবে সংগঠিত হয় আজকের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে। যারা বলেন, যে পূর্ব্ব নেই, তো পশ্চিম কেন, সেই প্রসঙ্গে মনে যে ১৯৪৭-এর বাংলাদেশ ভাগ এবং তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রভাব দুই বাংলায় ভিন্ন। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে জানা যায় যে খোদ কলকাতাতেই জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ পূর্বববঙ্গ থেকে দেশভাগের পরে আগত। সেই অনুপাত পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আজ অবধি শুধুই বেড়েছে। তারা কেন এখানে, তার কারণ ১৯৪৭। “পশ্চিম” বঙ্গ সেই ঘটনার ফলাফল। রাজনৈতিক ভাবে ফিরিঙ্গী শাসনাধীন উপমহাদেশের আইনসভায় সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধি পাঠাতো যুক্ত বাংলা। দেশভাগের ফলে দিল্লীর রাজনীতিতে বাংলা ও বাঙালির প্রান্তিকতার কারণও বাংলাদেশ-ভাগ। আমরা প্রান্তিক কারণ আমরা পুরো বাংলা নই, কারণ আমরা বিভাজিত বাংলার পশ্চিম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ। নাম বদলালে এই বাস্তবতা বদলাবে না। অর্থনৈতিক ভাবেও পূর্বববঙ্গের সাথে যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হওয়াটা নানা কারণের মাঝে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অধোগমনের একটা বিরাট কারণ। ১৯৪৭ আমাদের বডি পলিটিকে, রাজনৈতিক চেতনায় ও অবচেতনে  বিশাল ভাবে বাস করে, আমরা স্বীকার করি আর না করি। অপর দিকে, পূর্ব্ব বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার মুখ অক্ষ ১৯৪৭ নয়, ১৯৭১। ১৯৭১ প্রমাণ করে যে মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ভুল, কংগ্রেসী একজাতিতত্ত্বও ভুল, বরং এই উপমহাদেশের বাস্তবতা হলো বহুজাতিতত্ত্ব। জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব্ব বাংলার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, সেখানকার রাষ্ট্রকে বাংলার দেশ বাংলাদেশ নামকরণের মাধ্যমে সেই জাতীয় চেতনা তথা অভীপ্সাই প্রকাশ পায়। তাই ১৯৫৫-এ নাম বদলের পরেও পূর্ব্ব বাংলার সর্ব্বস্তরের রাজনৈতিক নেতারা মাঠে-ঘাটে-ময়দানে “পূর্ব্ব বাংলা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন, কারণ সেটি বাস্তব। ১৯৭১-এর পরেও কিছু কেটে এর ব্যবহার দেখা গেছে, যেমন পূর্ব্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি অথবা চিন্তাবিদ আহমদ ছফার লেখায়। পূর্ব্বই তো নেই, তাহলে পশ্চিম কেন প্রসঙ্গে অর্থনীতিবীদ দীপঙ্কর দে বলেছেন,”আচ্ছা কোনটা ঠিক – ‘সূর্য্য পূর্ব দিকে ওঠে’ নাকি -‘যেদিকে সূর্য্য ওঠে ওটা পূর্ব দিক”? আবহমান বাংলার পূর্ব্ব অংশ যে পূর্ব্ব বাংলাই আর পশ্চিম অংশ যে পশ্চিম বাংলা, সেই সত্য খন্ডাবে কে?

প্রসঙ্গতঃ, “বাংলাদেশ” শব্দের মাধ্যমে দুই বাংলা বা বাংলার যে কোন এলাকাকে বোঝানো খুবই স্বাভাবিক ছিল এই সেদিন পর্যন্ত – রাজনৈতিক ময়দানে, সাহিত্যে, সর্বত্র। সত্যজিৎ রায় যখন পথের পাঁচালীতে হরিহরের মুখে বাংলাদেশ শব্দ বসান, গুপীবাঘা যে “বাংলাদেশ ” থেকে এসেছিলো, তখন তিনি পূর্ব্ব বাংলা বোঝাননি। বাংলার দেশ হলো বাংলা দেশ। দেশ ও রাষ্ট্রের তফাৎ বোঝা প্রয়োজন। দেশ হলো কোন গোষ্ঠীর আবাদভূমি বা হোমল্যান্ড। রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক অবকাঠামো ও ব্যবস্থা। রবীন্দ্রনাথের “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে”র বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিকভাবে একাধিক রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণে পরে, যথা ভারতীয় সংঘরাষ্ট্র এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” ও “বাংলাদেশ” এক নয়। এই সেদিন অবধি মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গীয় বিষয় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত হতো “বাংলাদেশ” পত্রিকা। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ নামটির হ্রস্যমান জনপ্রিয়তা দুঃখজনক কারণ এক্ষেত্রে আমরা এই একটি নামের মালিকানার প্রশ্নে রাষ্ট্রিক দাবিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি দেশজ দাবী থেকে। এবং যার ফলে পশ্চিমবঙ্গে “বাংলাদেশ” হয়ে গেছে “অপর” সূচক একটি শব্দ। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কি হতে পারে।

অথচ বাংলাভাষী মানুষের আবহমান কালের  বিষ্ট্রীটিতে গত কয়েক শতকে  বিশাল হেরফের হয়নি, আজও হয়নি। বাংলা হলো ২৫ কোটি বাংলাভাষী মানুষের ঐতিহাসিক আবাদভূমি – বিশ্বের প্রতি ২৫টি মানুষের মধ্যে ১ জন
বাংলাভাষী। সর্বাধিক জনঘনত্বের একলপ্তে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এলাকা। এ এক অনন্য ভূমি। হিমালয় ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যে জীবন্ত নদীর, আজ ব-দ্বীপ নির্মাণের চলমান প্রক্রিয়ার এই ভূমি জীবন ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যায় প্রতিদিন, প্রতিরাত। এখানে প্রকৃতি বিধানে চলে প্রকৃতির বিধান বিরুদ্ধতা – এ রাগ, জাদু, স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভূমি। যেমন এইমে সেজার বলেছিলেন, “বিস্ময়কর জন্ম থেকে প্রসূত এক অদ্ভুত ভূমি, এর দাম যে কোন বিগ ব্যাং-এর থেকে বেশি”। ১৯৪৭ যে ভাগ করেছিল, যার ফলাফল আজও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে, সেই ভাগের অদূরদৃষ্টি, রাগ, বেইমানি, প্রায় মহাজাগতিক ক্রোধের মনুষ্য কারক দ্বারা বহিঃপ্রকাশ – “পশ্চিম” তারই চিরস্মারক। তাই কারো কাছে পশ্চিম হল মুছে দিয়ে ভুলে যাবার জিনিস, কারো কাছে তা আজকে বিভাজনবিভাজনের রাজনীতি করার সাধন, কারো কাছে পথ আলাদা হবার ঐতিহাসিক মাইলফলক, আবার কারো কাছে ঘুমিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ইঙ্গিত। এই পশ্চিম-চেতনাকে বাতিল করে দেওয়া, তা ১৯৪৭ পরবর্তী সরকারি ভারতীয় ইতিহাস ও আদিকল্প দ্বারা নির্মিত ও আচ্ছন্ন আজকের প্রজন্মের কাছে ফলে যতই আলগা ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে থাকুক, তা আসলে একটি জাতির আত্মপরিচিতি ও জাতিস্বত্বা চেতনাকে আঘাত করা, অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন এক বর্তমানকে নির্মাণ করা। পশ্চিম-বিহীন পশ্চিমবঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি মেকি আত্মপরিচিতি নির্মাণ করতে চায় যা পুরোপুরি আজকের রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ – যেন-এ বিধাতা পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় এক নতুন স্বত্ত্বা পয়দা করেছিলেন, যার  অতীত নেই কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আছে। কিন্তু এই গোঁজামিল ধরা পড়ে যায় যখন মূলতঃ হিন্দু-উচ্চবর্ণ প্রধান মনীষিকান্ড সমৃদ্ধ “বাংলার” ইতিহাসে এসে পড়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ও রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ঢাকায় অধ্যাপনা,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যশোরে ডিপুটি-কালেক্টরগিরি, রবীন্দ্রনাথের কুষ্টিয়ায় অবস্থানকালের সৃজনশীলতা, সূর্য্য সেনের চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহ। পূর্ব্ব-বাংলা চেতনা বিহীন “বাংলা”-তে এগুলিকে ধরা যাবে নাকি এগুলি এবার থেকে বাদ? ভারতীয় সংঘরাষ্ট্রের শাসনাধীন স্বয়ংসম্পূর্ণ বানাওয়াট এক “বাংলা” আত্মপরিচিতি কল্পনায় কেউ ডুব দিতেই পারেন, কিন্তু সে পুকুরের পাড়গুলিতো সব এই “বঙ্গ/বাংলা”য় নয়।  তখন তল পাবেন, অঙ্ক মেলাতে পারবেন পূর্ব্ব-পশ্চিম ছাড়া?

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দরকার নিজেদের চিরন্তন আত্মপরিচিতির মৌলিক ও প্রাথমিক ধারণাগুলোকে, নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিকে আগলে রাখতে, নিজের ঠাকুমার সঙ্গে নিজের সংযোগ না হারাতে।হয়তো পূর্ব্বে ফেরত যাওয়ার কোন পথ নেই। আছে শুধু দিল্লীগামী লং-মার্চ, বিশেষণহীন “স্রেফ ইন্ডিয়ান” হয়ে ওঠার মহা-প্রকল্পে যোগ দিতে। এই ইন্ডিয়ান এমন এক গোষ্ঠীপরিচিতি যার “প্রাচীন ইতিহাস ” আছে কিন্তু ঠাকুমা-দিদিমা চেতনা নেই। এই ইন্ডিয়াননত্ত্ব এমন এক আকারের জুতা, যার সাইজ সকলের জন্য এক, এবং এতে ফিট হতে হলে নিজের আকার বদলাতে হয়। অথচ আমাদের আকার-প্রকার তো এই ভূমি দ্বারা গঠিত – এমনকি উত্তরাধিকারে পাওয়া এমন সব আকার-প্রকার সম্বলিত যাতে এমন ভূমির ছাপ-স্মৃতি-গন্ধ যেখানে ইন্ডিয়ান তেরঙা ওড়ে না। আজকের দিনে, এই পশ্চিম নামক হুঁশিয়ারি দরকার পশ্চিমবঙ্গে এটা মনে করাতে যে সাম্প্রদায়িক চেতনা সম্পন্ন রাজনৈতিক বয়ানের কি বিষময় ফলাফল হতে পারে। পশ্চিম আমাদের মনে করায় আমরা কোন অতীত থেকে এই বর্তমানে কেমন করে পৌঁছলাম এবং আমরা ভবিষ্যতে কোথায় যাবো।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Identity, Partition, Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s