Tag Archives: Kolkata

এই বাংলায় মায়ের দুটি পা, গরুর চারটে

অনেকে হয়তো এই লেখাটি সকালে কাজে যেতে যেতে বাসে-ট্রামে-ট্রেনে-মেট্রোতে পড়বেন। কেউ হয়ত পড়বেন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে, চান করে খাওয়ার টেবিলে। ভেবে দেখুন, খেতে বসেছেন। ফ্রীজে একটু মাংস রাখা আছে।  কাল বা পরশু রাঁধা হবে।  স্ত্রী খাবার বারছেন। বুড়া বাপ সোফায় বসে।  হঠাত শতশত লোক এসে আপনাকে, আপনার বাবাকে টেনে নিয়ে গেল। হঠাতই। তারপর অনেকে মিলে আপনাকে আধমরা করলো, আপনার বাবাকে মেরেই ফেলল।  তারপর চলে গেল। আপনার দুনিয়াটা শেষ হয়ে গেল। কারণ আপনার ফ্রিজে রাখা প্যাকেটে সেই মাংস এই খুনীদের, এই পাপীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত করেছে। উত্তর প্রদেশের দাদরিতে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে।  মহম্মদ আখলাক খুন হয়েছেন। তার লাশের মাংসের চেয়ে তার ফ্রীজের মাংসকে শনাক্ত করতে যে পাপিষ্ঠদের বেশি মাথাব্যথা, তাদেরই গুরু-ভাইরা দিল্লির মাধ্যমে এই বাংলাকেও শাসান এবং কোন একদিন শাসন করার স্বপ্ন দ্যাখেন। দাদরি কোথায় জানেন? নয়ডা-তে।  সেই নয়ডা যেখানে আপনার ছেলে-মেয়েকে আপনি পাঠাতে উত্সুক, যাতে তারা ‘আরো বড়’ হয়। এইটা হলো নয়ডা। শিকড়হীন যুবসমাজের ঝিনচ্যাক আর গরুর জন্য মানুষ খুন, এই নিয়ে সেখানকার সংস্কৃতি। ভাগ্যিস ‘আরো বড়’ হইনি, রয়েছি বঙ্গবাসী হয়ে, নয়ডাবাসী হইনি।

বিহারের মানুষের বড়ই দুর্ভাগ্য।  একটা নির্বাচন যেটা কিনা তাদের সামনে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-নারী অধিকার-জাত ভিত্তিক বৈষম্য এবং আরো কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবার সুযোগ এনে দিয়েছিল, কিছু ঘৃণার কারবারী সেই নির্বাচনকে গরু-কেন্দ্রিক নির্বাচনে পরিনত করতে চায় জনগণকে ভ্যাড়া বানিয়ে। আর বাকি রাজ্যেও তারা ঢোকাতে চায় গরুর পাল, চালাতে চায় গরুর হাড়-শিং-মাংস নিয়ে ফেইসবুক, এসএমএস, হওয়াট্সয়াপের ছবি ও ঘৃণা  চালাচালির রাজনীতি। যে সময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে সামান্য এগিয়ে থাকা আফ্রিকা মহাদেশের সাথে মহাসমেল্লনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের দিক থেকে আফ্রিকার থেকেও গড়ে পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সংঘরাষ্ট্র গরীব জনতার টাকায় সস্তা বারফাট্টাই করে আফ্রিকাকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ‘সাহায্য’ করার নানা চুক্তি করে, একই সময়ে আমাদের এই পোড়ার রাষ্ট্রে আত্মহত্যারত কৃষক, বেকার যুবক, ক্ষুধার্ত মা, রোগাক্রান্ত দাদু ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সামনে হাজির করা হচ্ছে তাদের সব সমস্যার এক দাওয়াই – গরুকে মা রূপে পুজো করা। আমরা যারা রোজ পেট পুরে খেতে পাই, যাদের আয় করার মোটামুটি একটা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা আছে, তাদের একটা দায় আছে এই ষড়যন্ত্রের আগুনে হাওয়া না দেবার। বিজয়া দশমী সবে গেল।  সামনে কালী পুজো আসছে। তার মাঝে মানুষের জীবনের ইস্যুগুলিকে তুচ্ছ করে গরু, গরু করা একটা পাপ। আমরা বাঙ্গালী। মা দূর্গা আমাদের মা। মা দূর্গা আমাদের দ্যাখেন  এবং তিনি সব কিছুই দ্যাখেন। হিন্দুস্তানি এলাকায় গরু নিয়ে রাজনীতি দেখে এখানে কিছু লোকের মনে কি কি ফন্দি মাথায় আসছে, তিনি সেটাও দেখছেন। তিনি আমাদের হাড়ে হাড়ে চেনেন। আমাদের একটু সাবধান হওয়া উচিত। পাপ-পূণ্য বলে একটা ব্যাপার আছে – যেটা গরু-ভ্যাড়া-ছাগলের-শুয়োরের অনেক উপরে।

আমরা বঙ্গবাসী।  আমরা মাকে মা বলে জানি আর গরুকে গরু বলে জানি।  আমার মায়ের দুটো পা। গরুর চারটে পা। দুটো যাতে গুলিয়ে না ফেলি, এবং দুনিয়াকে চেনার সঠিক শিক্ষা পাই, তার জন্য আমার মা ও ঠাকুমা ছোটবেলায় আমাকে অনেকবার ‘আস্ত একটা গরু’ বলে বকাবকি করেছেন, উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘শুয়ার’ বলে গালি দিয়েছেন আমাকে আমার মা।  সেই শিক্ষায় আমরা মানুষ হয়েছি। যে মা আমাকে ‘গরু’ বলে গালি দিয়ে শিক্ষা দিত, আজ কারুর প্ররোচনায় যদি গরুকে মা বলে ডাক দিই, তাহলে আমাদের মায়ের শিক্ষা ব্যর্থ। বাংলা মায়ের অযোগ্য সন্তান হবার শখ আমার নেই। আজ বাইরে থেকে নানা তত্ত্ব আমদানি করে বাঙ্গালীকে কেউ কেউ মাকে ও গরুকে নতুন করে চেনানোর ঠিকাদারী নিয়ে বাংলায় ঘনঘন যাতাওয়াত করছে। এদের যাতাওয়াতের খাই-খরচা দিয়ে বাংলার মাটিতে বসেই ১৯৪৩-র মন্বন্তরে অশুভলাভ করা গণশত্রু  মজুতদারের নাতি-পুতিরা আরেকটা মহামৃত্যু ঘটানোর ফন্দি আটছে আরো বড় মুনাফার জন্য। তারা দিল্লীর সাথে ষড়যন্ত্র করে এককালে  বাংলা ভাগ করেছে, কলকাতাকে নিংড়ে নিয়েছে, তারা রক্ত শুষেছে বাংলার মানুষের, কিন্তু তাদের রক্তের খাই মেটে নাই। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ানক হলো অহিংসার কীর্তন করা মানুষের চোরাগোপ্তা সহিংসতা। জল বেশি দূর গড়ানোর আগেই এই খেলার নেপথ্য খেলোয়ারদের জার্সির রং, ক্লাবের তাঁবুর ঠিকানা, সব চিনে নেওয়া প্রয়োজন।  বাংলার স্বার্থে। শান্তি-রক্ষার স্বার্থে। মানবতার স্বার্থে।

বাংলার বাইরে অর্থাৎ  মুম্বই, গুরগাঁও, ছত্তিসগড়, রাজস্থান ইত্যাদি নানা জায়গায় সম্প্রতি গরু পেরিয়ে ভ্যাড়া, ছাগল ও মুরগির দিকেও হাত পড়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। আমি শাক্ত, আমার চৌদ্দ পুরুষ শাক্ত, আমরা কালিঘাটে পাঠা বলি দিই মাকে তুষ্ট করতে, সেই বলির মাংস আমাদের কাছে  মায়ের প্রসাদ। সেই প্রসাদকে যারা হেয় করে, ঘেন্না করে, সেটাকে নিষিদ্ধ করে ধর্মের দোহাই দিয়ে, তাদের ধর্ম আমাদের নয়। সে ধর্মের প্রভাব থেকে মা কালী আমাদের রক্ষা করে আসছেন, করে যাবেন।  মা কালীর বাংলায় আমাদের যারা নিরামিষাশী গরু-ছাগল বানাতে চায়, তাদের ঠাঁই নাই। আজ কলকাতা শহরের বেসরকারী হাসপাতালে মুমূর্ষু রুগীকে নিরামিষ খেতে দেওয়া হয় মালিকের ধর্মীয় ‘অনুভূতি’ অনুযায়ী, চিকিত্সাবিজ্ঞানে কিছু ক্ষেত্রে আমিষ-প্রোটিন পথ্য বলে দেওয়া সত্ত্বেও।  আমাদের অজান্তেই আমাদের ঘর বেদখল হয়ে যাচ্ছে না তো ? এরা গরুতে থামবে না, এরা ছাগলে থামবে না, এরা সুজলা সুফলা বাংলাকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান বানিয়ে তবে থামবে। শুয়োর-গরু-ছাগলের পাল যদি আমাদের এই বাংলার সোনালী-সবুজ ক্ষেতে ঢুকে শত শত বছর ধরে মানুষের রক্তে-ঘামে-ভালবাসায়-বোধে-বিশ্বাসে তৈরী করা সহাবস্থানের ফসল ধ্বংস করতে চায়, তাহলে মা কালিকে সাক্ষী রেখে কালিপটকার চেইন বাঁধা দরকার।  সে কালী পটকার চেইন লাগিয়ে দেওয়া দরকার বহির্শত্রুর ল্যাজে। তারপর আলতো করতে একটু আগুন জ্বালালেই পাপাত্মা থেকে মুক্তি। ব্যাপারটা সিরিয়াস। অনেককালের, অনেক যুগের, অনেক সিঞ্চনের, অনেক প্রেমের ফসল এই বাংলার মাটি। এই মাটিতে আমরা খাল কেটে কুমির ডাকবো নাকি এ মাটির ফসল লালন করব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বঙ্গবাসীর জন্য, সিদ্ধান্তটা আমাদের। ব্যক্তিগত ভাবে সিদ্ধান্তটা আমি নিয়ে ফেলেছি। তাই ঘরে কালিপটকা মজুত রেখেছি জন্ম থেকেই।  আসলে ওই মজুত করা কালী-পটকা আমি কিনিনি।  কিনেছিল আমার পূর্বপুরুষেরা। অনেক শতক আগে।  সেই থেকে ঘরে আছে। মাঝে মাঝে ওগুলোকে ছাদে উঠে রোদে তা দেওয়াই। কে জানে কখন কাজে লাগে। মা দুর্গাকে প্রার্থনা করি যেন কখুনো কাজে না লাগে, কিন্তু হিন্দুস্তানি এলাকার হল-হকিকত দ্যাখে আজকাল একটু ঘনঘনই ছাদে উঠি। রোদে তা দিই এবং মেঘের রং দেখি। আমরা ঘরপোড়া। অনেকের সিঁথির সিঁদুর উজাড় হয়েছে, অনেকের সম্ভ্রম লুন্ঠিত হয়েছে, অনেকের জান-মাল নষ্ট হয়েছে, ভিটামাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ১৯৪৭-এর আগেকার গরু-ভ্যাড়ার রাজনীতিতে। পূর্ব্ববঙ্গে সে রাজনীতি ধিকিধিকি আজও চলছে। ভিটা ছেড়ে তারা আজও আসছে এই বাংলায়। এই বাংলা যে সে মাটি নয়। আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। রোগ না ছড়ানোর। রোগ সারানোর। মা কালী সকলের মঙ্গল করুন।

1 Comment

Filed under বাংলা, Bengal, Kolkata, Religion

উবার চড়ে যাচ্ছি কোথায়?

খুব বেশিদিন আগের কথা বলছি না, কলকাতায় একটা সময় ছিল যখন গাড়ি চড়ে কোথাও যাবার মানে ছিল হয় প্রাইভেট গাড়ি বা টেক্সী। কিন্তু স্মার্টফোন ভিত্তিক আপ-এর দৌলতে ২৮ ঘন্টা  তত্ক্ষণিক ভাড়া গাড়ি বুকিং ব্যবস্থা ভারতের কিছু কিছু শহরের এক বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উবার বা ওলা গোছের কোম্পানিগুলি এখানে খুবই ভালো ব্যবসা করছে।  এছাড়া তাদের জোরদার বিজ্ঞাপনের ফলে তাদের নাম ছড়িয়েছে যথেষ্ট। আমাদের এই বাংলাদেশের পশ্চিমাংশে  তাদের এমনই রমরমা ব্যবসা যে উবার কোম্পানি জানিয়েছে যে মার্কিন কলকাতাই তাদের  বাড়তে থাকা বাজার এবং তাদের এই বৃদ্ধির হার তাদের লন্ডনের ব্যবসার চেয়েও বেশি। ভারতে  কলকাতার পরে তাদের সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা বাজার হলো মুম্বইর। এই ধরনের পরিষেবা বিশ্বের অনেক জায়গাতেই চিরাচরিত লাইসেন্স প্রাপ্ত টেক্সী ব্যবসার লাভের গুড়ে থাবা বসিয়েছে। সেটা এখানকার ক্ষেত্রেও সত্যি। ফ্রান্স থেকে দক্ষিন আফ্রিকা, নানা জায়গায় ট্যাক্সি চালক তথা মালিক ইউনীয়ন্গুলি উবারের ব্যবসা পদ্ধতিকে অনৈতিক ও বে-আইনি বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে – যে ধরনের সরকারী নজরদারির স্বীকার সাধারণ তেক্সীরা, বা যতরকমের কর তাদের দিতে হয়, তার ফলেই উবারদের সাথে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। উদাহরণ স্বরূপ, টেক্সী না যেতে চাইলে আইনে জরিমানার ব্যবস্থা আছে, উবারদের ক্ষেত্রে এমন কোন আইন-ই নেই। সাধারণ টেক্সীগুলি বেসরকারী মালিকানাধীন হলেও সে ব্যবসা বেশ ভালো পরিমানে সরকারী নিয়ন্ত্রনের আওতায়।  টেক্সী ভাড়ার তালিকাও সরকারের সাথে বোঝাপড়া করে ঠিক হয়। উবার-ওলারা তাদের রেট্ ঠিক করে ও বদলে নিজেদের ব্যবসা মাফিক, নানারকম ছাড় ও অন্যান্য বিপণন-ফন্দিরও তারা সাহায্য নিয়ে থাকে, যা সাধারণ টেক্সী আইনত পারে না।

এই ভাবে যখন কোথাও এক ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বেসরকারী পরিবহণ ব্যবসার একটা রেকর্ড প্রসার ঘটে, তখন সেই জায়গার গণ-পরিবহণের অবস্থা ও মান সম্পর্কে প্রশ্ন মনে চলেই আসে। তাই ভারতের প্রধান শহরগুলির গণপরিবহনের মান বিশ্বের নিরিখে দেখে নেওয়া যাক। ‘ফিউচার অফ আর্বান মোটিলিটি ২.০’ নামের বিশদ একটি জরিপ-ভিত্তিক গবেষণার ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। এই জরিপ রিপোর্ট-টি প্রনিধানযোগ্য কারণ এতে বাজার-আদর্শ ও শ্বেতাঙ্গ-বিশ্ব ‘প্রগতি’ ও ‘উন্নয়ন’ বলতে যা বোঝায় (মূলতঃ চওড়া রাস্তা ধরে হুস-হুস করে যাওয়া রাশি রাশি সমাজ-বিছিন্ন প্রাইভেট গাড়ি) , তার কিছুটা বাইরে গিয়েও গণপরিবহনের মানের একটা মানাঙ্ক কষা হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরকে মাথায় রেখে। এই সব ফ্যাক্টরের কয়েকটি হলো – মোট যাত্রা-সংখ্যার মধ্যে গণপরিবহনের সাহায্যে করা যাত্রার হিস্যা, স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার, রাস্তার ঘনত্ব, গণপরিবহনের বৈচিত্র এবং সেগুলি কত সময় অন্তর অন্তর আসে, সরকারী পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ, ইত্যাদি। সারা বিশ্বের ৮৪টি বৃহৎ শহরে এই নিয়ে গবেষণা ও জরিপ চালানো হয়।  তার থেকে পাওয়া ফলগুলি এইরকম। ভারতে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী মুম্বই-এর হাল মার্কিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি-র চেয়ে সামান্য ভালো, লস এঞ্জেলেস পিছিয়ে আছে চেন্নাই-এর থেকে। অনেকের ধারনায় ভারতে ‘উন্নত’ দিল্লির হাল এই বহুমাত্রিক গণমুখী ফ্যাক্টরগুলির নিরিখে বেশ খারাপ – সেটির স্থান ৮৪টি শহরের মধ্যে শেষের দিক থেকে ৫ম। কলকাতা হলো ভারতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ – ৮৪র মধ্যে তার স্থান ৩১, যার মানে আমরা নিউ ইয়র্ক, মন্ট্রিয়ল, টরন্টো ও সিডনির থেকে এগিয়ে আছি। জনসংখ্যার অনুপাতে ব্যক্তিগত গাড়ি মালিকানার হার ভারতের মেট্রো শহরগুলির মধ্যে কলকাতায় সবচেয়ে কম। পয়লা স্থান অধিকার করে হংকং। প্রসঙ্গত এই পরিমাপে ঢাকার রেঙ্ক করাচীর থেকে খারাপ কিন্তু বেঙ্গালুরু বা ওসাকা বা মায়ামির থেকে ভালো। এই রেঙ্কগুলি আমাদের যদি অবিশ্বাস্য লাগে, তার থেকে এই বোঝা যায় যে দুনিয়ায় উন্নয়ন ও প্রগতির জনবিরোধী হেজিমনিক ধারণা আমাদের কল্পনা ও ইপ্সাকে কতটা গুলিয়ে দিয়েছে যার ফলে আমরা সামনে ঘটমান বাস্তবকে দেখেও দেখি না, হাঁ করে অন্যত্র তাকাই। মাথার মধ্যে ভালো-খারাপ-গণমুখী-জনবিরোধী এইসব ব্যাপারগুলি কেমন গুলিয়ে মিলিয়ে দিয়েছে বাজার ও ক্ষমতার যুগলবন্দীতে তৈরী আমাদের এই ‘কমনসেন্স’। আর কলকাতা ও মুম্বই-এর তুলনামূলক ভালো স্থানের কারণে এরই রহস্যময় ও বেমানান লাগে সেই প্রাথমিক তথ্যটি – যে ভারতে উবার যে ধরনের  ব্যক্তিগত পরিবহণ ব্যবসা করে খায়, তাতে তারা সবচেয়ে সফল ঠিক এই কলকাতা ও মুম্বই-তেই।  আসলে ঘটছে তা কি? আমার কিছু আন্দাজ আছে।  আর সেই আন্দাজের হাত ধরে মনে আসে কিছু আশঙ্কা।

ভারতের শহরগুলির প্রায় সবকটিই অতি বিভক্ত শহর – বিভক্ত শ্রেণী, জাত ও অন্যান্য নানা ফেক্টর দ্বারা। আমরা এলিট বলতে বুঝি টাটা-বিড়লা।  আর বাকি সকলেই নিজেদের মনে করে মধ্যবিত্ত – অথচ এই মধ্যবিত্ত প্রায় কিছুতেই কোন কিছুর মধ্যস্থান অধিকার করে না – অর্থ-সামাজিক ভাবে তো নয়-ই। এই উপমহাদেশে এই গোষ্ঠিকে তুলনামূলক-ভাবে কম এলিট বলা যেতে পারে, কিন্তু এলিট তারা বটেই।  এই গোষ্ঠির নিজের গাড়িতে চেপে সবসময় সবজায়গায় যাবার সামর্থ্য নেই, যার ফলে তাদের অনেক ক্ষেত্রেই না চাইলেও অগত্যা গণ-পরিবহণের শরণাপন্ন হতে হয়। তাদের জীবনের এই অংশটি তাদের খরুচে ‘ট্রেন্ডি’ জীবনযাত্রার সাথে খাপ খায় না। গণপরিবহনে তাদেরকে এমন সমস্ত মানুষজনের পাশে বসতে হয়, এমন সমস্ত মানুষের গায়ের গন্ধ ঘামের গন্ধ নাকে আসে, ভিড়ের মান্ঝে এমন মানুষের থেকে ঠেলা ও গুঁতো খেতে হয়, নিজে দাঁড়ানো অবস্থায় এমন সব মানুষকে বসা অবস্থায় দেখতে হয়, যাদের কিনা তারা তাদের জীবনের অন্য সকল অঙ্গন থেকে নির্বাসিত করেছে সফলভাবে – নানা ধরনের প্রকাশ্য বা ছদ্ম ভৃত্য ভূমিকা ছাড়া। উবার-ওলার সাফল্যকে এই আঙ্গিকে দেখা প্রয়োজন। প্রথমতঃ।এর ফলে ‘পাবলিক’ থেকে নিজেকে স্থানিক-ভাবে আলাদা করা যায় – অর্থাৎ একই জায়গায় বসে যাতাওয়াত করতে হয় না, একই যানের মধ্যে বসে। দ্বিতীয়তঃ, পাবলিকের থেকে কালিক ভাবেই আলাদা হওয়া যায় – তাদের ২৪ ঘন্টা তত্পর পরিষেবার কারণে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যে সময় গনপ্রবহনের অপ্রতুলতার জন্য বেশি ঘোরাফেরা করতে পারে না, যেমন ধরা যাক গভীর রাত, এই শ্রেণী সেই সময়গুলিকে কেন্দ্র করে নিজেদের জীবনধারা সাজিয়ে নেয়। সমাজের কিছু পাত্র-পাত্রীর মধ্যে জনসাধারণের থেকে নিজেদের আলাদা করে স্থান-কালের মালিকানা নেবার যে মানসিক ইপ্সা, উবার-ওলারা সেই বৈকল্যের ইচ্ছা-নদীতে সাঁকোর কাজ করে।  তার উপর দিয়ে আমাদের মত কিছু মনুষ তরতরিয়ে চলে যায় ইপ্সিত ওপারে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, সুরক্ষিত ভাবে। বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি থেকে লেটনাইট পার্টি করে হিন্দুস্থান পার্কে ফেরত আশা হয়ে যায় জলভাত। শহরেরএলিটদের  জীবনে কিছু নতুন স্রোতের জন্ম হয়। কে কোথায় কখন কি ভাবে আসছে-যাচ্ছে, তাতে কারোর কিছু এসে যেত না, যদি না এই অর্থ-সমাজিক গোষ্টির প্রভাব ও প্রতিপত্তি তাদের সংখ্যার তুলনায় দৃষ্টিকটু ভাবে অনেক বেশি না হতো। কিন্তু বাস্তবে, তাদের উদ্বেগকে পাত্তা দেওয়া, তাদের সুরক্ষাকে সিরিয়াসলি নেওয়া, তাদের ইছাগুলিকে প্রশমিত করা হয়ে ওঠে  নগরের সরকারী ও বেসরকারী অধিপতিদের প্রথম কর্তব্য – কারণ যে মাছের মুড়ো এরা. তারই পেটি হলো উবার-ওলা শ্রেণী।  সংবাদমাধ্যমের বড় অংশও এই ক্ষুদ্র অংশের উদ্বেগ-সুরক্ষা ইত্যাদিকে এমন ভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে একটা ‘গণ’ চরিত্র দেবার চেষ্টা করে যে মনে হতেই পারে যে আমরা ইতিমধ্যেই একটি আর্থ-সামাজিক বৈষম্যহীন মিডিল ইনকাম সমাজে পরিণত হয়েছি।

এর একটি কুফল দেখা গেছে সম্প্রতি।  যখন ভারতে রাস্তা-ঘাটে নারী নিরাপত্তার মত একটি গুরুত্তপূর্ণ বিষয় নিয়ে বেশ একটা জনমত তৈরী তৈরী হচ্ছিল, উবারের একজন চালক দ্বারা এক মহিলা যাত্রীর ধর্ষিত হবার ফলে নারী নিরাপত্তা সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি এই প্রতাপশালী গোষ্টির উদ্বেগের জোরে পর্যবসিত হলো উবার গাড়ির নিষিদ্ধকরণ ও উবার চালকদের নিয়োগের আগে পূর্ব অপরাধ বিষয়ক খোজখবর নেওয়া গুরুত্ব ইত্যাদিতে। ভারতে, নারীদের এক বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের কাছে  ভাড়া করা বা নিজ মালিকানাধীন গাড়িতে একা চলাফেরার সুবিধে-বিপদ সংক্রান্ত যে আলোচনা, তা একদমই অপ্রাসঙ্গিক কারণে তাদের জীবনের বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই। অথচ ‘নারী নিরাপত্তার’ মোড়কে মিডিয়ায়ে আদতে চলল এলিট নারীদের নিরাপত্তার পুঙ্খানুপুন্ক্ষ আলোচনা।

যখনই সমাজের ক্ষমতাধারী ও গনপরিসরে-কি-আলোচিত-হবে-তা-নির্ণয়কারী গোষ্ঠীগুলি সর্বসাধারণের জন্য তৈরী পরিষেবাগুলি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তখন সেই সেই পরিষেবার মান নিম্নগামী হয়। কারণ পরিষেবাগুলি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিলেও সেই পরিসেবা চালনা সংক্রান্ত সকল ক্ষমতা এই গোষ্ঠীই কুক্ষিগত করে রাখে। তখন এদের নির্দেশে-উপদেশে সরকার যা করে তা হলো অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক ভাবে বন্টিত গণপরিষেবা থেকে অর্থ শুষে বার করে তারা ঢুকিয়ে দেয় এমন সব পরিষেবায় যা আপাত ভাবে সর্বসাধারণের জন্যে হলেও বাস্তবে কাজে লাগে মূলতঃ এলিট শ্রেনীর-ই। পূর্ব্বে উন্নত মানের এবং নির্ভরযোগ্য সংস্থা যেমন বৃহৎ সরকারী হাসপাতাল বা সরকারী ইস্কুল এই গোত্রে পড়ে। এলিট শ্রেণী এক-কালে এসব জায়গায় যেতো।  তারপর যখন তারা সরকারী ভর্তুকি ব্যবহার করে নিয়ম বদলিয়ে বেসরকারী পুঁজি দিয়ে এসব ক্ষেত্রে নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা করলো, তখন সরকারী সংস্থাগুলিতে তাদের আর কোন আগ্রহ রইলো না।  যে সর্বসাধারণের গরুর দুধ তারা রোজ খেতো এবং সেই কারণে বিচালি দিত, পরিষ্কার করত, সেই গরুর দুধ বেচে তারা তৈরী করলো নিজেদের মালিকিনাধীন গরুর  প্রাইভেট গোয়াল। কলকাতায়, টিবি হাসপাতাল ১ টাকা দিয়ে বেসরকারী সংস্থাকে বেছে তৈরী হলো কেপিসি হাসপাতাল।  ঢাকুরিয়ার এএমআরআই হাসপাতাল ও সরকারী মালিকানা থেক বেসরকারী মালিকানায় দেওয়া হলে ১ টাকার নাম-কে-ওয়াস্তে অঙ্কের বিনিময়ে।  শর্ত থাল এখানে একটা বড় শতাংশ বেদ থাকবে গরিবের জন্য সংরক্ষিত।  বলাই বাহুল্য, সেই সংরক্ষণ থেকে গেছে কাগজের পাতায়, এগ্রিমেন্টের দলিলে। আমি যেটা বলতে চাই সেটা এই যে ভারতে সরকারী হাসপাতাল বা ইস্কুলের মানের নিম্নগামী মানের সাথে এলিট শ্রেণীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নিজ বিকল্প করে তলার ব্যাপারটি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। দুটো আলাদা ঘটনা নয়। তাই আশঙ্কা হয়, হারত সরকারের জোরদার প্রাইভেট গাড়ি তৈরী ও বিক্রির ক্ষেত্রে নানা রকম আর্থিক উত্সাহপ্রদানের যুগে উবার-ওলার বিস্ময়কর ব্যবসায়িক সাফল্য দেশের মোটামুটি ভাবে চলনসই গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য কোন অশনি সংকেত বয়ে আনবে ? আরেকটু ব্যাপক ভাবে বলতে হলে, যে দেশ ও সমাজের শক্তিশালী নীতিনির্ধারক অংশ ব্যাপক গণ-মানুষের কোনরকম ছোয়া থেকে নিয়েজদের দূরে রাখতে চায়, এমন বৈসম্যযুক্ত সমাজপতি-ওয়ালা সমাজের ভবিষ্যত কি?

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Democracy, Dhaka, Elite, Kolkata, Urbanity

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উত্কর্ষ – পিছিয়ে থাকা নিয়ে কিছু ভাবনা

প্রতি বছর বিশ্বের কিছু নামী সংস্থা দুনিয়ার সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশাল রেঙ্কিং তালিকা এনে উপস্থিত করেন। কোন বছরেই কোন তালিকাতেই সেখানে ভারতীয় সংঘরাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ২০০-র মধ্যে আসে না। সেই নিয়ে এখানকার কিছু লোক একটু চিন্তা ব্যক্ত করেন। আর কেউ কেউ বলেন ওসব রেঙ্কিং আসলে পশ্চিমা দুনিয়ার চক্রান্ত, যাতে কিনা আমাদেরকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয় (তারা বেমালুম চেপে যান যে শ্রেষ্ঠ ২০০-র তালিকায় একাধিক এশীয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকে, থাকে চীনের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়)। যেসব পন্ডিত মনে করেন যে সমগ্র বিশ্ব একমাত্র আমাদেরকে কোণঠাসা করার জন্য এই শ্রেষ্ঠত্বের তালিকা থেকে আমাদেরগুলিকে বাদ দ্যান, তাদের জানা উচিত, এই ধরণের বিশ্ব-ষড়যন্ত্র মার্কা ধারণা গভীর মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক ধারা বা ধর্মীয় ধারা এমন ভাবে নিজেদের সকল বিশ্বের ষড়যন্ত্রের স্বীকার বলে প্রচার চালায়। এই সব সেয়ানা কারবারীদের চেনা প্রয়োজন। এরা কেউ অসুস্থ নয় – ষড়যন্ত্রের শাঁক দিয়ে নিজেদের ভেতরের পচনের মাছ ঢাকার একটা নিষ্ফলা চেষ্টা করেন এরা। এর ফলে বন্গায়ে শিয়াল রাজা হয়ে অন্যান্য রদ্দি শেয়ালদের থেকে বাহবা পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্ব-দরবারের বেঞ্চিতে এক ইঞ্চি জায়গা-ও জোটে না।

এই ধরা যাক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০-টা  বিশ্ববিদ্যালয় – সেগুলির কিছু বৈশিষ্টের দিকে একটু মন দিয়ে দেখি। তারপর নিজেদের সাথে তুলনা করি। আপাতত টাইমস হায়ার এডুকেশন রেন্কিং মেনে চলি, যদিও কিউ.এস এবং এ.আর.ডাব্লু.ইউ, এই দুটিও যথেষ্ট খ্যাতনামা। আমাদের সঙ্গে সবচেয়ে বড় একটা তফাত হলো যে এই শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্নাতক স্তরের কোর্সগুলো মূলতঃ হয় সেই দেশের প্রচলিত মাতৃভাষায়। এবং সেই দেশে ইস্কুল্গুলির, পাঠ্যবই-এর মধ্যেও মাতৃভাষার দাপট-ই বেশি – এটা কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন চৈনিক, সুইডিশ, ইংরেজি, জাপানি, জার্মান, অর্থাত যে সব দেশের মাতৃভাষার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শ্রেষ্ঠ ৫০-এর তালিকায় আছে, এই সকল ভাষার ক্ষেত্রেই সত্যি। আমাদের এই বাংলাদেশে তথা দিল্লি-তে অনেক পন্ডিত বলেন যে মাতৃভাষায় ব উচ্চ-শিক্ষা হলে সমাজ পিছিয়ে পড়বে। তথাকথিত এক আন্তর্জাতিক পরিসরের দোহাই দিয়ে বলা হয় এইসব। তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে মাতৃভাষা-হীন উচ্চ-শিক্ষা দিয়ে ইংরেজি-ভাষা প্রচলিত দেশের জন্য প্রযুক্তি-ব্যবসার ঝাঁকা-মুটে  বা মূলতঃ শ্বেতাঙ্গ বাচ্চাদের আমদানি করা ‘বৈচিত্রময়’ অধ্যাপক হওয়া সম্ভব, কিন্তু নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষাকে দুরে রেখে উত্কর্ষ তৈরী কঠিন। রাজনৈতিক নেতারা যতই ‘সেন্টার ও এক্সেলেন্স’ লেখা শ্বেতপাথর উদ্বোধন করে জনগণ-কে ধোঁকা দিন, এক্সেলেন্স-হীনতার এই ফাঁকি এইসব রেঙ্কিং তালিকায় ধরা পড়ে যায়। এছাড়াও এর ফলে মাতৃভাষায় শিক্ষিত ইস্কুলের গন্ডি পেরুনো যে শিক্ষার্থী-সমাজ, যারা কিনা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদেরকে অবহেলা করে, প্রান্তিক করে দিয়ে, হীনমন্যতায় ভুগিয়ে তাদের মেধা সম্পদ নষ্ট করা হয়। এই সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয় দেশ ও জাতি।  অবশ্যই এর পিছনে রয়েছে আমার মতো ইংরেজিতে পরা ভদ্রলোকের বাচ্চার কায়েমী স্বার্থ। এই মাতৃভাষায় শিক্ষিত সমাজকে প্রান্তিক করে রাখা নিয়ে রেঙ্কিং হলে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়-গুলি যে বিশ্বে প্রথম ৫০-টি স্থান অধিকার করবে, এ নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। তবে নিজেদের কায়েমী স্বার্থকে কি করে সর্বসাধারণের স্বার্থ হিসেবে দেখিয়ে ক্ষমতা ও প্রাধান্য ধরে রাখতে হয়, তার ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেনিং দিতে আমরা ওস্তাদ।  পশ্চিমবঙ্গে অধ্যাপকের চাকরি লোভনীয়। নানা দেশের অধ্যাপকের মাস মাইনের সঠিক তুলনা (অর্থাৎ সেই পরিমাণ অর্থের সেই দেশে ক্রয়ক্ষমতা – যাকে বলে পারচেসিং পাওয়ার) করলে দেখা যায় যে এদেশের অধ্যাপকেরা গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী, ফ্রান্স, জাপান প্রভৃতি দেশের অধ্যাপকদের থেকে বেশি ক্রয়ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের পিছিয়ে থাকাটা টাকাকড়ির কারণে না।

কি কি দেখা হয়েছে এই সব রেন্কিং-এ ? রয়েছে গবেষনার খ্যাতি ও পরিমাণ, শিক্ষা-দানের খ্যাতি, তবে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ‘সাইটেশন ইম্পেক্ট’-এ।  অর্থাৎ এই যে জনগণের টাকা নিয়ে বিদ্যাচর্চা ও গবেষণার আয়োজন, তাতে যা পয়দা হচ্ছে, তা কি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্বে অন্যদের নজরে আসছে, তারা কি সেগুলির কথা বলছেন, নিজেদের কাছে ব্যবহার করছেন ? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মূলতঃ জ্ঞান দেবার জায়গা, নতুন জ্ঞান তৈরী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৌণ। এর ফল খুব সহজ। আমরা এখুনো  হা-পিত্যেশ করে বসে থাকি সাহেব-মেম-রা নতুন কি বার করলো। যেহেতু নিজেদের উঠোনে হয়না সেসব কাজ, তাই আমদানি করা জ্ঞান সিলেবাস ভুক্ত করতেও হয়ে যায় বিরাট সময়ের ব্যবধান। আর এই কারণেই চলে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি-ছাটার সময়ে দেশে আশা স্বজাতীয় পরিযায়ী পাখি অধ্যাপকদের নিয়ে একটা আদেখলাপনা। সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে ওঠে বিদেশে কে কত নাম করলো। ফলে গবেষনার বিষয়-গুলিও মূলতঃ হয়ে যায় বিদেশের সমাজের মাথাব্যথার উপশম করার
‘আন্তর্জাতিক’ প্রকল্পে হাথ লাগানো বা শ্বেতাঙ্গ পন্ডিতকুলের আভ্যন্তরীণ বিতর্কে নাক গলিয়ে জাতে ওঠার চেষ্টা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এদেশের
ব্যবস্থা ঠিক এই ধরনের আচরণ-কে পুরস্কৃত করে।

অথচ এহেন গুরুদের প্রশ্নবিদ্ধ করার সংস্কৃতিকেও এখানে বেশ জোর দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়।  যেখা চিত্ত হওয়ার কথা ভয়-শূন্য, সেখানে
সামন্ত্রতান্ত্রিক গুরুবাদের ঠেলায় তৈরী হয় ত্রাসের পরিবেশ। প্রশ্ন করতে নেই, নিলে স্যার রেগে যাবেন, তারপর স্যার তার ক্ষমতা-মতো ‘দেখে
নেবেন’, তখন কে বাঁচাবে ? জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা এমন এক জিনিস, যেখানে সব কিছুকে অনাবৃত করতে হয়।  যেখানে যুক্তির শানিত ব্যবহারে অধ্যাপক-কে কাছাখোলা করাটাই শ্রেয়, সেইসব ক্ষেত্রে গুরুর ঘরের সামনে মাথা নোয়ানোকে মনে করা হয় আদর্শ ব্যবহার। মেধার বিকাশের জন্য গুরু-ভজনা নয়, গুরু-মারা বিদ্যা আয়ত্ত করা প্রয়োজন।  এবং দরকার সেই ধরনের গুরু, যারা ছাত্রদের গুরু-মারা জ্ঞানচর্চা করতে উত্সাহিত বোধ করেন, ‘আমি জানি না’ -পরিষ্কারভাবে  এই বাক্যটি  ভাবে বলতে পারেন সকলের সামনে।  এক্সেলেন্স ফলে মানুষের মাঝে মুক্তচিন্তার অঙ্গনে, শিক্ষামন্ত্রীর বাণীতে  না, ফলকে না, অধ্যাপকের চেয়ারে রাখা তোয়ালের নিষ্ফলা ‘মর্যাদা’তেও না।

মতান্তর ও বিতর্ক হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। ক্ষমতার সান্নিধ্য মুক্ত-চিন্তার কাছে বিষময়। ঠিক সে কারণেই চিরকাল-ই প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ত্বের সাথে মেধা ও উত্কর্ষের একটা সম্পর্ক থেকেছে আর ক্যাম্পাসে সরকারপন্থী ছড়ি ঘোরানোর রাজনীতি জন্ম দিয়েছে গতদিনের
প্রফেসর অনিল ও আজকের  প্রফেসর শঙ্কুদের। এই বাংলার অন্যতম ভালো বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুরে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা-সভা করতে অনুমতি দেওয়া হয়না, উপাচার্যের টুকলি-করা গবেষণা-পত্র ধরা পড়েও চাকরি থেকে সে বরখাস্ত হয় না – সসম্মানে ফিরে যায়ে পুরনো আস্তানায় – আরেক ‘উত্কর্ষ’ কেন্দ্রে, নিরাপত্তার নাম করে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর সিসিটিভি নজরদারী চালানো হয়। যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তা ও আলোচনার বিষয়
কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষ, অধ্যাপক-বেশী চোরেরা আসল অধ্যাপকদের দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেন, খাঁকি জামাপরা পুরুষ সরকারী কর্মীরা
সুরক্ষার নামে যুবক-যুবতীরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে কখন-কোথায়-কি করছে, তা টিভি-তে দেখার মত অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকে, সে দেশের কোন
বিশ্ববিদ্যালয় যে বিশ্ব-বরেণ্য তালিকায় নেই, এতে এত আশ্চর্যের কি আছে। তবুও এর মধ্যেই যাদবপুরের নয়া উপাচার্য্য সুরঞ্জন দাস যাদবপুরে
সিসিটিভি-গুলি নামিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।  শুরুটি ভালো। কার তাতে কি, আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি।

Leave a comment

Filed under Academia, বাংলা, Bengal, Education, Knowledge, Kolkata, Language

ভারত ও ঢাকার মাঝখানে – অনিকেত প্রান্তর

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সাথে ভারতীয় সংঘ-রাষ্ট্রের নরেন্দ্র মোদীর চুক্তির ফলে নিরসন হলো ছিটমহল অধ্যায়, যদিও এর মধ্যেই অন্য রাষ্ট্র  বেছে নেওয়ায়ে সংখ্যালঘু ঘর ইতিমধ্যেই ঘর জ্বলেছে এক রাষ্ট্রে । অদ্ভূত জিনিস এই ধর্ম, রাষ্ট্র ও নাগরিকত্বের টানাপড়েন-গুলি।  আর এসব  এলোমেলো করে দেওয়া সেই অদ্ভূত শব্দটি – ‘জন্মভূমি’। বাংলাদেশের অন্তর্গত ‘ভারতীয়’ ছিটমহলে ‘ভারতীয়’ নাগরিক শিশু পাশের গ্রামে (অর্থাৎ বাংলাদেশে) গিয়ে শিখেছে যে তার প্রধানমন্ত্রী হলো শেখ হাসিনা। সর্বার্থেই ছিট-মহল গুলি প্রান্তিক, এমনকি রাষ্ট্রও তাদের থেকে আনুগত্য দাবি করে না। ভারতের নাগরিক নিজেকে ভারতীয় মনে করে কিনা, তেরঙ্গা দেখে সটান হয় কিনা, গান্ধী দেখে শ্রদ্ধা দেখানোর ভাব করে কিনা, ক্রিকেটে পাকিস্থান-ঘেন্না করে কিনা, ছিটমহলবাসীদের ক্ষেত্রে ভারতের তাও এসে যেত না। আজকালকার রাষ্ট্র-ভিত্তিক বিশ্ব-চরাচর-কল্পনার দিনে  দিনে এর চেয়ে হতোছেদা আর কি করে করা যেতে পারে। যাই হোক, আশা করা যায় যে এখান থেকে দুই দেশের বাচ্চারা ঠিক ঠিক পতাকা দেখে ঠিক ঠিক সটান হতে শিখবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী, যিনি ঘুণাক্ষরেও সোসিয়াল মিডিয়া-তে হিন্দি ছাড়া কোন দেশী ভাষায় তার প্রজাদের বার্তা পাঠান না, এ হেন পাক্কা ভারতীয় জাতীয়তাবাদী পূর্ব্ববাংলা সফরকালে সস্তা চমক দিয়ে সেখানকার বাঙ্গালীর মন জয় করার জন্য টুইট করলেন বাংলায়। একজন পশ্চিম-বঙ্গবাসী হিসেবে এটা  কতটা অপমানজনক যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাঙ্গালী হিসেবে আমাদের সেটুকু স্বীকৃতিও দেয় না, যতটা কিনা পূর্ব্ব-বঙ্গবাসীদের দেয়। আকাশ খুব অন্ধকার।  আমরা একটু নিজেদের ভাঙ্গা সিঁড়দারাটার দিকে চেয়ে দেখি, একটু লজ্জা পাই, একটু ক্ষুব্ধ হই, একটু আত্মসম্মান সঞ্চয় করি । স্বীকৃতি দিক না দিক, দিল্লি বাংলা ও অন্যান্য রাজ্যের থেকে করের টাকা নিয়ে খয়রাতি করে আসবে বিদেশে একটি বিশেষ ভাষা-কে ‘ভারতের  মুখ’হিসেবে ফোকাস দেওয়ার জন্য। এবার-ও নরেন্দ্রভাই-এর ঢাকা সফরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে নতুন দিল্লির সরকার বাহাদুরের কল্যানে। বাঙালি, তামিল, অহমিয়া, তেলুগু, কন্নড়-ভাষী মানুষেরা এটা জেনে প্রীত হবেন যে তাদের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব-টা হিন্দী আপনাদের না জানিয়েই নিয়ে নিয়েছেন আর সাথে নিয়েছে আপনাদের করের টাকা।  বলাই-বাহূল্য, নতুন দিল্লীর খয়রাতি পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগটির নাম হিন্দী। আর এই সব খয়রাতি করে অনেকে ভেবেছেন ওরা হেব্বি খুশি।  ওরা কিন্তু অনেকেই বেশ রেগে আছেন।

কলকাতার হো চি মিন সরনীর নাম অনেকেই শুনে থাকবেন।  কেউ কেউ হয়তো জানবেন যে এই রাস্তার আগের নাম ছিল হ্যারিংটন স্ট্রীট। কে এই হ্যারিংটন? ইনি ফিরিঙ্গি কোম্পানির আমলে নিজামত বা সদর আদালত-এর প্রধান বিচারক ছিলেন।  ১৮২৩ সালের  ২৮ জুন তিনি লিখিত মন্তব্য করেন যে সতীদাহ প্রথা যদি তখুনি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলেও এই নিষিদ্ধকরণের বিরুধ্যে তেমন কোন রাজনৈতিক আন্দোলন তিনি আশা করেন না। অর্থাৎ জনগণ সে অর্থে সতিদাহর পক্ষে ছিল না। সতী-দাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয় এর ছয় বছর পরে, ১৮২৯ -এ। নানা বিরুদ্ধতা উপেক্ষা সত্তেও সতিদাহ নিষিদ্ধকরণের যে প্রকাশ্য নায়কদের কথা আমাদের চিরকাল জেনে এসেছি, কিন্তু নেপথ্য নায়ক যে জনগণ, তাদেরকে স্বীকার করে নেন হ্যারিংটন। ফলে নায়কদের উচ্চতা একটু কমে, তাদের সংগ্রাম একটু ফ্যাকাশে হয়। তবুও সেটাই বাস্তব।  হ্যারিংটন-এর নামের জায়গায় হো চি মিন  দিয়ে সেটা ভোলা যায় না।  তবে হো চি মিন নামকরণের ছিল আরেকটি উদ্দেশ্য, এবং সেটি কিন্তু গর্ব করার মতো। এই রাস্তাতেই মার্কিন কনসুলেট। ভিয়েতনাম-এ মহিলা-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে মানুষকে হত্যা করার যে নৃশংস খেলায় মেতেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এটা ছিল তার-ই বিরুধ্যে কলকাতার নিজের মত করে প্রতিবাদ। একটু লজ্জা দেওয়া, একটু বিড়ম্বনায় ফেলা। কলকাতার মার্কিন দূতাবাসকে আজ-ও হো চি মিন-এর নাম স্মরণ করতে হয়, না চাইলেও। নৃশংসতার প্রতিবাদ হিসেবে লজ্জা দেওয়ার মতো নাম পরিবর্তনের দাবি কিন্তু বেশ ছোয়াঁচে।  নিষ্পাপ শিশু ফেলানি-কে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বি-এস-এফ বাহিনী গুলি করে হত্যা করে দুই বাংলার সীমান্তে। গরীবের মেয়ে ফেলানির দেহ লটকে সীমান্তের কাঁটাতারে লটকে থাকে বেশ কিছু সময়। আর বিঁধে থাকে ‘অনুভূতিগুলো’। এই কাঁটা-তার-এ ঝুলে থাকা শিশুর ছবিটি ভারতের ‘স্বাধীন’ ও ‘মুক্ত’ সংবাদ-মাধ্যম খুব বেশি প্রচার না করলেও, সারা বিশ্ব জেনে গেছিল ফেলানিকে এবং তাকে খুন করা উর্ধি-ধারী বাহিনীকে, যাদের মাইনে  আমি আপনি দিই। বাঙ্গালীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ঢাকায় উঠেছিল প্রতিবাদের ঝড়, দাবি উঠেছিল সেখানকার ভারতীয় দুতাবাসের সামনের রাস্তার নাম বদলে  ফেলানির নামে করে দেবার জন্য। তারপর যা হবার, তাই হয়েছে।  গরিব মানুষের মেয়ের মৃত্যু নিয়ে প্রতিবাদ বেশিদিন টিকে থাকে না – ঘটনা হয়ে যায় সংখ্যা । ফেলানি ঝুলে ছিল যে কাঁটা-তারে, দুই বাংলার মধ্যে সে কাঁটা-তার বানিয়েছে দিল্লী। এতে ওপার থেকে অনুপ্রবেশ কমেছে কিনা, তার কোন খবর নেই , তবে এই কাঁটা-তার লাগানোর বরাত পেয়ে যে ঠিকাদার-রা কাজ করেছেন, তারা যাদের ঠিকাদার হবার নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের যে পকেট ভালই ভরেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। সেটাও আমার আপনার টাকা। তবে এটা যেহেতু ‘জাতীয় সুরক্ষা’র প্রশ্ন, বেশি হিসেব চাইবেন না। বেশি হিসেব চাইলে আপনাকে সিধা করার মত নানা কালা কানুন ভারতে মজুত আছে – অশোক-স্তম্ভের সিংহ-গুলি শুধু দাঁড়িয়ে থাকে না, কামড়ে রক্ত-ও বার করে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি পূর্ব্ব বাংলা ঘুরে এসে বললেন যে ছিট-মহল বিনিময়ের ঘটনা হলো বার্লিনের প্রাচীরের পতনের মতই ‘ঐতিহাসিক’। এই ‘ঐতিহাসিক’ ধারণাটা আমি কখুনই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। কোনটা ঐতিহাসিক, কোনটা নয়, কেই বা সেসব ঠিক করে দেয়।  তবে এটুকু জানি, যে দুই গরীব বাস্তুহারা টইটুম্বুর  বাংলার মধ্যে যে ‘অনিকেত প্রান্তর’, তার মাঝে কাঁটা-তার বসিয়ে আর যাই হোক, বার্লিনের প্রাচীর পতন হয় না। সীমান্ত-বাসী মানুষের ভাষা যারা বোঝে না, তাদের গায়ে উর্দি পরিয়ে, হাতে বন্দুক ধরিয়ে ধর্ষণ করানোকে, মন-মর্জি মতো মারামারি ও জিনিস-পত্র হাতানোকে, হতদরিদ্র মানুষ খুন করানোকে ‘সুরক্ষা’র নাম দেওয়া পাপ। এই পাপ কিন্তু আমাদের পয়সায় মাইনে পাওয়া-রা কিন্তু করে এপার বাংলার মানুষজনের সঙ্গেও।  এমন পাপ মা দূর্গা কখুনো মাফ করবেন কিনা জানিনা।

যখন এই দিল্লী-ঢাকা শীর্ষ দেওয়া-নেওয়া হচ্ছিল, পাশে থাকা থেকে সাথে থাকার সুললিত বাণী দেওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখুনই হাসিনা সরকারের প্রবাস কল্যাণমন্ত্রী মোশারফ হোসেন ফরিদপুরে তার বহুদিনকার চেনা একটি প্রথিত্জসা সংখ্যালঘু পরিবারের বসতবাড়ি জোর করে হাতিয়ে নেবার সব রকম ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। একদিন হয়তো সেই নিপীড়িত পরিবারের একজন ‘এপারে’ চলে আসবে। পশ্চিম-বঙ্গের বাঙ্গালীদের সংস্কৃতিক নিজস্বতাকে যারা স্বীকৃতি দেয় না, তাদের কোলেই খুঁজতে হবে নতুন আশ্রয় ও পরিচয়। তারপর তার এই নতুন প্রভু তার নিজের রাজনীতির খেলার অংশ হিসেবে দেখাবেন ‘নাগরিকত্বের’ লোভ। তাই দেখে পূর্ব্ব বাংলার কেউ কেউ বলবেন যে এমন ঘোষণা হলো অনধিকার-চর্চা। ঘর-পালানো মানুষটা কি আজ-ও ‘ওপারের’?  পূর্ব্ব বাংলার ভিটে ছেড়ে পালিয়ে আসা বাঙ্গালী হিন্দু ঠিক কোন মুহুর্তে ‘ইন্ডিয়ান’ হয়ে যায় এবং দেশ নিয়ে কিছু বলার অধিকার হারায়? পালানোর দিন ? বর্ডার পেরোলে ? ‘ইন্ডিয়ান’ নাগরিকত্ব পেলে? দুই পুরুষ পরে? নাকি এসবের অনেক আগে, ‘ভুল’ ধর্মে জন্মমুহুর্তে? আমি জানি না।

Leave a comment

Filed under Army / police, বাংলা, Bengal, Delhi Durbar, Dhaka, Foundational myths, Hindustan, Identity, India, Kolkata, Language, Partition, Religion

কুমিল্লা সংস্কৃতি উত্সব – স্পর্ধা অন্যতর

আমি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌছলাম পড়াশুনো করতে, তখন ওখানে স্থিত পশ্চিম বাংলার বাঙ্গালীদের মধ্যে অদ্ভূত আবিষ্কার করলাম। আপনি কোথাকার, এটা জিগেশ করলে, কেউ তার জেলা শহরের কথা বলেন না। প্রশ্নকর্তার ‘সুবিধার্থে’ বলেন যে তিনি কলকাতার।  কলকাতার একটা ব্যাপ্তি আছে।  ১৪৪ ওয়ার্ড-দিয়ে গড়া। আমি কলকাতা থেকে  বরানগরে  কর্মস্থলে যাই।  এটা কলকাতা নয়। কলকাতার উত্তরে একটা এলাকা। এখানকার অনেক মানুষ সহজ ভাবেই বলেন যে কাজে কলকাতায় যাচ্ছেন। আরেকটু উত্তরে ব্যারাকপুরে  কথাই নেই।  সেখানে এটা আরো পরিষ্কার ভাবে কলকাতা নয়, মানুষের ভাবনায়, চেতনায়, কল্পনায়। কিন্তু এই সব কিছু-কে কলকাতা মহানগরের মধ্যে মিলিয়ে দেবার প্রবণতার পিছনে আরেকটা কিছু রয়েছে। একটি শ্রেনীর হয়েছে, যারা কোনো কিছুরই নন গভীর-ভাবে।  তাদের ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক।  ‘গ্লোবাল’ দুনিয়ার ম্যাপে একটা খুঁটি পোতা  এবং অন্যদের কে বোঝানো – এটাই সেই আত্মপরিচিতির লক্ষ্য। এক সাথে রয়েছে স্থানীয় অনেক ব্যাপার থেকে এলিয়েনেশন। সেটা শ্রেণীগত কারণে হতে পারে, ‘গ্লোবাল’ সংস্কৃতির লেজুর-বৃত্তির ইপ্সায়  হতে পারে, স্থানীয় সংস্কৃতিক ধারা নিয়ে নিরক্ষরতাও একটা কারণ বটে। কিন্তু সকলে এমন নন। পূর্ব বাংলার যে মানুষদের সাথে আমার পরিচয়, তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাবে স্থানীয় পরিচয় গৌণ  নয়, বা নিজেকে ‘ঢাকা’র বলে জানানোর প্রবৃত্তি কম।  এটা অনাবাসীদের ক্ষেত্রেও সত্যি। আমার বাড়ি চেতলা এলাকায়। আমি এখুন সেখানে থাকি।  পড়াশুনো ও গবেষনার কারণে ৮ বছরের প্রবাস জীবন কাটিয়ে বাড়ি ফিরেছি। আমি অতি ভাগ্যবান যে এমন এক নিবিড় পারা-সংস্কৃতি, ধর্মাচার ও নানা রকম মানুষ ও বাজারের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি বড় হবার সময়ে। যেহেতু আমি চেতলার, বাকি কলকাতা বা ‘কলকাতা’ কে দেখার আমার যে দৃষ্টি , যার মধ্যে চেতলার ছাপ অনস্বীকার্য।  আর সেটা হবে নাই বা কেন?  মাটি থেকে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, হাওয়া থেকে নয়, এলিয়েনেটেড মানুষের আমদানি করা ভাঁজ থেকে না। স্বেচ্ছায় শিকড়হীন শ্রেণী যে পশ্চিম বঙ্গে ও কিছুটা পূর্ব বঙ্গেও রাজনীতিতে, ক্ষমতায়, সংস্কৃতিতে – অন্দরে ও বিশ্বের কাছে নিখিল বাংলাদেশের মানুষের ‘মুখপত্র’ হয়েছেন মূলতঃ শ্রেণীগত ভাবে এক ধরনের ইংরেজি ভাষায় সমাজকে স্থুল ভাবে সাহেবের কাছে ও একে অপরের কাছে প্রদর্শনের কারণে, এ আমাদের লজ্জা। দোষ তাদের না – দোষ বাকিদের, যারা এই জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ভয়, স্পর্ধাহিনতায়। মাটির থেকে, স্থানজ সংস্কৃতি থেকে বিছিন্ন শ্রেনীর এই আধিপত্যের বিরুধ্যে লড়াই একটা গভীর লড়াই – এর সাথে আমাদের যুগের সংস্কৃতিক সংকট, ও তার সাথে ক্ষমতার সম্পর্কের প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এই ‘আব্সেনটি ল্যান্ডলর্ড’ শ্রেনীর বিরুধ্যে সংগ্রাম কোন প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতিক প্রতিরোধ নয়। পশ্চিম-চালিত একমুখী বৈচিত্র-বিরোধী যে দানবের দুনিয়া জোড়া আস্ফালন আমাদের পোড়ার দেশগুলিতে, তার শিকড়হীন দেশীয় দালাল-দের বিরুধ্যে সংগ্রাম আসলে গণতন্ত্রিকরণের সংগ্রাম। এটাই এই যুগের গণ-লাইন। নানা বৈচিত্রের, নানা বিভন্গের মানব-জমিন কে দখলদার মুক্ত করা, যাতে কিনা ‘ডকুমেন্টেশন’ এর বাইরেও কিছু হয়, যাতে সে জমিতে নতুন ফসল ফোটে , যে জমিতে পূর্বসুরীরা ফসল ফলিয়েছেন – তার ধারাবাহিকতায় ও এবং সেই  স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে তার থেকেই বিচ্ছিন্নতায় – যে বিছিনতায় রয়েছে, যার থেকে বিছিন্ন, তার গভীর ছাপ।

এই কথাগুলি বলার কারণ হলো আমাদের সংস্কৃতিক ভাবনা ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও, কলকাতা-ঢাকা কেন্দ্রিকতার ঝোঁক স্পষ্ট। কল্কে পাবার যে সংজ্ঞা গুলি, কোন উদ্যোগ হলে সেটি কোথায় হতে হবে, করা করা না দেখলে তা প্রায় দেখার মতোই হলো না – এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে বেশ কিছু কুসংস্কার কাজ করে। ‘গ্লোবাল’ সংস্কৃতি থেকেও তাহলে কিছু কিছু কুসংস্কারের উদ্ভব হয় – সব কিছু আমাদের স্থানজ যাপন ও চর্চার দোষ না। কি বলেন ?

অনেক কিছুই হয় কলকাতায়।  কিছুতে লোক আসে, কিছুতে আসে না।  অনেক ক্ষেত্রে অপাত্রে দান হয়। যদিও সে চর্চার মাহাত্ম্য বোঝার আসল লোক অন্যত্র।  কিন্তু সেখানে হলে মহানগরবাসী আদৌ যাবেন না।  অত দূর যাওয়া যায় নাকি। বাঁকুড়া – সে তো বহুদূর।  কিন্তু সে বাঁকুড়া থেকেই তারা আসেন, কলকাতার অত্যধিক ত্যালা মাথার তেল একটু গায়ে লাগানোর জন্য।  এই ধরনের সংস্কৃতিক কেন্দ্রিকতা সংস্কৃতিকে একটা নিষ্প্রাণ ধারণার সাথে ঠিক আছে, কিন্তু যাপন ও স্থানের পরিপ্রেক্ষিতে, এলাকার জল-আবহাওবায় ভেজে না সে সংস্কৃতি। তাই হয়তো তা  ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটি’র না। ডানা ছেঁটে, তাকে সাইজ করে, ‘ডকুমেন্ট’ করে, রামের জিনিস শ্যামকে দেখিয়ে,  সংগঠক হিসেবে নিজের নাম দিয়ে, এক শ্রেনীর ঠিকাদার নাম কামান সংস্কৃতির ধারক বাহক ও সমঝদার হিসেবে।  এদের শিকর-হীনতার জন্যেই, স্থানীয় ভ্যালুস এদের জীবনে অপ্রাসঙ্গিক হবার কারণে, এদের গর্জে ওঠেন ‘ঘষা-মজা’ না-করা স্থানীয় সংস্কৃতিক প্রকাশের বিরুধ্যে। কেন্দ্রিকতায় এদের কায়েমী স্বার্থ। ‘কস্মপলিটানিজম’ এর নাম এক বিশেষ ধরনের সংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ এদের মূল-মন্ত্র, যেখানে ল্যাজ-কাটা শেয়াল ল্যাজ-ওলা শেয়ালদের নিজ ল্যাজ সম্বন্ধে লজ্জিত করানোর চেষ্টা করে, ‘উচ্চমার্গ’ ও সূক্ষতার দোহাই দিয়ে। গণসংস্কৃতি, জনসংখ্যা -এদের বড় শত্রু। তাই সেগুলিকে জোর করে অদৃশ্য করে দেওয়ার চেষ্টা চলে নিরন্তর। তাই তো মনে হয় অনেকের কথা শুনে না ‘ইউথ’ মানে সে যে কফির পেয়ালা ধরে এক ধরনের চর্চা করে।  বাকি কিছুই ইউথ না। অন্ততঃ তাদের ইউথ হয়ে উঠতে অনেকগুলি ধাপ পেরোতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে শিকড়হীনতার – মাথায় তেলের চেয়ে সেম্পু বেশি লাগানোর।

এত কথা বললাম, কারণ ক্ষমতার সঙ্গে সন্ধি করে যে সংস্কৃতিক স্রোত বইছে মহানগরে, তার থেকে আলাদা যে কোন উদ্যোগ-ই বিরুদ্ধতা।  দহয়ত এটা দুঃখের যে স্বাভাবিক ভাবে বাঁকুড়া তে থেকে বাঁকুড়া নিমজ্জিত থাকাও আজকে একরকম দ্রোহ। এতেই ‘গ্লোবাল’ সংস্কৃতির অসহনশীলতার প্রকাশ। এরই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে – এক, দুই, তিন নয় – ৫ বছরের কুমিল্লা সংস্কৃতিক উত্সব।

এই বাত্সরিক উত্সব কুমিল্লার মানুষের, অবারিত দ্বার সেখানে। সংগঠক এলাকার মানুষ, নতুন মানুষ এবং কুমিল্লার চশমা পরে বিশ্ব দেখে এসে ফের কুমিল্লায় আস্তানা বাঁধা মানুষজন – মনজুরুল আজিম পলাশ যার অন্যতম। এলাকার সংস্কৃতি, তার উপর যে নানা স্বার্থান্বেষী, বিদ্বেষী আঘাত – আধুনিকতার নাম, ধর্মের নাম – সে সকলের বিরুধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এই উত্সব। ঢাকা, কলকাতা, চিটাগাং, টরন্টো, চীন এসকল জায়গা থেকে মানুষ কুমিল্লা গেছিলাম।  বড় শহর থেকে মানুষ ছোট শহরে যাবে কিছু পাবার জন্য – জজ-জুরি হিসেবে না, অতিথি হিসেবে, নিজেকে ব্যাপ্ত করার সুযোগ হিসেবে – এটা আজকের সময়ে বড় কম কথা নয়। এবং সেখানকার গণ-সংস্কৃতির কাছে মাথা নবাবে, আঁজলা  ভরে নেবে, হয়ত বা কিছু দেবেও।  এই ভাবেই অতিথির চোখে দেখলাম এই অসাধারণ উত্সব।  সুসু অতীত চর্চা নয়, শুধু ‘সনাতন’ চর্চা নয়, আবার সেসব বাদ দিয়েও নয়, আবার সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা কে সামনে রেখে, অনেক স্বেচ্ছা-সেবকের উদ্যোগে হলো এই উত্সব।  এলাকার গণ-সংস্কৃতির ও গর্ববোধের কাঠামো যে মজবুত তা বুঝলাম কুমিল্লার একাধিক স্থানীয় দৈনিক কাগজ দেখে – এবং সেখানে এই উত্সবের উত্সাহী রিপোর্টিং দেখে।  আলাপ হলো কুম্মিলার কাগজের নির্ভিক দরদী সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয়ের সাথে।  আরো কত জানা হলো, কত কিছু শিখলাম।

এই সময়ে, এই স্পর্ধা করা যে কুমিল্লায়, তাদের কাছে যে মাল মজুত আছে, তা ঝুলি থেকে বার করে দেখালে, বাইরে থেকে লোক আসবে। তারাও আসবে নিজেদের একটু আধটু নিয়ে, নিয়ে যাবে অনেক বেশি।  আজকের কেন্দ্রিকতার দুনিয়ায়ে কুমিল্লা সংস্কৃতিক উত্সব ( কুমিল্লা কালচারাল ফেস্টিভেল) -এর স্পর্ধা অন্যতর বিশ্বায়নের এক মেনিফেস্টোর মত – গণসংযোগ, স্থানীয় সংস্কৃতিক স্বাক্ষরতা, মাটির সাথে সম্পর্ক, মানুষ সম্পর্কে শ্রদ্ধা, বিকেন্দ্রীকরণ, গণতন্ত্রীকরণ এবং নিজেকে পৃথিবীর কেন্দ্র মনে করা এক বহুকেন্দ্রিক পৃথিবীর কল্পনা করা।

গেছিলাম আমন্ত্রণে।  ফিরলাম এলাকাকে ও তার মানুষকে একটু চিনে, আর এও জেনে যে ঢাকা ও কলকাতার দিয়ে সংস্কৃতির সকল ধারা কে বাধ দেওয়া যায় না, এবং সেগুলি অনেক কিছুর জন্যই আদর্শ স্থান নয়।  আমার-ও কিছু পাওয়ার আছে কুমিল্লা থেকে। কাউন্টার ভ্যানগার্ড হয়ে হয়্তো তা ভ্যানগার্ড ধারণার সঙ্গে একটা সমালোচনা-মূলক সংলাপ। সেদিক থেকে কুমিল্লার এই উত্সব পথিকৃত। এলাকার গান ছিল, এলাকার নাটক ছিল, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আশা মানুষের একাধিক মাস্টার ক্লাস ছিল, মোটর সাইকেল স্টান্ট ছিল, আলাপ-আড্ডা-হেঁটে বেড়ানো ছিল। পর্যালোচনা ও আত্মসমালোচনা ছিল।  স্থানীয় অশুভ শক্তির সাথে যুগপত সমঝোতা ও বিরুদ্ধতার যে কঠিন আভ্যন্তরীন সংগ্রাম, তাও ছিল।  শুধু অনুষ্ঠান সূচী দিয়ে এই উত্সব কে বোঝা যাবে না।  তার জন্য নিজ এলাকায় এমন উত্সব সংগঠিত করতে হবে, মানুষকে জুড়তে হবে।  কুমিল্লা সংস্কৃতিক উত্সব কোন তীর্থ না, এটি একটি মডেল। সতী মাতার শরীরের নানা অংশ বাংলার নানা স্থানে পড়েছিল , এক স্থানে পড়ে নি। তাই এত গুলি তীর্থ কে কেন্দ্র করা এতগুলি ধারা, এতগুলি চর্চা ও ভাবনা। পুরনো তীর্থ গুলু ধুঁকছে, নতুন তীর্থ জন্মাচ্ছে না,  ঢাকা-কলকাতা ‘মহাতীর্থ’ হয়ে উঠছে।  এই সময়ে দাঁড়িয়ে কুমিল্লা সংস্কৃতিক উত্সব একটি আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠার আভাস দেখায়। পরের বার ষষ্ঠ কুমিল্লা সংস্কৃতিক উত্সব।  চোখ কান খোলা রাখব আমি, আপনারাও রাখবেন। বিকল্প অন্বেষণের  একই প্রয়োগশালাটি  আবার দেখা সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়।

1 Comment

Filed under বাংলা, Bengal, Community, Culture, Dhaka, Kolkata

বোর্ড, শিক্ষা, আদর্শ – দিল্লী আমাদের ভবিষ্যত লুটছে

আমি যখন ডাক্তারী পড়তাম, একটা কথা বেশ চালু ছিল।এই যে পৃথিবীতে ডাক্তারদের বাজার কখুনোই কমবে না।  কারণ জনসংখ্যা বাড়তেই থাকবে, ফলে রোগীর সংখ্যাও বাড়তেই থাকবে। এই যুক্তিটি জন-সংখ্যার সাথে যুক্ত অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই খাটে – যদি না ভয়ানক গোলমেলে কিছু ঘটে।  ঠিক তেমনই কিছু একটা ঘটছে আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-ক্ষেত্রে। এবং আমরা উদাসীন।  একটু খুলে বলি।

শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা দিন কে দিন বাড়ছে, স্কুল পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ছে আর এসবের মধ্যেই এই বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে ! ভাবা যায়? তাও সামান্য, নয় – নয় নয় করে প্রায় ১৫ হাজার। একই সাথে অবশ্য এ বাংলায় প্রতি বছর বেড়ে চলেছে দিল্লীর নানা বোর্ডের পরীক্ষার্থী সংখ্যা। পর্ষদ কর্তারা বেহায়া হয়ে অদ্ভূত সব কারণ দিচ্ছেন। কলকাতা শহরে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পরিচালিত মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এতই কমে গেছে যে নানা রকম অজুহাতের শাক দিয়ে পচে যাওয়া মাছ থেকে দুর্গন্ধ আটকানো যাচ্ছে না একেবারেই। এ কেমন করে হলো? এবং এমন চলতে থাকলে, ক্ষতি কি? ক্লাস টেন পাশ করাই তো মোদ্দা কথা – মাধ্যমিক হোক বা সিবিএসই /আইসিএসই। ব্যাপারটা এত সহজ নয়।

শিক্ষা নাগরিক গঠন করে। তাই একজন স্কুল-পড়ুয়াকে কি শেখানো হবে, সেটা গুরুত্তপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের জাতি ও সমাজের ভবিষ্যত এই ‘কি শেখানো হবে’র আদর্শের উপ নির্ভরশীল। একেই বলে সিলেবাস। মাধ্যমিক ও দিল্লী থেকে আমদানি করা বোর্ড-গুলির সিলেবাস এক নয়। পার্থক্য আছে।  এই পার্থক্য মানের তারতম্যের প্রশ্ন না , ভিন্নতার প্রশ্ন। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে এতগুলি রাজ্য বোর্ড, তাদের সিলেবাসের ভিন্নতা আছে কারণ এই এলাকার মধ্যে বিশাল বৈচিত্র ও ভিন্নতা রয়েছে। তাই সিলেবাসকে যদি হতে হয় বাস্তবমুখী ও ছাত্রের আপন পরিবেশের সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত, রাজ্য বোর্ড ছাড়া তার গতি নেই।  আর যদি ছাত্রটিকে তার পারিপার্শিকতা থেকে বিছিন্ন করে, তার বাঙালিত্বকে ছেঁটে দিল্লি-নির্দেশিত এক কল্পিত ভারতীয়ত্তর জোব্বা পড়ানোই হয় সিলেবাসের লক্ষ্য, তাহলে দিল্লির বোর্ড-গুলির জুড়ি মেলা ভার। যা শুরু হয়েছিল সৈন্য বাহিনী ও বদলির চাকরির লোকেদের সুবিদার্থে তথা মিশনারী কিছু প্রচেষ্টায়, সেই গোষ্ঠী-গুলির দ্বারা পরিচালিত বোর্ড-গুলি এখুন কেন্দ্রীয়-সরকারী নীতির মদতে এক-কালের শক্তিশালী ও খ্যাতিমান রাজ্য বোর্ড-গুলিকে পরিকল্পনা-মাফিক মুমূর্ষু করে তুলছে – শিক্ষার বানিজ্যিকরন তথা নাগরিকদের বৈচিত্র হরণের দ্বিমুখী উদ্দেশ্যে।  তার ফল ভয়ানক।

বাংলার বোর্ডে ইংরাজি, বাংলা বা হিন্দী মাধ্যমে পড়া ছাত্রটি জানতে পারে পশ্চিমবঙ্গের ভূগোলের খুঁটিনাটি বা বাংলার ধানের খেতে কি কি বোকা লাগে। তার ইতিহাস শিক্ষা স্রেফ দিল্লির  প্রাচীন ও বর্তমান সম্রাটদের গুনগাথায় সীমিত থাকে না। ভবিষ্যতে, জলে আর্সেনিক দুষণের প্রভাব দিল্লি থেকে আমদানি বোর্ড-গুলির সিলেবাসে না ঢুকলেও আমাদের ছেলে-মেয়েদের তা নিয়ে শিক্ষিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। আমাদের এই বাংলাদেশের বৈশিষ্টগুলিকে বিশেষ-ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা ইচ্ছা বা দায়, কোনটাই দিল্লীর নেই। ওদের থেকে আমদানি করা বোর্ড-এ  আপনার ছেলে-মেয়ে এই বাংলায় বসে ক্লাস-টেন পাশ করতে পারে এক বর্ণ বাংলা না শিখে। এই বঙ্গদেশের অধিকাংশ দিল্লী-বোর্ড-ওয়ালা ইস্কুলে প্রথম ভাষা হিসেবে বাংলা পড়ার কোন সুযোগ নেই। ভারতীয়ত্বের হাঁড়িকাঠে বাঙালিত্বের বলি দিয়ে যারা গুরগাঁও-বেঙ্গালুরুর দিকে শিশুকাল চেয়ে থাকবে চাতকের মতো, স্বপ্ন দেখবে হিন্দীর দেশের ইংরেজি মরুদ্যানে খেজুর গাছ হবার, আমরা কি সেই সন্তান গড়তে চাই? আত্মঘাতী হবার জন্য এর চেয়ে অনেক সহজ পথ আছে। 

এই বোর্ড-গুলি কার, এবং কাদের প্রাধান্য রক্ষা করতে গঠিত ও পরিচালিত, তা তামিল নাডু বা কর্ণাটকের অনেক শিক্ষাবিদের কাছেই পরিষ্কার।  শুধু এই অধম বাঙালি তার নিজের বোর্ড-এ পড়া ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত অন্ধকার করতে চায়, দিল্লির বোর্ড-গুলির সুবিধা করে দিয়ে।  কি ভাবে ? অনেক ভাবে।  একটা উদাহরণ এরকম।  অনেক  ছাত্র-ছাত্রীর স্বপ্ন পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার।  তার জন্য দিতে হয় জয়েন্ট পরীক্ষা। তার সিলেবাস অধুনা বদলানো হয়েছে – যাতে কিনা পশ্চিমবঙ্গের বোর্ড ও দিল্লি থেকে আমদানি করা বোর্ড-গুলির সিলেবাসের মধ্যে যে অংশটুকু কমন, প্রশ্ন আসবে শুধু সেখান থেকেই।  অথচ, কেন্দ্র যে আইআইটি বা  অল ইন্ডিয়া প্রি-মেডিকেল পরীক্ষা নেয় , সেখানে কিন্তু কোন কমনের বালাই নেই – একদম সোজাসুজি দিল্লির বোর্ড-গুলির সিলেবাসকে অনুসরণ করা হয়।  অথচ, যেটুকু সুযোগ আমরা আমাদের ছাত্রদের দিতে পারি, সেখানে আমরা তাদের লেঙ্গি মারছি ‘কমন’ ‘কমন’ খেলায়।  আর বাংলার মেডিকেল কলেজগুলি থেকে যে ডাক্তার বেরুবে, যে কলেজগুলি বাংলার মানুষের টাকায় গড়া, তা কার  স্বার্থে? নিশ্চই কতিপয় কলকাতাবাসী ‘এস্পিরেসনাল’ যুবক-যুবতীর কেরিয়ার গর্তে নয়।  বরং তা বাংলার মানুষের স্বাস্থ্যের স্বার্থে।  আজ-ও বাংলার কনে কনে যে ডাক্তার , তারা অধিকাংশ সেই পশ্চিমবঙ্গ বোর্ড-এই পড়া  .গুরগাঁও-বেঙ্গালুরু-লন্ডনের স্বপ্নে বিভোর আধুনিক শহুরে ভারতীয় দিয়ে এই বাংলার স্বাস্থ্য পরিসেবা চলবে না, তার জন্য চাই সেই বাংলা বোর্ডের ছেলেমেয়েগুলিকে  – যারা জেলাগুলিকে চেনে, বাংলার গ্রাম-মফস্স্বল চেনে, এলাকার ভাষা জানে।  কোথায় আমরা তাদের আরো আরো সামনে আনব – তা না করে আমরা  ‘আধুনিকীকরণের’ নাম বাংলার নিজের বোর্ড-কে ধ্বংস করছি। এ সকলেই জানেন যে পশ্চিমবাংলায় দিল্লি থেকে আমদানি করা বোর্ডে পরা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে  বেশি  শহরকেন্দ্রিক, বেশি বিত্তশালী বর্ণহিন্দু প্রভাবিত। পাশ করলেই বাংলা ছেড়ে ফুরুত হবার স্বপ্নে বিভোর শ্রেনীর ত্যালা মাথায়ে তেল দিয়েই কি আমরা  সোনার বাংলা গড়ার চেষ্টা করছি ?  গুরগাঁও-এর কর্পোরেট হাসপাতালের ডাক্তার গড়ার কোন দায় পশ্চিম-বাংলার মানুষের নেই। বাংলা বোর্ডের সিলেবাস নির্ধারণকারী আধিকারিক যারা, জয়েন্ট এন্ট্রেন্স বর্ডার পদাধিকারী যারা, তাদের সন্তানেরা কোন বোর্ডে পড়েন, সেটা জানা দরকার। নইলে এসব ক্ষেত্রে  অন্য কি কি ধরনের স্বার্থ  কাজ করতে পারে, তা জানা যাবে না।  আমাদের বুঝতে হবে কাদের চক্রান্তে বাংলা বোর্ড ক্রমে পরিনত হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেনীর বোর্ডে, যেখানে বনের জলে ভেসে আসার ঠাই পাবেন।

বাঁকুড়া জেলা স্কুল, বর্ধমানের সিএমএস। সিউরী জেলা স্কুল – এই নামজাদা প্রতিষ্ঠানগুলিকে জোর করে হারিয়ে দিলে শেষ নিরিখে বাংলা হারবে। দিল্লির নামধারী ইস্কুলে দিল্লি থেকে আমদানি সিলেবাস পড়ে শহুরে বাঙালির  বাচ্চারা মানুষ হবে – বাংলার ভবিষ্যত আর যেখানেই হোক, এই উড়ে এসে জুড়ে ব্যবসা করা ইস্কুল্গুলির অলিন্দে খোঁজা অনুচিত। ব্যাপারটিকে যেন আমরা  মাতৃভাষায় শিক্ষার সাথে গুলিয়ে না ফেলি।  পশ্চিমবঙ্গের মধ্যশিক্ষা প্রসদের অনুমোদিত স্কুলগুলির সিলেবাস বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে অভিন্ন।  আমি পড়েছিলাম সাউথ পয়েন্ট-এ , এক কালের নামজাদা ইস্কুল, পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের মুকুটের একসময়কার মণি।  এখান সময় পাল্টেছে – সেখানেও দিল্লি ও কেন্দ্র ঢুকেছে। শুনি ব্যবসা বেড়েছে। বেনিয়া কেন্দ্রীয়করণের এই প্রকল্পে, বাংলার মাজরা পোকা ও আলুর ধ্বসা রোগে নিয়ে শিক্ষার কোন জায়গা নেই।  তবুও কি আমরা আশা করতে পারি না, আমরা আমাদের বাংলার বোর্ড সেই ভাবে গড়ব , যাতে কিনা শহুরে বাঙ্গালী  ‘মিডিল-কেলাস’-এর গ্লোবাল ও ইন্ডিয়ান পোলাপানের সাথে মফস্স্বলের, গ্রামের, শহরের মধ্যে অন্যত্র শহরের সেইসব ছেলেমেয়েরাও সুযোগ পায় সাফল্যের – যাদের আজ দিল্লি ও তাদের বাঙালি দালালেরা জোর করে হারিয়ে দিচ্ছে।

2 Comments

Filed under Acedemia, বাংলা, Bengal, Class, Delhi Durbar, Education, Elite, Identity, Kolkata, Language

আমার শহর, আমার আশা

সামনেই আমার শহর কলকাতার পৌর নির্বাচন। এ শহর আমার জন্মের শহর। এখানে বস্তিবাসীকে নিমেষে হটিয়ে দিয়ে শহর ‘পরিষ্কার’ করা যায় না – কাউন্সিলর এম-এল-এর বেনামীতে প্রমোটারী ব্যবসা সত্ত্বেও। এখানে প্রধান প্রধান রাজপথে লক্ষ লক্ষ্য হকার সৎ ভাবে আয় করেন – মানুষের পেটে লাথি মেরে সূর্যোদয়ের বিরূদ্ধে দাঁড়ায় এ শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এ শহরের পথে বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার গরীব খাটিয়ে মানুষ বাংলা ভাষার জ্ঞান ছাড়াই ক্ষুন্নিবৃত্তি করে। অন্য কিছু শহর যেমন বাঙ্গালিকে হিন্দুস্তানি বা ইংরেজি বুলি বলতে বাধ্য করে, আমার শহর সেই পংক্তিতে পড়ে না। এ শহরের মন বড়। এ শহর আমার গর্বের শহর। তাই শহরের পৌরসভায় আমার প্রতিনিধিত্ব করবে কে, এটা খুব এলে-বেলে একটা সিদ্ধান্ত নয়। তেরঙ্গা পতাকার রাষ্ট্রর থেকে এই শহর আমার রোজকার জীবনে অনেক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি বাস্তব।

আমার এ শহর নিয়ে ক্ষোভ আছে – যেমন মানুষের থাকে একদম একান্ত নিজের কিছুকে নিয়ে। আমার ওয়ার্ডের পৌরপিতা আমাদের এলাকার নতুন কাজ বা পরিকল্পনা নিয়ে অরাজনৈতিক নাগরিক সভা করেন না। আমার এলাকায় আমার প্রতিনিধি যিনি, তার কাছ থেকে এইটুকু কি আশা করা খুব অন্যায়। আপনারা যারা এবারও আমার পৌর-প্রতিনিধি হবার ইচ্ছা রাখেন, এলাকার নানা পরিকল্পনা দলের রং না দেখে, নাগরিক-দের সাধারণ সভা ডেকে করবেন – এমন কথা দেবেন? এই টুকু চাইব না? অথচ আমার করের টাকাতেই তো পুরসভা চলে। বাড়ির বাচ্চাকে আলু-বেগুন কিনতে বাজারে পাঠালে আমরা পাই-পয়সার হিসেব নিই, আর কোটি কোটি টাকার বরাতে কর্পোরেশনের বাজার-রাস্তা-ইস্কুল-ত্রিফলার হিসেব নেব না ? হিসেব চাইব আমি নাগরিক হিসেবে। শহরের সৌন্দর্যায়নে আমার আপনার মতামত নেওয়ার দরকার নেই আমাদের প্রতিনিধিদের? নইলে সে কেমন প্রতিনিধি ? আমার আপনার ভোটে জিতে সে তাহলে কার প্রতিনিধিত্ব করে?

যে চরিত্রহীন, তার হীনমন্যতাই তাকে বাধ্য করে অন্যের চরিত্র ধার করে নিজেকে চরিত্রবান প্রমাণ করাতে। যার গায়ে কাপড় নেই, সে অন্যের জমকালো কাপড় গায় জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করে। যারা কলকাতাকে লন্ডন-নিউয়র্ক বানাতে চান, তারা না চেনেন কলকাতাকে, না চেনেন লন্ডন-নিউয়র্ককে। তাই তো তারা পরমা আইল্যান্ডের ‘পরমা’ স্থাপত্যকে ভেঙ্গে দেন অবলীলায়, বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদ করে ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে আস্তানা গড়া বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ও সমাজচিন্তক জে বি এস হলডেনের নামাঙ্কিত রাস্তার নাম বদলের পায়তাড়া করা হয়। মধ্যমেধা ও মধ্যকল্পনার সাথে চাটুকারিতা ও দুনম্বরী মেশালে তিলোত্তমা গড়ার তিলের যোগান হয় না, লন্ডন-সিঙ্গাপুরের কয়েক তাল স্থুল অনুকরণ গড়া যায় ঠিকাদারী ব্যবসার মাধ্যমে। এ শহরের নিজস্বতা, এ শহরের প্রাণ-ভোমরা – শহর সাজাতে যদি তাকে যদি মন্থন না করা হয়, তখন সৌন্দর্য্য হয়ে ওঠে নগর ও নাগরিকের মধ্যেকার একটি দেওয়াল। সে দেওয়ালের উচ্চতা দেখে ভয় ও সমীহ হতে পারে, কিন্তু কেউ সেখানে গিয়ে চুমু খাবে না, আল্পনা দেবে না।

এ শহর দাঁড়ায় সিঙ্গুরের পাশে। তাই এ শহরে বিজনেস ক্লাসে উড়ে আসা লোক কম। আর খুব কম সম্বল করেও অমাবস্যার রাতে একটুখানি চাঁদের আলোর স্পর্শ পেতে চাওয়া লোকের সংখ্যা অনেক। আমার শহরের নায়কেরা শহরের নাম ভাঙিয়ে ক্রিকেট দল খোলে না , বিনোদন টেক্স বাকি রেখে নেচে কুদে ‘আই লাভ কলকাতা’ বলে বোম্বাই পালিয়ে যায় না। আমার শহরের আসল নায়কদের একজন হলো শমভু সিং। এ শহরের দক্ষিণে গগনচুম্বী বহুতলের খোপ-ঘরের আধুনিক হুল্লোড়ের উপর ঘুরপাক খায় জয় ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নিহত কর্মী শমভু সিং-এর বিদেশী আত্মা – অপরাজিত সৈনিকের মতো। এহেন শহরের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করা যে-সে কাজ না। এ শহর দিল্লি-বেঙ্গালুরু-নয়ডা-গুরগাঁও হতে চায় না। এ শহর এখুনো দোকানের নাম ও রাজনৈতিক পোস্টার লেখে মাতৃভাষায়। এ শহর হিন্দুস্তানের মরুভূমিতে মরুদ্যান নয়, ভাগীরথী-হুগলীর ব-দ্বীপের কোল ঘেঁসে গড়ে ওঠা মহা-গঞ্জ। এ শহর নিখিল বাংলাদেশের বৃহত্তম শহর। এ শহর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সকল বঙ্গবাসীর।

আমার শহরে থাবা বসিয়েছে অনেক দুর্বৃত্ত। তারা শহরের রাজপথে সাইকেল চালানোকে বে-আইনি ঘোষণা করেছে। তারা গাড়ি থামিয়ে মানুষকে সিগনাল পারাপার করতে একটু বেশি সময় চায় না। তাদের কাছে ট্রাফিক মানেই গাড়ি, রাস্তা মানে শুধুই গাড়ীর পথ। আমি চাই আমার পৌর-প্রতিনিধি এদের সমঝে দিক। আমি চাই আমার শহরে গাড়ি কমুক, বাস বাড়ুক, পথিক বাড়ুক। আমি চাই আমার আগামী প্রজন্ম সুস্থ থাকুক, ভালো ভাবে শহরে নিশ্বাস নিতে পারুক। যিনি আমার প্রতিনিধি হবেন, তার প্রতি আমার দাবি অনেক, আশা অনেক। তারা পারবেন-ও, যদি ইচ্ছা থাকে। আর যদি থাকে শহরের প্রতি ভালবাসা, শহরবাসীর প্রতি দরদ।

আমি চাই আমার ওয়ার্ডে আরো গাছ লাগানো হোক – ফলের, ফুলের। সবুজ রং দিয়ে শহর মুড়লে সবুজায়ন হয় না। নীল রং দিয়ে মুরলে নীলকন্ঠ হওয়া যায় না, পাপ পাপ-ই থেকে যায়। সাদা রং করে পবিত্র হওয়া যায় না – প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। লাল নিশান ওড়ালেই সংগ্রামী হওয়া যায় না – তাপসী মালিকের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। আসন্ন নির্বাচন পুরনো হিসেব বুঝে নেবার নির্বাচন, নতুন দাবি রাখার নির্বাচন।

আমার শহর দেশভাগের শহর। এ শহরে একাধিক বাজারের নাম বাস্তুহারা বাজার। এ শহরের অনেক হকার প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের রিফিউজি। এ শহর বিস্থাপিতের অভয়ারণ্য। এ শহর শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তদের দিয়ে তৈরী ‘বস্তিহীন’ হকার-হীন ‘ছিম-ছাম’ ও ‘শান্তিপূর্ণ’ নকল শহর না। বাস্তুহারা বাজারের প্রতিনিধিত্ব বড়বাজারের দ্বারা সম্ভব না। ওসব এখানে হয় না।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Democracy, Kolkata, Urbanity

গোবিন্দ হালদারের নিষিদ্ধ ফিসফিস

সে যতই দেখনদারী হোক, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর ওপার বাংলায় যাত্রার ফলে কিছু সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে – যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই একটি জাতির দুই বিভক্ত অংশের একে অপরের দিকে নতুন করে তাকানো। এই বিভক্তির কারণের মধ্যে, তার ঠিক-ভুলের মধ্যে না গিয়েও একটা কথা বলা যায়। দেশভাগ ও তার পরেও ঘটতে থাকা খুন-ধর্ষণ-ধর্মান্তরকরণ-লুঠ-ঘরপোড়ানো-সম্পত্তিদখল ইত্যাদি ভয়ানকের অপরাধের শাস্তি হয়নি, এপারেও – ওপারেও। এই আদি পেপার বোঝা সুদে-আসলে এতই ভারী যে মানুষ সেই বোঝাকে ফেলে দিয়ে ভুলেই গেছে পাপের কথা। প্রায়শ্চিত্ত তো দূরস্থান।

১৯৪৭-এর বাংলা-ভাগের সাথে ব্রিটিশদের দ্বারা উপমহাদেশের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলির হাতে যে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল, আজকের ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন, পাকিস্তান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এক অর্থে তার-ই ফসল। এই ভাগের সাথে সাথেই ‘আমরা’ কারা ,’বন্ধু’ কারা ’, ‘শত্রু’ কারা- এগুলির নানা মিথ রচনার বীজ পোঁতা হয়, যার থেকে বেরোনো মহীরুহ আজকের দিনে আমাদের মনকে, আমাদের কল্পনাকে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। নতুন রাষ্ট্রের পেটের গভীর থেকে জন্মানো এই কল্পকাহিনীগুলি যে আজ পবিত্র সত্যের স্থান নিয়েছে, তা শুধু গল্পের ভাবের জোরে নয়। সরকারী প্রচার এবং সরকারী বাহিনী, ঘুষ ও শাসানি, আঁচড় ও আদর, পুরস্কার ও থার্ড ডিগ্রী, জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও মিথ্যা মামলায় হাজতবাসের এক অসামান্য সংমিশ্রনেই আজকের পবিত্রতা, সংহতি, ‘বিকাশ’, রাষ্ট্রপ্রেমের জন্ম (দেশপ্রেমের নয়)। সাবালক এই সব বিষবৃক্ষের রসালো ফলের আমার দৈনিক কাস্টমার। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে, আমাদের স্বকীয় আত্মপরিচিতকে পিটিয়ে পিটিয়ে রাষ্ট্রীয় ছাঁচে ঢোকানো হয়েছে দিল্লী, ইসলামাবাদ ও ঢাকার মাতব্বরদের স্বার্থে। মানুষের আত্মাকে কেটে সাইজ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার জুজু দেখিয়ে। এই পাপ বঙ্গোপসাগরের থেকেও গভীর।

আমাদের কল্পনা ও স্মৃতির অগভীরতার কারণে আমরা মনে করি যে এক রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বোধয় দৈব নির্ধারিত কোন ‘প্রাকৃতিক’ নিয়ম যা না মানলে আমরা দুনম্বরী বিশ্বাসঘাতক মানুষ। যাদের আনুগত্য, টান ও ভালবাসা রাষ্ট্র-সীমান্ত পেরোলে ঝুপ করে উবে যায় না, তারা বুঝিবা মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং রাষ্ট্রের চোখে নেমকহারাম। রোজ এই ধারণাগুলিকে বিনা বাক্যে মেনে দিয়ে আমরা আমাদের এই মর্ত্যলোকে স্বল্প সময়ের জীবনকে করে তুলি ঘৃণাময়, ভীতিময়, কুঁকড়ে থাকা। ১৯৭১-এ কিছু সময়ের জন্য পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের সময়ে এপার বাংলায় এরকম অনেক তথাকথিত বিকার চোরাগলি ছেড়ে রাজপথে মুখ দেখানোর সাহস ও সুযোগ পেয়েছিল। এ সত্যি যে ১৯৭১-এ ইন্ডিয়ান উনীয়নের নানা এলাকায় পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সমর্থন ও সাহায্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম বাংলায় এই সাহায্যের আড়ালে যে আবেগের প্রকাশ ঘটেছিল, তা আজকের ডেটল-ধোয়া ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্রাষ্ট্রিক সম্পর্কের পবিত্র গণ্ডির বাইরের এক প্রায়-নিষিদ্ধ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের সাথে পূর্ববঙ্গের যে একাত্তুরে ‘ঘনিষ্টতা’, তার সাথে কর্ণাটকের সাথে পশ্চিমবঙ্গের ঘনিষ্টতা বা কর্ণাটকের সাথে পূর্ববঙ্গের ঘনিষ্টতার কোন মিল নেই। এই মিল-অমিলের অঙ্ক মেলাতেই তো ঘনঘন বেজে ওঠে জাতীয় সঙ্গীত, যাতে এরম চিন্তা গুলিয়ে যায় মিলিটারি ব্যান্ডের আওয়াজে। দিল্লি-ও একাত্তরে ভালই জানত এসব ‘নিষিদ্ধ’ প্রেমের কথা – কিন্তু এই প্রেম তখন তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পক্ষে কাজ করেছিল বলে বাড়তে দিয়েছিল কিছুদিন অন্যদিকে তাকুয়ে, তারপর রাশ টেনে সমঝে দিয়েছিল সময়মত। এই আচরণেরও অন্য উদাহরণ আছে। যেমন তামিল নাদুর বিধানসভায় শ্রীলংকার ইলম তামিলদের সমর্থনে যেসব প্রস্তাব পাশ হয়, তা নিয়ে দিল্লীর নিস্তব্ধতা – যেন দেখেও দেখছে না। যেমন কাবুল ও পেশোওয়ারের মধ্যে যে ঠান্ডা-গরম পাখতুন বন্ধন ও তা নিয়ে আজকে ইসলামাবাদের চাপা ভীতি।

১৯৭১ অবশ্যই অতীত। সেই ‘নিষিদ্ধ’ প্রেম আমরা কবে বন্ধক দিয়েছি বেঙ্গালোর-দিল্লী-নয়ডা-গুরগাঁও স্বপ্নে বিভোর হয়ে। তাই তো আজ, আমরা, এই বাংলায়, দিল্লির থেকে ধার করা চশমায় পূব দিকে তাকাই আর দেখি – গরুপাচারকারীর মুখ, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর মিছিল, হিন্দু বাঙালির শেষ আশ্রয়স্থল হোমল্যান্ডটিকেও জনসংখ্যার বিন্যাসে কেড়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র। এই সবই কিছু ঠিক, কিছু ভুল, কিন্তু সেসব ঠিক-ভুলের পরেও মধ্যে লুটোয় দিগন্তজোড়া বাংলাদেশের মাঠ, যে মাঠ শুধু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাঠ নয়, বরং নিখিল বাংলাদেশের মাঠ। সে উত্তরাধিকার আজ প্রায় তামাদি।

বিগতকালের এই যে সম্পর্ক, যার শেষ প্রতিভুদের একজন এই গোবিন্দ হালদার। একরাষ্ট্রের আনুগত্যে বাঁধা আমরা, তাই এ প্রেমের কথা কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার পায় না। এ সম্পর্ক – তা ঠিক পরকীয়া নয়, বরং এমন এক প্রেম যার শুরুর পরে প্রেমিক হয়েছে বিভাজিত। আর প্রেমিকার প্রেম থেকে গেছে একইরকম। কিন্ত অন্যের চোখে সে দুই প্রেমিকের প্রেমিকা, এবং কলঙ্কিনী। এমনই এক প্রেমিকা ছিলেন গোবিন্দ হালদার। গত ১৭ জানুয়ারী, ৮৪ বছর বয়সে মারা গেলেন অতি সাধারণ এক হাসপাতালে। অবিভক্ত যশোর জেলার বনগাঁ এলাকায় জন্ম।বনগাঁ ‘পড়ে’ ‘ইন্ডিয়ায়’।আকাশবাণীর জন্য গান লিখেছেন। একাত্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল আকাশবাণী কলকাতা। পরে যুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য প্রচুর গান লেখেন যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ও পূর্ব বাংলার জনগণের মুখের গান, প্রাণের গান হয়ে ওঠে। মোরা একটি ফুল বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, পূর্ব দিগন্তে সূর্য্য উঠেছে রক্ত লাল, পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা – এগুলি তার প্রবাদপ্রতিম রচনা। শ্রোতার ভোটে তৈরী বিবিসি রেডিওর সর্বকালের সেরা ১০টি বাংলা গানের তালিকায় তার দুটি গান উপস্থিত। এই লোকটি মারা গেল, কোন বঙ্গশ্রী, পদ্মশ্রী ছাড়াই। আসলে সে ঠিক গান লিখেছিল ‘ভুল’ রাষ্ট্রের জন্য। তাই এপারে তার কল্কে নেই। আমাদের মধ্যেই ছিলেন এতদিন। জানতে চেষ্টাও করিনি, কারণ রাষ্ট্রর ক্ষমতা যত বেড়েছে, তা আমাদের মানুষ হিসেবে ছোট করে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-ও একাত্তরে গোবিন্দ হালদারের নাম ফলাও করত না – সে ‘ভুল’ রাষ্ট্রের যে। পরে ঋণ শোধের চেষ্টা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিত্সার খরচ পাঠিয়েছেন, সরকার পুরস্কৃত করেছেন, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কলকাতায় মৃত্যুপথযাত্রী গোবিন্দ হালদারকে দেখে গেছেন। আমার কাছে একটা ছবি আছে – বৃদ্ধ গোবিন্দ হালদার বাংলাদেশের পতাকা নিজের বুকের কাছে ধরে আছেন। পার্টিশন এলাকার যারা নন, একদেশ-একজাতি-একরাষ্ট্র রাষ্ট্রের গর্বে বলিয়ান যারা, হয়ত ভাগ্যশালী তারা,কিন্তু তাদের কি করে বোঝাব এসব ? হয়ত তারা বুঝবে পরজনমে, রাধা হয়ে। তখুন হয়তো তারা অনুভব করবে গোবিন্দ হালদারদের দেশের ঠিকানা।

কেউ কেউ কিন্তু তলে তলে বোঝে। ঢাকার অভিজিত রায় – খ্যাতিমান মুক্তমনা ব্লগার। ২৬ তারিখে , একুশে বইমেলা থেকে ফেরত আসার সময়ে তাকে রামদা দিয়ে হত্যা করা হলো। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। দায় নিয়েছে ইসলামী সংগঠন আনসার বাংলা-৭। প্রতিবাদে এ বাংলার কিছু মানুষ ২৭এই কিন্তু জমায়েত করলেন যাদবপুরে। নিষিদ্ধ প্রেম পরিণত হয় নিষিদ্ধ কান্নায়, কাঁটাতার ভেদী শপথে, চোরাগোপ্তা। সব রং তেরঙ্গায় নেই।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Culture, Delhi Durbar, Dhaka, Foundational myths, Kolkata, Language, Nation, Open futures

কলকাতার গাজী ইলিয়াস

কলকাতার পথের মধ্যে গল্প থাকে। শীত কাল বলে সে গল্প ভালো করে শোনা যায় – শীতে নিখিল বাংলাদেশে মানুষ একটু কম ঘামে। গল্প চেঁচিয়ে কথা বলে ফাঁকা রাস্তাতেও। তাই অনেক গল্প পথিকের মিস হয়ে যায়। এই তো কদিন আগে আমি ভাগ্যক্রমে এক গল্পের সাক্ষী থাকলাম যেটা কিনা একটু হলেই আড়ালে ঘটে যেত। কলকাতার সেই ছোট গল্পের আগে ঢাকার একটি গল্প দিয়ে একটা  গৌরচন্দ্রিকা করব।
সে ছিল আরেকটি শীতের মরশুম। ২০১০-এর ডিসেম্বরে ঢাকায় লাইভ প্রোগ্রাম করতে এলেন হিন্দী চলচিত্র জগতের জনপ্রিয় নায়ক শারুখ খান, ‘কিং’ খান। হয়তো অনেকেরই মনে আছে। সেদিন শারুখ ছিল স্টেজে।  দাপাদাপি করে সে জনতাকে বিনোদন দিয়েছিল।  এটাই তার পেশা ও কাজ। লাইভ শোতে একটি জনপ্রিয় ক্যারদানি হলো  হঠাত করে দর্শকদের মধ্যে থেকে কাউকে স্টেজে ডাকা। সুপারস্টার ও ভক্ত – এই ব্যাপারটি নিয়ে একটি তাত্ক্ষণিক নাটক মঞ্চস্থ করা আর কি। হঠাত করে ডাক পাওয়া ভক্ত স্টেজে উঠে নায়ক-কে বলবে আপনি মহান, আপনার জন্মদিন-বিয়ের তারিখ-সন্তানের অন্নপ্রাশনের তারিখ সকলই আমার মুখস্থ, কোনদিন-ই আপনার একটি বই-ও মিস করিনি, এখুনো বারবার দেখি বউবাচ্চা নিয়ে, চিরকাল ইচ্ছে ছিল আপনার গা ঘেঁষে একটু দাঁড়াই , আজ সে সুযোগ পেলাম, যেন লটারি-ই জিতলাম আর কি, ইত্যাদি, ইত্যাদি ।  নায়ক-ও ধন্যবাদ জানাবেন, একটু ‘মাটির মানুষ’ বা ‘আমি তোমাদেরই একজন’ গোছের একটু বিনয়, একটু  হাসি ঠাট্টা করবেন আর কি।  এমনই  দস্তুর। সব কিছুরই নাকি একটা ব্যাকরণ আছে অর্থাৎ সকলে তথাকথিত ভাবে ‘সর্বজ্ঞাত’ অনুযায়ী নিজের নিজের ভূমিকা পালন করবে। ‘কিং’-এর শুনবে, আহ্লাদিত হবে, প্রায় পায়ে পড়বে আর এহেন ‘ফ্যান’-এর গ্যাঁজলার গন্ধে  দর্শকেও মত্ত হবে।  প্রোগ্রাম তার ব্যাকরণ মেনে হবে সুপারহিট।
 কপট হয়েই হোক বা অকপট হয়েই হোক, এই ব্যাকরণ যখন লাইভ প্রোগ্রাম-এ কারুর দ্বারা কোন  ভাবে ভঙ্গ হয়, তখন আর এডিট করে ব্যাকরণ-মত করার সুযোগ থাকে না।  বরং ব্যাকরণ  একটি ভান, একটি আস্তরণ, একটি কিম্ভূত নির্মাণ, সেটাই প্রকাশ হয়ে পরে নগ্ন ভাবে। যে পৃথিবীতে কোথায় কেমন ভাবে ঠিক কি করে আচরণ করতে হয়, তা জানা এবং না জানা দিয়ে মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ধারিত হয়, সেই পৃথিবীতে যারা অজান্তে হোক বা জ্ঞানপাপী হয়েও হোক, ব্যাকরণ ভাঙ্গেন, তাদের সাধুবাদ প্রাপ্য। তাই সাধুবাদ দিতেই হয় গাজী ইলিয়াস-কে।  মনে পরে গাজী ইলিয়াস-কে? শাহরুখ খান যখন তাকে স্টেজে ডাকে, সে এসে বলে যে সে বাংলা জানে, দাবি করে যে সে হিন্দী জানেনা। না জানাটাই স্বাভাবিক। ইলিয়াস কিন্তু একরকম চালিয়ে দেবার ইংরেজি জানে। এরপরে সে লম্ফঝম্ফ করা শাহরুখের জন্য রাখা জলের বোতল চেয়ে জল খায়, পিপাসা নিবৃত্তি করতে। তাকে দেখে মনে হয় সে ‘নার্ভাস’, কিন্তু তবুও যখন শাহরুখ বলে যে স্টেজে সকলে দেখছে, ইটা লাইভ প্রোগ্রাম, তাই ‘ঠিক করে’ আচরণ করতে, ঠিক স্টাইলে দাঁড়াতে, তখন ইলিয়াস জানায় যে শাহরুখের স্টাইল এক, আর ইলিয়াসের স্টাইল অন্যরকম।  মঞ্চের কাঠামো অটুট থাকলেও ব্যাকরণ ভেঙ্গে পড়ে।  এর পরে ইলিয়াস আবার বোতল থেকে জল খায়, সবার সামনেই। অনেকের কাছে সে হাসির খোরাক হয়। সে উপযুক্ত ভাবে তার ভূমিকা পালন করতে পারে নি। ইলিয়াস কিন্তু তার নাম ভূমিকা পালন করেছিল সেদিন। গাজী ইলিয়াস ছিল গাজী ইলিয়াস। আর উজ্জ্বল নক্ষত্রের সামনেও গাজী ইলিয়াস থেকে যাওয়ার ফলে শাহরুখ খান-এরই কিছু সময়ের জন্য  করতে হয়েছে, ইলিয়াসকে ধমক দিতে হয়েছে, তারপর ‘ইমেজ’এর স্বার্থে দ্রুত সামলে নিতে হয়েছে। এরই মাঝে এক মেরু-দণ্ডযুক্ত বাঙালিকে শাহরুখ তার বলশালী মারকুটে পাঠান পরিচয় দিয়েছে এক হুমকি-ইয়ার্কির মাধ্যমে। কায়িক বলের এই খেলাচ্ছলে আস্ফালনের জবাব দেয়নি গাজী ইলিয়াস – দিতে পারত। দিলে আরো রসভঙ্গ হত। শাহরুখ খান অভিনেতা।  ইলিয়াস গাজী নার্ভাস কিন্তু অভিনেতা নন।  তার জল পিপাসার ফলে জল খাওয়া শারুখের প্লান-মাফিক মায়া তৈরিকে হঠাত করে রুদ্ধ করেছে।  শারুখের অভিনয়ে গাজী ইলিয়াস সাময়িক যতি চিন্হ এনে দিয়েছে – স্ক্রিপ্ত্হীন নায়ক-কে একটু ঘামিয়েছে। শাহরুখ যে আসল নয়, সে যে অভিনয়, তা ওই সাময়িক যতির কারণে আরো বেশি বেশি প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ করেছে নার্ভাস গাজী ইলিয়াস।যেখানে যে কথা বললে খাপে খাপ হয়, সেটা না করে বা করতে না জেনে। আমরা গাজী ইলিয়াসকে চিনি।  আমাদের অনেকের মধ্যে সে বাস করে।  আমরা তাকে চেপে রাখি, আমি নিজেদের ভেতরের গাজী ইলিয়াসকে ঘেন্না করি। আমাদের মনের মধ্যে গাজী ইলিয়াস  আছে  বলে আমরা লজ্জা পাই। আমরা নিজেদের ভেতরের গাজী ইলিয়াসকে হত্যা করতে চাই।  আমরা রাস্তার গাজী ইলিয়াসকে নিয়ে নাক সিঁটকোতে চাই , তাকে দুয়ো  দিতে চাই। আমরা আমাদের বাপ-মায়েদের-আত্মীয়-স্বজন-পারা-প্রতিবেশীদের নিচু নজরে দেখি কারণ তাদের অনেকের মধ্যে গাজী ইলিয়াসের সুস্পষ্ট ছাপ।  হয়ত  তারাও নিজেদের অপছন্দ করতে শিখে গেছে। কোথা থেকে আসে এই ছিছিকার, এই নিজেকে লজ্জা করা? আমরা চাই, তারাও চায়, যে তাদের সন্তান যেন দুধে-ভাতে থাকে আর তাদের মধ্যে যেন এক ফোঁটা গাজী ইলিয়াস না থাকে।  তারা যেন স্মার্ট হয়, তারা যেন স্টেজে তুললে পটাপট খাপেখাপ জবাব দিতে পারে।  তাদের দেখে যেন শাহরুখের মাথা একটুও গরম না হয়, একটুও যেন রাগ না চাপতে হয়। যেন শুধুই থাকে ‘সভ্য ব্যাকরণ’ সম্মত হাসি আর আনন্দ। এভাবেই রস গড়াতে থাকে। গড়াতেই  থাকে।
স্থান-কাল-পাত্র বোঝার, তার ব্যাকরণ বোঝার একটা রাজনীতি আছে।  এই রাজনীতির প্রকাশ আচরণে – স্থান-কাল- আচরণে। কিন্তু সে আর নতুন কি? নতুন হলো এই আচরণকে সারাক্ষণ অভ্যাস করে যাওয়া।  এই আচরণকে, এই ভানকে সত্য ও সুন্দর মনে করা। কোন কোন আচরণ? আমি গোদা ভাবে বলতে হলে আমি বলব আমাদের মত কালো মানুষের কল্পনায় শ্বেতাঙ্গ মানুষ যেমন আচরণ করে , তেমন আচরণ। এই আচরণ যে সাফল্যের চাবিকাঠি তা আর কেউ না জানুক,স্পোকেন-ইংলিস সম্রাট সাইফুর স্যার প্রচন্ড ভালো জানেন। এই উপমহাদেশে অন্যের হীনমন্যতা ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা করার ঐতিহ্য বেশ পুরাতন। আমরা চাই আমাদের যেন ‘পাতে দেওয়া যায়’। এই পাত কিন্তু কলাপাতা বা শালপাতার না, এমনকি ভূমিজ এলিটের কাঁসার থালা ও না। একেবারে ম্যালামাইন। তাই দরকার পরে চামচ ঠিক করে ধরতে শেখার, আওয়াজ না করে স্যুপ খাওয়ার, এবং আরো হাজারো ‘সভ্য’ ঢং।
ঢং শিক্ষার দুনিয়ায়ে যে অশিক্ষিত, তাকে দেখলেই বোঝা যাবে যে এখুন কোথায় কখন কি করা উচিতের যে বিশ্বজনীন ‘স্বাভাবিক’ সহজপাঠ, তার শিক্ষাগুলি সত্যই শেষ প্রান্ত অবধি পৌঁছয়নি। তাই হঠাত করে আলোকিত করে দেয় অকপট গাজী ইলিয়াস। তাই রক্ষে। আর সে যদি ছুপা রুস্তম কপট হয়?  আমি তাহলে  বলব, সাবাস ইলিয়াস । কত লোকে ক্লিষ্ট ইংরেজি লিখে ভুঁরু ফুটিয়ে সাবভার্সন মারালো, তুমি করে দেখালে।
অথচ কোথায় কেমন করে কি কতক্ষণ করা উচিত – অপিসে, ক্যাফেতে , শ্বেতাঙ্গ পন্ডিতের সামনে, ইংরেজি-কপচানো আমাদের দেশেরই হাপ-পন্ডিতের সামনে, সিনেমা হলে, জলে, স্থলে, অন্তঃরিক্ষে, যারা তার পাঠ বিলোয়ে ‘আধুনিক’ স্বকীয়তার মোড়কে এবং ইলিয়াস্দের প্রবল দুয়ো দেয় ‘অন্কাল্চারড’ হিসেবে – তারাই আবার পরিবার, পারিবারিক আচারআচরণ, বয়স্জ্যেষ্ঠেকে সম্মান, পারিবারিক চেতনা, কোথায় কার সাথে কেমন ভাবে কি আচরণ করতে হয়, বা করতে হয় না,তাকে পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঐযে বিশ্বজনীন ‘স্বাভাবিক’ আচরণের সহজপাঠ, তার প্রথম পাঠ হলো – নিজের সবকিছুকে প্রশ্ন করো, কিন্তু প্রশ্নের উছিলায় তুমি নিজে যে অন্যতর বিশ্বকল্পের দাস হয়ে যাচ্ছো, সে প্রক্রিয়া কে প্রশ্ন করো না। একবার কাছি কেটে দিলেই সহজপাঠের কাজ শেষ, তারপর মানুষ জলে না দবার জন্যই অন্য ডাঙ্গার সন্ধানে জোরে দাঁড় চালাবে, পৌছক আর না পৌছক। এই প্রক্রিয়াটাই খাপে-খাপ। যে ডাঙ্গা থেকে কাছি কেটে আসা হয়েছে, সেখানে ফেরা যাবে না।  সেখানে ইলিয়াস্দের বাস।  ফিরলে সে যদি হাসে? ইলিয়াস্দের উপর হাসা যেতে পারে, কিন্তু ইলিয়াস্দের হাসির পত্র হওয়াটা ঘোর অপমানের। আসলে আমরা আমাদের ক্ষমতাই বুঝি না।  অধিকাংশ ইলিয়াসের মেরুদন্ড আমরা ভেঙ্গে দিয়েছি কবেই। ওই হাড়ের গুঁড়া দিয়েই আমাদের কালো ত্বক সাদা করার পাউডার যোগান হয়। সাদা পাউডার মেখে নিজ সমাজের নরম মাটিতে আমরা নৃসংশ ভাবে আঁচড়ে  দেখাই স্বকীয়তা,  মুক্তিকামিতা, স্বাধীনতা, স্পষ্টবাদিতা , আর কত কি। আসলে যে অন্যকে ‘আন্কাল্চার্ড’ বলে,সে যে ভীষণভাবে সংস্কৃতিক ভাবে নিরক্ষর হতে পারে। বিশেষত দেশ-দশ-সমাজ যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তরায় হয়, তখন কাছি কাটাই হয় নবধর্ম। আর ভূমিজ ধর্ম ছেড়ে নবধর্ম ধরলে প্রথম প্রথম যা ঘটার তাই ঘটে – চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী, চূড়ান্ত পূর্ব-আত্মবিস্মৃতি এবং আত্মসমালোচনার নিদারুণ অভাব। যা কিনা চলতি ক্ষমতার সংস্কৃতি,  হাজার রকম বড় বড় ইংরেজি শব্দ দিয়ে ‘ক্রিটিসিজম’ হবে, মোটা বই হবে।হারেমের স্বেছাবাশিনিরা এবং দ্বাররক্ষীরা কেমনে -বলবে  রাজা তোর  কাপড় কোথায়? রসভঙ্গ করতে লাগবে মানুষ। সে কাজটি করবে অন্য মানুষ। সহজ কিন্তু সরল নয় , এমন মানুষ। এবার ফিরি কলকাতার পথে।
আমি যাচ্ছি বরানগর থেকে হাওড়া স্টেশন, দিল্লীগামী রাজধানী এক্সপ্রেস ধরতে।  আমি ট্যাক্সি করে যাচ্ছি। সাধারনতঃ আমি ট্যাক্সিচালকের নাম, ধাম জিজ্ঞেস করি, কিন্তু সেদিন নানা ব্যাপারে একটু চিন্তার মধ্যে ছিলাম।  তার-ই মধ্যে তারস্বরে চালু হলো এফ এম রেডিও, ট্যাক্সির মধ্যেই লাগানো। এক নারী উপস্থাপিকা সুন্দর গলা করে বললেন, শীত তো এসে পড়ল।  আপনার শীতে কি কি ভালো লাগে? এক ব্যাক্তি উত্তর দিতে শুরু করলো – আওয়াজের ধরণে বুঝলাম ইটা লাইভ টেলিফোন কলের মাধ্যমে কোন শ্রোতা বলছেন।  একজন পুরুষ। সে জানায় যে শীতকাল মানেই বিয়ে ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের মরশুম। এত অবধি ঠিক-ই ছিল।এত অবধি রাজার, বা ঢপের চলতি বিনোদনের কোন লজ্জাহানি হয়নি। এরপর জল গড়ায় অন্য দিকে।  সে বলে যে শীতকালে তাই মেয়েদের অসুবিধে আর ছেলেদের একটু সুবিধে। অনুষ্ঠানে মেয়েরা সেজেগুজে যায় – শাল জড়ালেও সুন্দর পোশাক আশাক সাজগোজ করতে হয়। কিন্তু ছেলেদের একটা জ্যাকেট বা ফুল হাতা সোয়েটার পরলেই হয়ে যায়ে , নিচে কি পরা, তা ইস্ত্রী করা না কুচ্কোনো, কেমন দেখতে, কিছু এসে যায় না।  পুরনো হলেও এসে যায় না। সুন্দর জামা, সুন্দর দোকান, সুন্দর ক্রেতা ,বিকিকিনি কেন্দ্রিক জীবনকল্পনা, ভালো থাকা কাকে বলে, তার জনসমক্ষে প্রকাশের যে ‘আধুনিক, সুশীল,পাতে দেওয়ার মতো’ ব্যাকরণ, তা টেলিফোন-কারী শ্রোতা লঙ্ঘন করতে শুরু করে।  আমি তখন স্ট্র্যান্ড রোড-এ। বিরল এক মুহূর্ত। উপস্থাপিকা একটু বিষয় বদলাতে চেষ্টা করে কিন্তুপ্রাণবন্ত সচল ডাকসু-তে শুধু সুন্দর গলা দিয়ে অচল করা শক্ত। শ্রোতা থামে না, সে বলে যায়  অবলীলায়, ‘প্লাস ২-৩ দিন কাপড় না  কাচ্লেও শীতকালে গন্ধ কম হয়।  ধরেন চান টান হয়নি তখুন  ভালো করে সেন্ট টেন্ট মেরে জ্যাকেট দিয়েও বিয়েবাড়ি  যাওয়া যায়।  কেউ বুঝতে পারবে না।’ ‘স্টাইলিশ’ ফরফর ইংরেজি-বাংলা মিলমিশ  উপস্থাপিকার গলায় অপ্রস্তুত বেকুব হাসি শুনতে পাই। এর পর বিজ্ঞাপন বিরতি। আর আমার ট্যাক্সি পৌছে গেছে হাওড়া স্টেশন, হাতে কিছুটা সময় নিয়েই। এই ভাবেই, আজকের  সময়ে, কলকাতার পথে যেতে যেতে শুনলাম, যেন আরেক গাজী ইলিয়াসের গলা – ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ কোন এক অজানা কারণে আমার মনে পড়ে  যায় ছাত্রজীবনের স্লোগান ‘তাই তো বলি কমরেড, গড়ে তোল ব্যারিকেড’। ঠাকুর সব দেখছেন, কিন্তু কি ভাবছেন?

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bahishkrit Samaj, Bengal, Culture, Elite, Kolkata, The perfumed ones, Urbanity

বাম্বু ও বিষ্ণু

যে জাতি মাতৃভাষার অধিকার ও সম্মান রক্ষা করতে মানভূমে, ঢাকায়, বরাক উপতক্যায় বারবার রাস্তায় নেমেছে, মার খেয়েছে, মৃত্যুবরণ করেছে, এমনকি দেশ স্বাধীন করেছে, সে জাতির মুখের ভাষার প্রশ্ন যে রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে, সে আর আশ্চর্য কি। তবে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক কালের যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে মুখ্যমন্ত্রীর মুখের ভাষা নিয়ে, তা ঠিক ভাষার অধিকার নিয়ে নয়, সর্বসমক্ষে শালীনতা বজায় রাখার দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে। সে কথায় একটু পরে আসব। প্রথমেই বলি আমার নিজের কুল-গরিমা নিয়ে। আমার পিতৃকুল হুগলী জেলার পাটুলিগ্রামের অনেক বহুকালের (মানে বহু শতকের) বাসিন্দা এবং এই ‘দেশ’-এর সঙ্গে এই প্রজন্মেও আমাদের সম্পর্ক বেশ গভীর। আমরা রাঢী ব্রাহ্মণ এবং কৌলিন্যপ্রাপ্ত (অর্থাৎ কুলীন)। আমার পূর্বপুরুষেরা বিবাহ-সুত্রে ফুলিয়া মেল প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বিন্যাসে আমরা একদম যাকে বলে টপ-ক্লাস। আমাদের কুলের একজন রায় বাহাদুর ছিলেন, যা কারণে অকারণে (যেমন এখুন) আমরা টুক করে জানিয়ে দিই (ইংরেজিতে যাকে বলে নেমড্রপিং)। এর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। তা হলো যাকে কিনা কিছু পন্ডিত এক বিশেষ ধরণের ‘সাবল্টার্ন’ বলেন, এবং আমাদের ‘নিজেদের’ মধ্যে চর্চায় বলি ‘ছোটলোক’ (প্রকাশ্যে বলি অন্ত্যজ, ব্রাত্যজন ইত্যাদি ), আমরা আর যাই হই, তা নই। আমার এই কুলেরই আমার প্রিয় এক জ্ঞাতি জ্যাঠামশাই আমাদের পৈতের পরের বছর দুর্গাপূজার সময় এক সংস্কৃত মন্ত্র শেখান। এটি আচমন মন্ত্র। কোনো অস্ট্রিক ব্যাপার স্যাপার নাই। মন্ত্রটি এরকম – ‘ওঁ বিষ্ণু তদ্‌বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্‌।। ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু।’ কুলীন টু কুলীন জ্ঞান ট্রান্সফার হিসেবে আমার রসিক জ্যাঠা ফাজিল ভাইপো-কে এর মানে বলেন। ‘ওঁ বিষ্ণু’ অর্থাৎ একটি বাঁশ , তদ্‌বিষ্ণোঃ অর্থাৎ সেই বাঁশ, পরমং পদং সদা পশ্যন্তি অর্থাৎ পরের পশ্চাতে সদা প্রবেশ করাইবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বলাই বাহূল্য, আসল মানেটা তাই ছিল না। সেই অর্জিনাল-এ বিষ্ণুর বঙ্গায়ন হয়ে বাঁশ হয় নাই। আমাদের পাটুলিগ্রাম তথা জিরাট-বলাগড় এলাকায় বাঁশঝার বেশ ঘন। তাই হয়তো বিষ্ণু যখন হিন্দুস্তান থেকে বাঁশঝার নিবিড় এই বাংলাদেশে আসেন আমাদের হাত ঘুরে, একটু অদলবদল হয়ে যায় আর কি। ইয়ার্কি মারছি বলে রাখলাম – বিশেষতঃ বোষ্টমদের প্রতি এই ক্ষমাপ্রার্থনা। আমরা শাক্তরা একটু ইয়ে হই। এবার ফিরি রাজনীতি, ভাষা ও শালীনতা প্রসঙ্গে।

পাটুলিগ্রামে যা বাঁশ, লন্ডনে তাই ব্যাম্বু, আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি জল্পাইগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তাই হয় ‘বাম্বু’। এতে বেশ একটা ‘বিতর্ক’ হয়েছে। এক দল বলছেন, রামঃ, বঙ্গেশ্বরীর মুখের এই ভাষার ছিরি? একদম ‘ঝি-ক্লাস’। কোটি টাকার আঁকিয়ে ও গল্প-কবিতার বই লিখিয়ের আড়ালে এই তাহলে স্বরূপ? আরেকদল বলছেন, আমাদের এই বাংলাদেশের লক্ষলক্ষ মানুষের মুখের ভাষা এরকমই। যিনি জননেত্রী তার ভাষাও যে হবে গণমানুষের মতো, নন্দনে বসে মার্কেজ পড়নেওয়ালাদের মত নয়, তা বলাই বাহূল্য। দুই পক্ষকেই বলি, ভাবের ঘরে চুরি করে কি লাভ? বাম্বু দেওয়ার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়া, প্রবল ভাবে শ্রেণী-ঘৃনা উগরে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর শব্দচয়নকে সমালচনার উছিলায়, এগুলি ভন্ডামি ও ন্যক্কারজনক। একই সাথে, যারা এমন ভাব করছেন যে কিছুই হয়নি, ভাষা তো ভাষাই, শব্দ তো শব্দই, মানুষে তো এমন করেই কথা বলে গোছের অজুহাত দেখিয়ে বাম্বুর খুঁটি দিয়ে নেত্রীর সাথে জনগনের হৃদয়ের সম্পর্কের গভীরতা মাপছেন, তাদেরকে বলি যে বাংলার গণমানুষকে অপমান করবেন না।

এটা ঠিক যে সব শব্দই সমানভাবে একটি ভাষার সম্পদ – বেশি সম্পদ বা কম সম্পদ নয় । ভাষা জীবন পায় তার ব্যবহারে। সেই ব্যবহারের একটা প্রেক্ষিত আছে। ঠিক যেমন আমরা মাষ্টারমশাই-এর সামনে সিগারেট খাইনা ( যারা উচ্চতর লিবার্টি চেতনার ভারে কুঁজো হয়ে গেছে, তাদের কথা বাদ দিলাম ), ঠিক তেমনই মা-বাপের সামনে কিছু ধরণের শব্দ প্রয়োগ করিনা যা কিনা ইয়ার-বন্ধুদের সাথে চলে। ব্যক্তিগত জীবন ও যাপনকে উলঙ্গ ভাবে মেলে ধরা যাদের জীবনাদর্শ, তারা এই স্থান-কাল-পত্র বুঝে শব্দ প্রয়োগের মধ্যে দ্বিচারিতা দেখতে পারেন। তাদেরকে অনুরোধ, যে ধরনের গণমানুষের কথা বলে বাম্বুর সামনে পর্দা টানা হচ্ছে, সেই রকম ভাষা তারা পথে যেতে-আসতে রোজ ব্যবহার করে দেখুন। গণমানুষ বলবেন ‘মুখ সামলে’। এই গণমানুষ ‘গালমন্দ’ বোঝেন, আবার বোঝেন কারুর মুখের কথা সুন্দর। তাই জনগনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বুলেট বা বাম্বু, কিছুই ছোঁড়া অনুচিত। জলের লাইনে ‘ঝি’-দের ঝগড়ার ভাষা টুকুই যারা শুনেছেন কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা রোজ সক্কাল সক্কাল উঠে কিছুক্ষণের কর্পোরেশনের জলের সাপ্লাই-এর জন্য একাধিক বালতি নিয়ে অপেক্ষা করা যাদের জীবন-যাপনের অংশ নয়, তাদেরকে বলি – এরা গান গায়, ভালবাসে,ঘুম পাড়ানিয়া গান শোনায় শিশুদের। আপনারা যাদের লোকসঙ্গীত বিশ্ববাজারে বেচে খান ও ফান্ড আনান, এরা সেই ‘লোক’। গালি দেওয়া বা বাম্বু দেওয়া, একটিও সহজাত নয়। হয় তা পরিস্থিতির সামনে একটি প্রত্যুত্তর, চরম হতাশার প্রকাশ কিংবা জিঘাংসার উদগিরণ। আমি অবশ্যি কলকাত্তাই সেই ভদ্দরলোক শ্রেণীকে এসব গালি-চরিত থেকে বাদ দিলাম, যাদের কাছে f-ওয়ালা ৪ বর্ণের ইংরেজি গালি হলো কুল (অর্থাত নব্য কৌলিন্যের চিহ্ন) কিন্তু বাংলা গালি হলো চীপ ও ভালগার। তারা অন্য গ্রহের বাসিন্দা। তাদের দূর থেকে প্রণাম।

বাম্বু দেওয়া বা বাম্বুর দ্বারা তাড়া খাওয়া, এ যদি রাজনীতির ভাষা হয়, তাহলে আমি বলব এ ভাষা অশালীন হোক না হোক, চরম হিংস্র তো বটেই। রাজনীতি যখন এলাকা দখল বা এলাকা ধরে রাখার খেলায় পরিনত হয়, সেই প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বাম্বু এক প্রতিশোধমূলক একক। প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার আরেক মন্ত্রী সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতির কুকথার বলেছেন যে নিরঞ্জন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। গ্রামাঞ্চলের মানুষ উঠতে বসতে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ান না, বাংলার তৃণমূল স্তরের মানুষ বাম্বুর চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকেন না। তারা চাকরি চান, নিরাপত্তা চান, বাম্বু দিতে চান না, নিতে তো নয়-ই। বাঁশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংগ্রাম কল্পনা আমাদের বাংলাদেশে বেশ পুরনো। বাঁশেরকেল্লার মধ্যে যতটা ছিল ‘সাবল্টার্ন’ ততটা ছিল হিংস্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ। প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার আরেক মন্ত্রী সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতির কুকথার সাফাইতে বলেছেন যে নিরঞ্জন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। গ্রামাঞ্চলের মানুষ উঠতে বসতে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ান না, বাংলার তৃণমূল স্তরের মানুষ বাম্বুর চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকেন না। তারা চাকরি চান, নিরাপত্তা চান, বাম্বু দিতে চান না, নিতে তো নয়-ই। রাজনৈতিক দল একটি তাঁবুর মত, তা দাঁড় করিয়ে রাখতে বাঁশ লাগে। বাঁশ যেন বাংলার রাজনীতিতে স্থায়ী কাঠামোর কাজ করে, সচল না হয়। নইলে তাঁবু-ও ভেঙ্গে পড়বে। তাঁবুর ব্যাপারীরা বাঁশ সচল করার আগে আশা করি একটু ভাববেন। কারণ ফেইসবুকে সেদিন দেখি এক জায়গায় লেখা , ‘সময় থাকতে পিওর হন,নইলে বাম্বু দেবে জনগণ’।

2 Comments

Filed under বাংলা, Bahishkrit Samaj, Bengal, Caste, Elite, Kolkata, Language, Polity, Power

কলকাতার কাশ্মীর

[ Doinik Arthokotha (Dhaka), Nov 2014]

কয়েকদিন আগে দিল্লীর একটি মেগাজিনে একটা লেখা দেখলাম। শিরোনাম ‘কলকাতা আফটার ক্যালক্যাটা’। নামটি বেশ ব্যঞ্জনাময়।  এই লেখা তাদের জন্য, যাদের জন্য ক্যালক্যাটা ছিল সুন্দর, তার পরে তা যখন কলকাতায়ে পরিণত হলো,  তখন শহরের জাত গেল, সম্মান গেল, সেই ‘চার্ম’-টা আর রইলো না। এ শহরের একটা বড় অংশ কিন্তু কখুনই কলকাতা থেকে ক্যালকাটায়ে সে অর্থে প্রবেশ করেনি ফেরিওয়ালা বা ভৃত্য হিসেবে ছাড়া।  তাদের জন্য কোনো ‘কলকাতা আফটার ক্যালক্যাটা’ নেই।  রয়েছে কলকাতার নিরবিছিন্নতা। ক্যালক্যাটা পরিযায়ী পাখিদের শহর।  তারা অনেকে আজ উড়ে গেছে ব্যাঙ্গালোর, বোম্বেতে । যদিও সেখানেও বেঙ্গালুরু বা মুম্বই-এর সাথে তাদের যোগ ক্ষীণ।  ঠিক যেমন কলকাতায়ে অবস্থান-কালীন সময়ে এই ক্যালক্যাটা কোনো ক্রমে কলকাতা-কে বাঁচিয়ে চলত। কলকাতার পরিসর থেকে ক্যালক্যাটার স্বেচ্ছা-নির্বাসনে কলকাতার খুব তফাৎ হয়নি।  কলকাতা নিজের  মধ্যে যাযা ধারণ করে, তা ক্যালক্যাটার ধারণার অতীত। এমনকি এক কলকাতা হলো কলকাতার কাশ্মীর।

বলাই বাহুল্য এই কাশ্মীরের সাথে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের ‘কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী’ হুঙ্কারের কাশ্মীরের মিল নেই।  প্রায় সকল কাশ্মীর-ই আমাদের মনে মনে বানিয়ে নেওয়া। প্রায় সকল বললাম কারণ কাশ্মীরিদের-ও একটা কাশ্মীর আছে , যেটা এই নানা কাশ্মীরের মাঝে হারিয়ে যায়। ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’র হুঙ্কারে , স্লোগানে বাস্তবের টেকনাফ বা তেঁতুলিয়া বড় প্রান্তিক।  উচ্চ্চারিত অক্ষরের মিল ঘটিয়ে স্লোগান বলশালী ও ছন্দময় হয়, কিন্তু টেকনাফ ও তেঁতুলিয়ার সাথে ঢাকার দূরত্ব একই থেকে যায়। প্রসঙ্গত, পশ্চিম বাংলাতেও একাধিক তেঁতুলিয়া নামধারী জায়গা আছে। তবে এখুন সেটা থাক।ফিরি কাশ্মীরে , কলকাতার কাশ্মীরে।

আমার কর্মস্থল আমার ঘর থেকে বেশ খানিকটা দূরে।  আমি থাকি কলকাতা শহরের দক্ষিণ দিকে, চেতলা অঞ্চলে।  এলাকাটি শহর কলকাতার থেকে পুরনো – তখন নাম ছিল জেলেপাড়া। এখুনো এই জেলেপাড়া নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। জেলেপাড়া থেকে আজকের চেতলায়ে  এলাকার  বিবর্তন-ও এক অসামান্য গল্প, যা আরেকদিন বলব । তো রোজ-ই চেতলা থেকে আমি যাই বরানগর। এটি কলকাতা ছাড়িয়ে উত্তরে একটি ছোট শহর। আমি কলকাতার ভূগর্ভস্থ মেট্রো-রেলে চড়ে পৌছই শ্যামবাজার – একটি  বিশাল, বর্ণময়, জনবহুল, সদাব্যস্ত বাজার এলাকা – তাঁতের শাড়ি থেকে ভাং-এর মিষ্টি, সবই পাওয়া যায়। এখানেই ৫টি রাস্তা এসে মিশেছে – তাই নাম ৫ মাথার মোড়। কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সুভাষ চন্দ্র বসুর মূর্তি, ঘোড়ায় চড়া, সমর-সজ্জায়। ঘোড়ার উন্নত ল্যাজ যে দিকে নির্দেশ করে, সেদিক ধরে আমি এগিয়ে একদিন পৌছলাম এক তেলে ভাজার  দোকানে। সবই সুলভ মূল্যের – একটু বেশীই সুলভ যা কিনা আমার মতো সবর্ণ ভদ্রলোক স্বচ্ছল মানুষের মনে খাবারের গুণমান সম্পর্কে সন্দেহ জাগায়। সঙ্গের ছবিতে দিলাম মূল্য তালিকা। জিনিসগুলি প্রায় সবই বেশ চেনা – আলুর চপ, বেগুনী, কচুরী, সিঙ্গাড়া, ধোকা ইত্যাদি। চোখ আটকালো কাশ্মিরী চপ-এ গিয়ে।  এ আবার কি জিনিস? জিজ্ঞেস করলাম দোকানিকে।  ততক্ষণে আমার হাতে কাগজের ঠোঙায় ইতিমধ্যেই একটা ভাজা ধোকা রয়েছে। দোকানি বলল, খেয়ে দেখতে পারেন একটা।  আমি নেবার আগে জিজ্ঞেস করলাম কেমন খেতে? দোকানি  বলল খেয়েই দেখুন না – মাত্র ৩টে টাকাই তো দাম। তারপর বলল, একটু টক-ঝাল-মিষ্টি। ৩
টাকার কাশ্মীরি চপ কেনার আগে অজানা স্বাদ নিয়ে ঠকে যাবার ব্যাপারে সজাগ এই ক্রেতা (অর্থাৎ আমি) যে কতবার দামি খাবারের হোটেলে গিয়ে নাম না জানা ভিনদেশী খাবার নিয়ে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করেছে। স্থান, কাল, পত্র দেখে আমার পরীক্ষা কমে, নিরীক্ষা বাড়ে। স্বচ্ছল মানুষের ব্যক্তিগত দুনম্বরীর নানা অব্যক্ত বিভঙ্গ আছে, এটি তার একটি। আজ তার-ই মধ্যে একটা বাজারে প্রকাশ করে দিলাম। সে যাই হোক, নিলাম একটা কাশ্মীরি চপ।  বাইরে থেকে দেখতে ভেজিটেবিল চপের থেকে আলাদা নয়, ভেতরেও বিশেষ তফাৎ নেই।  তফাৎ-টা স্বাদে। সত্যই টক-মিষ্টি, ঝাল প্রায় নেই। উদরস্থ করলাম দ্রুত। ভাই, এটাকে কাশ্মীরি চপ কেন বলা হয় ? সে বলল, কাশ্মীরে খায়টায় বোধহয়, ঠিক জানিনা। তবে অনেকদিনের আইটেম। আমারও এই ‘কাশ্মীরে খায়টায়’ ব্যাপারটি ঠিক বিশ্বাস হলো না।  তাতে কি। নিখিল বাংলাদেশে, কলকাতায়, ঢাকায়, টেকনাফ থেকে হাসিমারা, দীঘা থেকে বিয়ানীবাজার ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে ব্রেজিল-আর্জেন্টিনা মত্ততা, তা একান্তই আমাদের, ব্রেজিল-আর্জেন্টিনা তার খবর জানে না, রাখেও না।  তাতে আমাদের ভারী বয়েই যায়। আমি নিশ্চিত আরো এমন ছোট দোকানে ‘কাশ্মীর’ বেঁচে আছে।  কলকাতার এই কাশ্মীরি ঐতিহ্য একান্তই তার নিজের। এবং খাঁটি। এর ভাষা ও ভাষ্য, পোড়া নিকৃষ্ট তেল, বদহজম, ঘাম, টক-ঝাল-মিষ্টি আমাদের। এই কাশ্মীরের তারিফ করতে গেলে শ্বেতাঙ্গ পন্ডিতের মতামত ধার করতে হয় না, যেমন করতে হয় শ্বেতাঙ্গ মানসিকতার কালা আদমির ইংরেজি রচনার ক্ষেত্রে। সায়েব পিঠ চাপড়ে সাবাস না বললে কালা আদমির ইংরেজি রচনা থেকে যায় অক্ষম। কলকাতার এই কাশ্মীর চর্চার জন্য শারীরিক বা মানসিক শ্বেতাঙ্গের দ্বারা পিঠ চাপড়ানোর দরকার পড়ে না। শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টির শ্বেতাঙ্গ মননের সীমাবদ্ধতা বিশাল। সে জানেই না আমাদের পিঠ কোথায় আর পেট কোথায়। তাই অনেক মরেও বাংলা বেঁচে গেছে। ঠাকুর মঙ্গলময়।

এই শহর কলকাতায় আমি আরো কাশ্মীর দেখেছি। যখন আমি কলেজ স্ট্রিটস্থ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তাম, তখন মাঝে সাঝেই যেতাম কলুটোলা স্ট্রিট ধরে চিত্তরঞ্জন এভিনিউর ওপারে, মৌলানা সৌকত আলী স্ট্রিটে। সেখান থেকে বেরিয়েছে এক অবিস্মরণীয় ছোট গলি – নাম ফিয়ার্স লেন। ফিয়ার্স লেন-এর নানা মহিমা নয় আরেকদিন বলব, আজ আসি এখানকার সুতা কাবাবের দোকানের সামনে। এখানকার অসম্ভব স্বস্বাদু শাল-পাতায় পরিবেশিত কাবাব আমি খেয়েছি অনেকবার।  একদিন দেখি উল্টোদিকে বসেছেন আরেকজন – সাদা জামা-কাপড়, টুপি-দাঁড়ি, সামনে একটা ডেকচি, আর পাশে লেখা ‘কাশ্মীরি কাবাব’। গিয়ে খেলাম।   যা পেলাম, তা হলো দুপিস ছোট বান-রুটির মধ্যে হলুদ রঙের থকথকে মশলাদার কাই-তে মাংসের কিমা।  অর্থাৎ এই সে অর্থে ‘কাবাব’ নয়। জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে, কবে থেকে বসছেন ( আমি তো প্রায়-ই যেতাম ওখানে, আগে দেখিনি), কাশ্মীরি ব্যাপারটা কি, ইত্যাদি। জানলাম ওরা ৩ পুরুষ কলকাতায়, এরা হিন্দুস্থানী – সেখান থেকেই এখানে আসা কিন্তু কাশ্মীর থেকে কিনা বলতে পারেন না, জানবাজারে একটা ঘড়ি সারাই-এর দোকান ছিল বা আছে কিন্তু তা ভালো চলছে না, নতুন ব্যবসা শুরু করে আয়ের চেষ্টা করছেন। আর কাশ্মীর ? ওটা এমনিই লিখেছেন।  কদিন বাদে ওনাকে আর দেখিনি – হয়ত কাশ্মীরি কাবাব ব্যবসা চলেনি, হয়ত ঘড়ি সারাই-তে ফের একটা চেষ্টা করছেন, হয়ত অন্য কোথাও কাশ্মীরি কাবাব বেচছেন, যেখানে উল্টোদিকেই এমন সফল কাবাব দোকান নেই। যদি কাশ্মীরি কাবাব ব্যবসা সফল হত, এর ৩-৪ পুরুষ পরে এক খাঁটি ‘কাশ্মীরি’
আইটেমটিকে , পরিবারটির আদি কাশ্মীরি বংশপরম্পরা ও আরো নানা প্রবাদ তৈরী হত। সেটা হয়নি।  গড়ার সাথে সাথেই ভেঙ্গে গেছে হয়তো। কিন্তু যেগুলি ভাঙ্গেনি, এমনই অনেক খাঁটি ‘কাশ্মীর’ , এমনই অনেক খাঁটি ‘বঙ্গীয়’ ব্যাপার-স্যাপার লুকিয়ে আছে আমাদের মাঝে, আমাদের অস্থিমজ্জায় , আমাদের আত্মপরিচয়ে, বাঙ্গালিত্বে।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Kolkata, Urbanity

বঙ্গদর্শন

[ Ebela, 4 Nov 2014]
খণ্ডিত বঙ্গের দুই অংশ – ছোট ভাই পশ্চিমবঙ্গ ও বড় ভাই পূর্ব্ববঙ্গ।  এই দুই বঙ্গ মিলেই আবহমানকালের বাংলাদেশ – যদিও ১৯৭১-এর পর তা মূলতঃ পূর্ব্ববঙ্গের জাতিরাষ্ট্রের
‘অফিসিয়াল’ নামে পরিণত হয়েছে। নিজেকে বাংলাদেশ নামে ডাকার অধিকার পশ্চিমবঙ্গের বড় অংশই ছেড়ে দিয়েছে। সেটা দুঃখজনক। নিজের নাম স্বেচ্ছায় কেন কেউ নিজে থেকেই ভুলে যাবে, তা আমার বোধগম্য নয়। তো সে যাই হোক, এতটাই আত্মবিস্মৃত আমরা যে বাংলাদেশ নামটির পুরো অধিকারটাই আমরা তুলে দিয়েছি পূর্ব্ববঙ্গের হাতে। খন্ড-বঙ্গের ছোট খন্ড আমরা।  এই খন্ড ভাব আর ছোট ভাব দুটি প্রায় হারাতে বসেছে আজ দিল্লীর তালে নাচতে গিয়ে। তাই তো আজ পশ্চিমবঙ্গের অধঃপতিত জাতি নাক সিঁটকে বলতে শিখেছে ‘ওরা তো বাংলাদেশি’। আর তোরা হলি ‘ইন্ডিয়ান’। বাঙ্গালী তাহলে বোধহয় বঙ্গোপসাগরের গভীরে বসে মাঝে মাঝে মুণ্ডু তুলে কলকাতার ডাঙ্গা দেখছে – কেকেআর, শাহরুখের নাচ, আটলেটিকো, দিওয়ালি, হোলি, গুরগাঁও তথা আরো হরেক বেঙ্গলী ব্যাপার-স্যাপার। এরই মাঝে বোমা ফাটল বর্ধমানে। আরেক রকমের বেঙ্গলী সকলের টিভিতে এসে উপস্থিত। বাংলাদেশী ! এবার আর গরু-পাচারকারী বা কাঁটাতার পেরোনো বেআইনি হিসেবে নয়। পরিচয় এবার জেহাদি। খবরে তেমনই প্রকাশ।
অথচ চিরকাল ব্যাপারটা এমন ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ বুঝত ও জানত যে ‘ওপারে’ যে দেশটি, তার সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক। সে সম্পর্কের স্বীকৃতি কোনো আইন বা সংবিধান দেয় না। তাতে কি বা এসে যায়? এসে যায়নি বলেই তো ১৯৭১-এ পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গে  যে বিশেষ সংহতির উন্মাদনা দেখা গেছিল, তাতে অনেক ঐক্য ও অখন্ডতার পূজারীরা ভয়ানক জুজু দেখেছিল। যখন স্লোগান উঠেছিল – এপার বাংলা, অপার বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলা – তখন অশোকস্তম্ভের ৪ সিংহের ভুরু কুঁচকে গেছিল। পূর্ব্ববঙ্গের এক নকশালপন্থী (হ্যা, ওদিকেও ছিল ও আছে) দল -এর স্লোগানে ছিল অন্যতর কল্পনার বীজ – দুই বাংলার চেকপোস্ট উড়িয়ে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। সে  বীজ থেকে যে কোনো চারাগাছ বেরোয়নি আজ অবধি, তা বলাই বাহুল্য। যে কোন দাবি বা স্লোগান একটি বিশেষ সময়ের দলিল। আজ এই স্লোগান উঠলে অবশ্যই শুনতে পাব – চেকপোস্ট উড়িয়ে মরি আর কি। এমনিতেই বিএসএফ দিয়ে ওদের পিলপিল করে আশা রোখা যাচ্ছে না, উড়িয়ে দিলে তো পশ্চিমবঙ্গ-টাই দখল করে নেবে।  ন্যায্য চিন্তা, বিশেষতঃ যখন ১৯৭১-এর পরেও পূর্ব্ববঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর
নির্যাতন, সম্পত্তিদখল, দাঙ্গা ইত্যাদি চলেছে প্রায় নিরন্তর – সরকারী/বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়। আর হিন্দুদের পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে আসাও চলেছে নিরন্তর।  চলছে আজ-ও। তবে তারা নিম্নবর্গের, তারা ব্রাহ্ম্মন-কায়স্থ-বৈদ্য নয়, তাই তাদের আখ্যান পশ্চিমবঙ্গে উপেক্ষিত। তার উপর আছে এক ধরনের মেকি ধর্মনিরপেক্ষতার। ১৯৭১-এর সংহতি থেকে আজকের পূর্ব্ববঙ্গের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞানহীনতা, ইটা ঘটল কি করে? কি করে পশ্চিমবঙ্গ তার ওপর অংশ কে দেখার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলল?  কেন আজ তাকে দিল্লীর থেকে চোখ, ক্রাচ আর দূরবীন ধার করে পুর্ব্ববঙ্গকে দেখতে হয়। কখন আমরা অন্ধ, অশিক্ষিত ও পঙ্গু হয়ে গেলাম? কখন আমরা ‘বৈরী বাংলাদেশী’ নামক চরিত্রের নির্মাণের দিল্লী রেজিমেন্টে নাম লেখালাম?
আজকে বর্ধমানের কল্যাণে আমরা জেনেছি জামাত-এ-ইসলামীর নাম। এর আগের গল্প কেন আমরা এত কম জানি? আসলে আমরা তো ক্রমে পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিরও নাম ভুলতে শিখেছি, ওপারের খবর কি জানব। বরং দিল্লি-বম্বে-গুরগাঁও-নয়ডার মানচিত্র মুখস্থ করি গিয়ে। সচিন মোদের  ব্রহ্মা, শাহরুখ মোদের বিষ্ণু আর দিল্লীশ্বর হলেন সাক্ষাত মহেশ্বর। মন্দিরে আর জায়গা কই ? কার সন্তান কত অন্যাশে বঙ্গ-ত্যাগ করে দিল্লী-বোম্বাই পৌছেছে, এই যাদের সাফল্যের মাপকাঠি, তারাই ক্ষুব্ধ হয় বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে। অনুপ্রবেশ অবশ্যই সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখা দিতে পারে, কিন্তু বলবে কারা – যারা পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করে উন্মুখ, তারা ? বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপক অংশ জেহাদ করতে কাঁটাতার পেরোন না, আসেন জীবিকার জন্য। দুবাই বা মালয়শিয়া পাথেয় যোগার করতে পারলে এদিকে আসতেন-ও না। ঠিক যেমন আমলাশোল থেকে ঢাকা যাবার সহজ ব্যবস্থা থাকলে অনাহারে মরার থেকে অনেকেই গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতে বেশি পছন্দ করতেন।
ক্ষুদ্রতর পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে বৃহত্তর পূর্ব্ববঙ্গকে বোঝার দায় আমাদের আছে। আজকের পুর্ব্ববঙ্গকে। কবেকার ফেলে আসা ভিটেকে খোঁজা না , সেই ভিটেতে যে ব্যাপক বদল ঘটেছে – সেটাকে বোঝা। আমাদের জানতেই হবে যে শিশু ফালানি খাতুনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ কেন কাঁটাতারে ঝুলছিল, জানতেই হবে কোন সীমান্তরক্ষী তাকে খুন করলো – তবে জানতে পারব এই পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমান্তরক্ষীদের দৈনিক অত্যাচারের কথা।ওদিকের সীমান্ত রক্কাহ করে বাঙ্গালী। স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষা বোঝে।  এদিকের কথা আর বললাম না। মার্কিন দূতাবাসের সামনের রাস্তার নাম হোচিমিনের নামাঙ্কিত করে যে দুঃসাহস ও ঘৃণা জানিয়েছিল কলকাতা, সেই দায়তেই জানতে হবে কেন ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের সামনের রাস্তা ফেলানির নামাঙ্কিত করার দাবি ওঠে।  জানতে হবে ওদিকের সুন্দরবনের রামপালে ভারতের এনটিপিসি-র পরিবেশ ধ্বংসকারী বিদ্যুত প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গবাসী দায়হীন কিনা। জানতে হবে সব সাইক্লোন শেষ মুহুর্তে আমাদের কাটিয়ে যখন ওদিকে ঘুরে যায়,তারপর কি হয়? তার জন্য পরের ছুটিতে হিমাচল-কন্তাকুমারি-রাজস্থান-আন্দামান না করে একটু যান-না ওদিকে।
এক শ্রেনীর পশ্চিমবঙ্গীয় ওদিক ঘুরে এসে এক রোমান্টিক স্বর্গের চিত্র আঁকেন। ঢাকায় দুর্গাপুজো দেখে বলেন, সব ঠিক-ই আছে। ফি বছর যে বেশ কিছু দুর্গাপ্রতিমা আক্রান্ত হয় ওদিকে, সেটা বলতে কুন্ঠা কেন? ওদিকের সংবিধানের আগেই রয়েছে একেশ্বরবাদী ইসলামী বাণী।  এদিকে মা দূর্গা সহায় বা জয় শ্রী রাম নেই। এদিকে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তিলুঠ হচ্ছে, দেশত্যাগে
বাধ্য করা হচ্ছে, একথা নিন্দুকেও বলতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে ওদিকের লজ্জিত হওয়া উচিত। অতীতের হিন্দু জমিদারের অত্যাচারের শাক দিয়ে আজকের বাস্তবতার মাছ ঢাকা যায়না। আবার ওদিকেই শাহবাগে ৭১-এর চেতনাধারী মূলতঃ মোসলমান বিশাল যুবসমাবেশে ডাক ওঠে ‘সূর্য্য সেনের বাংলায়, জামাত-শিবিরের ঠাই নাই’। সূর্য্য সেনের জন্মদিন উপলক্ষ্যে  ওদিকের খবরের কাগজে একটি ব্যাঙ্কের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দেখেছি – এদিক কল্পনা করতে পারে?
শরতচন্দ্র বাঙ্গালী ও মোসলমানের মধ্যে ফুটবল খেলিয়ে অনেক গাল খেয়েছেন। আজ কলকাতা নামধারী ফুটবল-দলের সাথে ঢাকা মহমেডান ক্লাবের খেলা হলে উনি বুঝতেন, মোসলমানের টিমটাই বাঙ্গালীর টিম। কলকাতার দলটি বাঙালিও নয়,মোসলমান-ও নয়, এক্কেরে আন্তর্জাতিক – স্রেফ টাকাটা দিল্লি-বম্বের। অন্যের মাতাকে মাতৃজ্ঞানে পুজো করতে বাধ্য হবার মত পরাধীন ওরা নয়, সেটা ‘মাইন্ড’ না করার মত শিরদাঁড়াহীন-ও ওরা নয়। ওরা বাংলার ভবিষ্যৎ বলতে জাতির, ভাষার ভবিষ্যৎ বোঝে – আমরা বুঝি রাজারহাটে কল-সেন্টার।  আমাদের মধ্যে ‘কানেকশান’ সত্যিই আজ কম।  কারণ ওরা বাঙ্গালী, আমরা বং।

1 Comment

Filed under বাংলা, Bengal, Delhi Durbar, Dhaka, Identity, India, Kolkata, Nation

খেলা স্রেফ খেলা নয়

[ Ebela, 15 Jul 2014]

পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল আমাদের চেতলা পাড়া থেকে রাসবিহারী মোড় যাওয়ার অটো রুটেই। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের রক্ত পতাকাগুলি নেমে আসতে শুরু করলো। তার জায়গায়ে এলো মা-মাটি-মানুষের নিশান। এখুন-ও সেগুলি উড্ডীন। এই পথেই এক-কালে বসত বিরাট রথের মেলা। চলত ১৪ দিন। এখুন সে ঐতিহ্যশালী মেলা চেতলা ব্রিজের নীচে নির্বাসিত। পরিসরে ১০ বছর আগের তুলনায় এক দশমাংশ-ও নয়। সে যাই হোক, বর্ষাস্নাত এক সন্ধ্যায় আমি রাসবিহারী মোড়ের অটোর জটলার দিকে গেলাম। দেখি কয়েকটা অটো-তে এক নতুন পতাকা। ব্রেজিল দেশের। এই পতাকা বদল সাময়িক এবং তার জন্য এই তরুণ অটোচালককে কোন চোখ রাঙ্গানি দেখতে হবে না।  কোনো সরকার, কোনো দল , কোনো ইউনিয়ন বা ক্লাব-কেই ব্রেজিলের থেকে কোনো ভয় নেই।  তাই একয়দিন নতুন পতাকা উড়বে। তা উরুক।  শত পতাকা বিকশিত হোক।

ব্রেজিল যে কজন মানুষকে গৃহহীন করে এই বিশ্বকাপ রোশনাই করছে, কত ব্রেজিলীয় সুরেশ কালমাদী রিও-সাওপাওলোর স্টেডিয়ামের ভিআইপি দর্শকাসনগুলি আলো করে আছে, তার বিবরণ আমাদের নরম হৃদয়ে ধাক্কা মারতে পারে, তাই ওই খারাপ জায়গায়ে বেশি হাতরাবো না। আর্জেন্টিনার ভক্তদের হাতে ব্রেজিলের বিরুদ্ধে খেলার মাঠের বাইরের রসদ দিয়ে লাভ নাই। এ যুদ্ধে যেই জয়ী হোক, নিখিল বাংলাদেশে একটি মানুষের কিসুই হবে না।  তবে তাতে কি? তা নয়, শুধু এটাই যে এই বাংলাদেশের বুকেই কলকাতার মাটিতে এক ফুটবল
যুদ্ধের ফলাফলে আমাদের কিসু এসে গেছিল। আইএফএ শিল্ডে কালা আদমির দল মোহনবাগান যখন সাহেবদের খেলায়ে সাহেবদের বাচ্চাদের হারিয়েছিল। এই খেলা শুধু খেলা নয়।  সমাজ-জাত কোন কিছুই শুধু খেলা থাকে না, সমষ্টিগত বোধ তাকে ক্রমে সামাজিক সত্যে পরিনত করে। বাংলাদেশের পাড়ায়ে পাড়ায়ে যে ফুটবল-চর্চা তা অনেকটাই কিআইএফএ শিল্ডের  যুদ্ধের উত্তরাধিকার নয় ? আর এই চর্চা যে খেলার জন্ম দেয়, তার দাম, তার শিহরণ, ঠিক হয়েছিল এই মাটির নিরিখে।  আমাদের সেরা দল ব্রেজিল বা আর্জেনটিনার কাছে ২০ গোল খেলেও নয়। সেটা আমাদের খেলা, আমাদের অতীত, আমাদের যাপন,  আমাদের রাজনীতির সঙ্গতে গড়ে ওঠা।  সেটা ফুটবল হলেও বিশ্বকাপ-এ যে খেলাটি হয়, সেটা নয়।
একান্তই আমাদের একটি খেলা। আমাদের ব্রাজিল, আমাদের আর্জেনটিনা একান্তই আমাদেরই।  কোন ব্রেজিলবাসী বা আর্জেনটিনাবাসী তাকে চেনে না।

ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মোহমডান, আবাহনী  – এই নামগুলি যে স্রেফ দল নয়, বরং ভিন্ন-ভিন্ন গোষ্ঠিচেতনার প্রকাশ, তার আভাস এখুনো খেলার মাঠে গিয়ে দর্শকাসনে কান পাতলে একটু একটু পাওয়া যায়। আজকে অতি ক্ষীণ হয়ে আসা এই গোষ্ঠিচেতনায় কুমোরটুলি, উয়ারী, রাজস্থান, এরিয়ান, টালিগঞ্জ অগ্রগামী স্রেফ ফুটবল দল মাত্র থাকে না , আমাদের সমাজজীবনের নানা খন্ডচিত্রের, শহর কলকাতার মধ্যে থাকা মানুষের আত্মচেতনার দলিল হয়ে থাকে। জাত-ধর্ম-জাতি-ভূগোল-ধন-অতীতের মত  আরো নানা পরিচয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গোষ্ঠী ও তাদের একান্ত ক্ষোভ-গর্ব-অভিমান ও এমন শত আবেগ-কে দিয়ে তৈরী বাংলাদেশের যে সমাজ চেতনা, ফুটবল তার এক প্রকাশ মাত্র। সমাজের
অভ্যন্তরের সংলাপ সেটি। তাই ব্রেজিল-কে লুঙ্গী পরে, আর্জেন্টিনা-কে সায়া পরে বাংলাদেশের সেই অন্দরমহলে ঢুকতে হত বহুকাল।  শত শত বার্সিলোনা-মেদ্রিদ-মিউনিখ-ম্যানচেস্টারের মিলেও অন্দরমহলের সে খেলা খেলতে পারবে না। স্পেনীয়দের নিজেদের দেশে কিন্তু বার্সিলোনা-মেদ্রিদ এমন-ই নিজস্ব আত্মচেতনার অংশ। কিছু খেলা, কিছু বোধ, কিছু মনোভাব, কিছু বিশ্বদর্শন একদম নিজেদের, একদম আসল জিনিস, একটুও বিনিময়যোগ্য নয়।  এই আসলটার একটা কার্টুন রূপ যে বিক্রয়যোগ্য, তা বিশ্ব-ব্যাপী খোলা বাজারের
ব্যাপারীরা বুঝে গেছে বেশ কিছুকাল । আজকের ব্রেজিল দল গড়ে ওঠে য়ুরোপের ভিন্ন ভিন্ন শহরের, জেলার, গঞ্জের আত্মচেতনার প্রকাশের নিশানী দলগুলির হয়ে ভাড়া খাটনেওয়ালাদের দিয়ে। ব্রেজিল ও বার্সিলোনা , দুই স্থানীয় মধ্যে যোগসূত্র বিশ্ব ফুটবল বাজারের কিছু পরিযায়ী পণ্য।

শ্বেতাঙ্গ থেকে শেখা খেলাকে আমরা নিজেদের করে নিয়েছিলাম – বিলেতের ফুটবল এসোসিয়েশন যে খেলার ঠিকাদার, তার সাথে আমাদের খেলার মিল বাহ্যিক। শ্বেতাঙ্গের তালে তালে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়ে উঠতে আমরা আমাদের অন্দরের খেলাটির দিকে মৃত্যুবাণ ছুড়েছি। বিকিনি মডেল, চোলাই কোম্পানি আর মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল যখন তলে তলে এক দল হয়ে যায়ে , শেষের শুরু তখুনি। যে মৃত্যু গোষ্ঠ পালের বিষ্ঠাপুর্ণ মূর্তিতে মাল্যদান করে ঠেকানো যায়ে না। তাই অন্দরমহলে আনাগোনা লিভারপুল-ম্যানচেষ্টার-চেলসি দলের
নামধারী পণ্যগুলির। সদর দরজা এখন হাট করে খোলা। উঠোনের জাম গাছটির শিকড় আলগা হয়ে এসছে। এমনকি বট গাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে – ৬ কাঠা জমিতে উঠেছে
যে বহুতল, তাকেই জায়গা করে দিতে। মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন নবসমাজের বিচ্ছিন্নতা একে অপরের সঙ্গে।  সামূহিক আত্মপরিচয় নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার পথে বিশাল কাঁটা, এবং বেশ ‘ব্যাকডেটেড’ ও বটে।  তাই নবসমাজের আভ্যন্তরীন সংলাপ নাই, সমাজ থেকে উঠে আসা খেলার দরকার নাই, আমদানি করা মাল প্যাকেট শুদ্ধ গিলে ফেলার মধ্যেই মুক্তি।  ব্যাক্তিমুক্তি।

সমাজ থেকে উঠে আসা বলেই বিভিন্ন স্তরে যে ফুটবল খেলা হয় নিখিল বাংলাদেশে। অন্ত্যজের ক্ষমতায়নের সাথে তাল মিলিয়েই উচু-জাতের মৌরসীপাট্টা নয় আর ফুটবল। তাই দেশীয় এলিটের দেশীয় ফুটবল এমনিতেও দৃষ্টিকটু লাগবে। যে কারণে দৃষ্টিকটু লাগে না টলিউড বা বলিউডের প্রধান অভিনেতা-অভিনেত্রী-কলাকুশলী -নির্দেশক-প্রযোজকদের মধ্যে উচু জাতের, রয়িস খান্দানের মানুষের প্রায় একাধিপত্য।  সংবেদনশীল ফিলিমপ্রেমীরা তা দেখতে যান, প্রশংসা করেন, খারাপ বলেন। হলিউডিও-য়ুরোপীয় তুলনা দ্যান। এও এক
ধরনের সমাজের আভ্যন্তরীন সংলাপ।  তবে সে সমাজের পা কি মাটিতে ? সে সমাজের স্বপ্ন কি নিজের না আমদানি করা? সেই সমাজের লিভারপুল প্রেমের মধ্যে নিজের
পারিপার্শিক সমাজকে ঘেন্নার একটু গন্ধ কি নেই ?

কোনো কিছুই বিনামূল্যে হয় না।  কোনো না কোনো ভাবে মূল্য চোকাতে হয়। যখন চেতলায়ে কেউ হয়ে ওঠেন চেলসির ভক্ত, মল্লিকবাজারের কোনো বহুতলীয় তরুণের স্বপ্নে দেখা দেয় ম্যানচেষ্টার, তখন আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত আলগা হয়। অতীত ও সমাজ, দুই হতেই বিচ্ছিন্ন বাঙ্গালীকে তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণমৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করলে শুনতে পাবো ইহুদী, জিপসী ও অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠির নাম। ১৯৪৩-এ  ব্রিটিশ শাসক ও তার দেশীয় তাবেদারদের ষড়যন্ত্রে যে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছিল নিখিল বাংলাদেশে, মৃত শ্বেতাঙ্গদের সাথে তারা একাসনে জায়গা পায়না।  কল্পনা ও আত্মপরিচয় যখন সমাজ-বিচ্ছিন্ন, তখন সে নরসংহারের চিত্র উত্তরপুরুষদের জন্য রেখে গিয়েছেন যে  জয়নুল আবেদীন বা চিত্তপ্রসাদ, তাদের নাম যে চেলসির ভক্ত জানে না, তা কি খুব আশ্চর্যের? উত্তর-মনমোহন কলকাতা তথা বাংলায়ে সমানে চলেছে জাম গাছের শিকড় উপড়ে কিউই ফ্রুট খেতে শেখার গল্প। বিশ্বায়িত হওয়া মানে শ্বেতাঙ্গ মানুষের আত্মপরিচয়ের সাথে হাইফেন দ্বারা যুক্ত হওয়া। এটলেটিকো মাদ্রিদ ‘কলকাতা’কে নিলামে কিনে বানায়ে ‘এটলেটিকো ডি
কলকাতা’।  কালা মানুষে ধন্য হয়।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Colony, Dhaka, Elite, Kolkata

The Goonda first came for the Assamese / Gunday on the loose / The Bollywood Gunday threat against Assam and Bengal

[ Daily News and Analysis, 4 Mar 2014 ; Dhaka Tribune, 5 Mar 2014 ; Echo of India, 11 Mar 2014 ]

People in the Bengals use the word ‘Goonda’ quite liberally – to refer to anything between a naughty child to the local political thug. But in the eyes of law, who is a Goonda? One of its many legal definitions is to be found in the Control of Disorderly and Dangerous Persons (Goondas) Act (East Bengal Act IV of 1954). There is goonda is someone ‘involved in affray, rowdyism or acts of intimidation or violence in any place private or public so as to cause alarm to the people living or frequenting the neighbourhood’. According to the Uttar Pradesh Control of Goondas Act (U.P. Act No. 8 of 1971, amended by U.P. Act No. 1 of 1985), it is ‘generally reputed to be a person who is desperate and dangerous to the community’. But if film and artist communities in Assam and West Bengal have been protesting mischief and many young people in the People’s Republic of Bangladesh are disgusted at the false and mischievous retelling of its Liberation struggle, then the source of mischief can safely be called a Goonda, at least rhetorically if not legally. When there is more than one such public enemy, in Hindi they are called Gunday. Gunday are backed by deep-pockets whose ulterior projects are more extensive than the specific acts of mischief. More often than not, the Gunday of the real-world are mercenaries for other people’s projects, even part of broader, more sinister projects of which the employed Gunday may not be even aware of. The Gunday are as important as the people who dictate what Gunday does, how they do it, when they do it.

In the reel-world, ‘Gunday’ is a project of Yash Raj Films, a Bollywood centric entertainment behemoth. It is one of greatest flag-bearer of Bollywood Hindi films, that grandest by-product of ‘Indianness’. Some perverse people like me feel that the relationship is inverse – that ‘Indianness’ is a byproduct of Bollywood Hindi films, among other things. It is the thread that connects the browns to browns, with the punitive sedition laws at hand just in case some folks didn’t get the point. Whatever be the tall ‘diversity’ claims of the Indian Union, the cultural landscape after partition has a couple of winners (English being one) and a large set of losers. In the Indian Union, we all know that cultural and political clout of which language has expanded after partition, so much so that not knowing it is seen as a sign of being politically and culturally queer. This advancement comes with the retreat of Marathi, Kannada, Bengali, Assamese, etc. as playgrounds of cultural imagination and virtual annihilation of fecund tongues like Maithili, Awadhi, Brajbhasha, etc. It is not accidental that the most successful film industry is of the same language that receives the maximum preferential subsidy for its advancement. The subsidy to English in poor brown-land is a scandal of another scale altogether.

Let me not beat about the bush and come to the point. Gunday is a Bollywood Hindi film. For West Bengal, it was dubbed in Bengali. This make one, get many formula by dubbing into other tongues makes economic sense for the producer. But that also opens the flood-gates for this trend. The film and cultural community in West Bengal has protested against this. If using their mighty economic muscle, Bollywood producers can brow-beat distribution networks and cinema halls into showing such dubbed material, this will be an economic bonanza for Bollywood. Much black money will find greater returns but fledling non-Hindi film industries will fail ruin as they cannot outcompete Bollywood in black money, film volume and the cinema-hall blackmailing strength that comes with it. This desperate aggression was in full display in Assam where Rajni Basumatary’s Assamese film ‘Raag’ which was running quite well was removed by economic goondaism to make way for Gunday. Not too many films are produced in Assamese and when a good one is made with help from the Assam Film Development Corporation, this is the fate. Cultural diversity, even cultural competition, can only flourish in a level economic playing field. No amount of bleating about ‘unity in diversity’ changes that basic fact.

Let me describe a scenario. Dubbing my story and then forcing it down your throat using my economic muscle will slowly silence you. You wont be able to tell your own stories. You will have to adapt my stories. It does not matter if you have a long tradition of telling stories. Soon you may even develop an aesthetic sense for my stories, get alienated from your stories, from your people, look at them with curious eyes of an outsider. In short, I will destroy you cultural roots, replace them with mine and you will finally clap along the way. If that does not make me a Goonda, I don’t know what does.

The acts of some gansters have international manifestations. Gunday has chosen to parrot the official Delhi fiction of Bangladesh being a product of a brief Indo-Pak war. The people of that independent nation did not take that lying down. The producers have apologized. The Assamese can dream on. Pakistan has sought to protect its film industry by trying to restrict ‘Indian’ (read Bollywood) films. The states of the Indian Union have no such power, just like they do not have the power to protest the huge subsidy and preference given to one desi language. Apparently, this language ‘unites’. We know how this unidirectional unity works. No Assamese film will be dubbed in Hindi and released to multiplex audiences in Delhi and Mumbai. Not in this nation state. If slow but sure annihilation of certain cultures is a pre-condition to some kind of a ‘national integration’ project, then that nation is an enemy of those cultures. It is up to the Indian Union to decide what integration project it wants to promote – a predatory one or a harmonious one. It is up to you, the viewer, to ask whether your film ticket is filling a goonda’s pocket.

 

 

1 Comment

Filed under Bengal, Culture, Delhi Durbar, Dhaka, Hindustan, Kolkata, Language, Nation, Pakistan

Why Pakistan’s resistance to Bollywood is justified

[ The Express Tribune, 24 Dec 2013 ]

The case in Pakistan regarding the continued certification and commercial screening of films produced in the Indian Union territory has been settled. Mubashir Lucman, Film Producers Association and Cinema Owners Association have come to an agreement that would allow for the equal sharing of screening time between films made locally and those imported from the Union of India. This is a useful opportunity to discuss some issues regarding the commercial import and certification of Bollywood Hindi films in Pakistan.

Let us first understand what are these ‘Indian’ films. We are largely talking of films made in the Hindi language produced via a very cash rich industry setting in Mumbai. For the rootless young people in certain metros of the Indian Union, that is much of what constitutes ‘Indian’ films. But for those who are talking in terms of greater mutual understanding via these films, one needs to realize that much of the Indian Union does not speak Hindi. Additionally, they do produce their own films. The content of such non-Hindi films represent a much greater terrain of the subcontinent than Bollywood Hindi flicks can ever aspire to. To be fair, Bollywood Hindi films never did aspire to that. Thank the gods for that, as with the money power behind Bollywood Hindi films, they might even try to define Tamil-ness or Bengali-ness through a metro-centric Hindi medium. Are they influencing people in Pakistan with an alien commercially produced idiom? If yes, people in Pakistan better take notice.

And those who portray films as some sort of a medium to develop Indo-Pak bonhomie might also do well to look beyond Bollywood. Virulently anti-Pakistan films with a lot of ‘action’ are also a Bollywood Hindi film sub-genre. Yes, that does good business. Go find an Assamese, Bengali, Tamil, Manipuri or a Oriya film in the last fifteen years that has an anti-Pakistan theme. There are none. Are these not ‘Indian’ films? What is it about Bollywood Hindi film idiom that lends itself to making films like Gadar: Ek Prem Katha and LOC Kargil, which unabashedly dehumanize people from Pakistan? The economic muscle of Bollywood ensures that such films receive a wide audience. It is not the specific film that matters. Pakistan can choose to not allow this film or that. But it is the same set of cartels that produce most of the films – the ones that are anti-Pakistan and the ones that are unrelated. This industry understands only money and would not stop from producing the next commercially lucrative anti-Pakistan blockbuster? There is a market for such prejudice in India just like there is a market for anti-Hindu prejudice in Pakistan. Do people from Lahore and Karachi really need to add to the profits of an industry that sees no qualms in showing Pakistanis in bad light?

Most Bollywood Hindi films are set in the cities of Mumbai or New Delhi, and increasingly in cities of the Western World where people from North India live and aspire to flourish. This can be Sydney, London, New York or Chicago (Dhoom 3, an action film released a few days ago and which has already grossed crores of Rupees, is set largely in Chicago). Delhi and Mumbai choses to tell its story and wants people to pay for it. But Karachi is not Delhi and I am sure it has its own stories to tell, stories that are different from the stories of young partying explorers of Mumbai and Goa, stories that are not about aspirational or ‘everyday’ life of Delhi people. Inspite of the Zia years, one can be sure that 15 crore people have stories to tell. If the decision was left to the burgers, they might even start a juloos in support of Hollywood and Bollywood. The culturally illiterate has no investment in their own cultural milieu. That is precisely why their ‘tastes’ shouldn’t be setting agendas. Nor can they be depended on for a revitalization of films culturally rooted in Pakistan (and not cheap Bollywood remakes).

Bollywood Hindi films represent the metro-centric and homogenized ‘idea of India’ in the mind of the new Indians – 20-40 years old, in the top 5% income category, aspirational migrants with Hindi and English being their near exclusive vocabulary. They are concentrated in a few cities but they have the economic might to determine cultural policy. These multiplex consumers with their moneybags have done a great assault to the idea of mass-films, which is why now film profits are not an indication of film popularity. Pakistani film industry is up against an economic behemoth with an agenda of own-cultural expansion. Its production, distribution and broadcasting machines are well oiled. Stupendous amounts of black money from deep pockets bankroll the ‘creative’ explosion that is Bollywood.

The twin attack of a homogenizing national ideology and economic muscle has grave implications on visible public culture. The 19th Kolkata International Film Festival witnessed the extra-ordinary scene of Bollywood Hindi filmstars being feted in a manner as though they represented some pinnacle of human achievement. It was a sad moment – underlining how limited and predictable the cultural horizon of West Bengal’s film industry had become. The lack of self-confidence showed. Film industries that do not have as much black money circulating, have lesser number of casting couches, have lesser number of ageing ‘artists’ and producers targeting young actresses, have lesser number of big crooks financing films and which do not make films in Hindi or India-English, have been relegated to second and third class status. Pakistan has the legal mechanisms to stop the damage that Bollywood has done to films industries elsewhere. It better act soon.

Leave a comment

Filed under Culture, Delhi Durbar, Identity, Kolkata, Language, Pakistan

Battling religious censorship / Muzzling Expression of Taslima Nasreen

[ Outlook, 23 Dec 2013 ; Echo of India, 29 Dec 2013 ]

Kolkata, the so-called ‘cultural capital’, has demonstrated the increasing emptiness of the epithet, yet again. Taslima Nasreen, one of the most famous Bengali authors alive, had scripted a TV serial named ‘Doohshahobash’ ( Difficult cohabitaions) portraying 3 sisters and their lives – standing up to kinds of unjust behaviour that are everyday realities for the lives of women in the subcontinent. Nasreen has long lent a powerful voice to some of the most private oppressions that women face, often silently. The private channel where the serial was slotted ran a vigorous and visible advertising campaign – Nasreen’s name still has serious pull among Bengalis and the channel knew it. Nasreen had made it clear that the serial had nothing to do with religion.  However that was not enough for the self-appointed ‘leaders’ of the Muslims of West Bengal who issued warnings to the effect that the serial not be aired. The commencement of the serial, sure to be a hit and a commercial success for the channel, has now been postponed indefinitely. One can imagine the pressure the producers and broadcasters have faced that led to the shelving of a potential runaway commercial success. As in the recent incident of Salman Rushdie being prevented from coming to Kolkata due to the protest by similar characters, one can be sure of the kind of role the Trinamool Congress government and its law enforcement agencies had in this affair. If the government is to be believed, it had no role in the criminal farce that is being played out unchecked. Muzzling free speech and right to expression does not always need written orders from the government. A phone call here, a verbal order there – these are typically enough.

Nasreen has been living in New Delhi since 2007, after being hounded out of Kolkata by the CPI(M) led government on the instigation of Muslim groups threatening ‘unrest’. The pathetic reality of the lives of ordinary women in the subcontinent and the extraordinary oppression meted out to them, especially due to certain religious systems, have been the single most important theme of her writing. Steeped broadly and deeply in the cultural fabric of Bengal, the specific socio-geographical setting of much of her work is in the Muslim-majority nation-state of Bangladesh. Hence, in her earlier writings, Islam primarily represented the ugly face of religious majoritarianism. However, those who have cared to read her corpus, know very well that she has been an equal-opportunity truth-teller, castigating both Hindu and Muslim religious practices and ideologies.

Taslima Nasreen is a daughter of the subcontinent. Islamists in Bangladesh wanted her head and made life miserable for her. After a few years in the West, she returned to West Bengal. I say ‘returned’ as it was an inalienable part of her cultural homeland. In Kolkata too, she lived in the face of constant death-threats there too. After her forcible ejection from Kolkata, she has never been allowed back, though she remains extremely interested in relocating back. One would think that the culture of issuing death-threats to one feels one’s religion has been slighted by is alien to Bengal – which has, for centuries, been the ground Zero of religious syncretism as well as tolerance to so-called deviants of all hues. It is indeed sad that this alien culture of extremism of relatively recent import has managed to gain the upper-hand so as to force the government of the day to pander to these elements at huge cost to the social and cultural fabric of West Bengal.

Who exactly are these vocal opposers of Taslima Nasreen’s serial being shown publicly? Whenever one has self-appointed spokespersons doing the shrillest speaking, it is useful to study their antecedents. Abdul Aziz of Milli Ittehad Parishad and Mohammad Quamruzzaman of the All Bengal Minority Youth Federation are two prime examples who have been extraordinarily active in running the Taslima-denounication industry in West Bengal. Both these organizations share another distinction. They led a mass-meeting earlier this year in Kolkata protesting the punishment of Islamist leaders of Bangladesh who had directly committed crimes against humanity during the 1971 Bangladesh Liberation War.  Thus those who defended rapists and mass murderers of 1971 (the victims were Bengalis, of whom a significant proportion were Muslims) have taken upon the mantle of community guardianship of Muslims in West Bengal. It cannot be clearer what kind of Muslim interest these folks represent. To even consider that such elements represent Muslim interests of West Bengal is tantamount to insulting the intelligence and humanity of the Mohammedans of the state.

Kolkata’s intelligentsia and youth, once known to take to the streets and chant songs to protest the muzzling of Paul Robeson, a black-American singer and artist, has had nothing but silence to offer on this one. The Trinamool Congress rulers and the erstwhile CPI(M) rulers have set a record of competing with each other on muzzling free speech on the instigation of groups in whose worldview, free speech has no place. While there may be short-term electoral gain for such posturing, this race to the bottom has no winners. The loser is the idea of a free and democratic society where dialogue and understanding is privileged over violence to ‘solve’ differences. In effect, such groups aspire for a society where there are no differences – no diversity of thought, expression, living and being. Nothing is more alien to the human condition than that. Gods only can help a society where governmental policy is dictated by sociopaths, unless a critical mass stands up to publicly state that enough is enough. Does the right to be offended take precedence over the right to free speech? If yes, we are in sad and dark times.

When insulting books, gods and other creatures has become the touchstone of ‘community leadership’, one might do well to remember the words of Kaji Nazrul Islam, the fiery poet of all of Bengal who is increasingly being packaged into a ‘Muslim’ poet – ‘Manush enechhe grontho, grontho aneni manush kono’ (Man has produced books, no book has ever produced a man). There is nothing truer than man himself and free speech is an pre-condition for that truth to shine forth, in its myriad hues.

Leave a comment

Filed under Bengal, Culture, Kolkata, Religion, Rights, The written word

Death of a general / The unconquered General Giap

[ Daily News and Analysis, 12 Oct 2013 ; New Age (Dhaka), 24 Oct 2013 ]

‘Amar nam, tomar naam,

Vietnam, Vietnam’

(Your name, my name, Vietnam, Vietnam)

–       a popular slogan in West Bengal expressing solidarity with the Vietnemse people during the US-led military operations against Vietnam in the 60s and the 70s.

General Vo Nguyen Giap, the brilliant chief of the Vietnamese forces who gave the French, till-then the hardest kick in their back from a colonized people, died on 4th October. The development of civilizational and philosophical finesse in the form of Michelin stars, ‘fine’ dining, schools of politics and philosophy, experimental art and delicate wines have long been subsidized by the blood and tears of non-White people. So General Giap and his Vietnamese guerrillas surely left a bad, non-fruity after taste in the French palate. The French were thoroughly defeated at Dien Bien Phu. They surrendered to the Vietnamese. We had won.

For the subcontinent, whose ‘liberation’ from colonial rule did not involve surrender of the colonizers naturally did not involve liberation from the institutions that suppressed rebellions, beat up and tortured political workers, certain national liberation struggles of South-East Asia may seem from a different world. Indeed, it was a different world, where the native-staffed army and police that swore undying allegiance to some European power, did not automatically become the army of police of ‘independent’ nation-states. In the subcontinent, armed group of men in uniform loyal to the British crown, turned desi patriots overnight, with rank, pay and pension protected. Thus, it should not come as a surprise that the Indian Union’s Indian Army has conducted extensive aerial bombing of its own citizens in Mizoram and armed-uniformed wings of the state are the organizations accused of the largest number of rapes, again, of its own citizens. Its twin born out of the same transfer of power, the Pakistan Army has aerial bombed its own citizens in Balochistan for years. For a subcontinent, which has been taught to mix up transfer of power (and institutions) with national liberation, Vietnam would have showed them what the real thing looks like.

The Vietnamese victory at Dien Bien Phu shook the world. For those uninfected by the ‘White-awe’ syndrome, like Malcolm X, the meaning of this victory was clear who used this for his own political preaching. ‘White man can’t fight a guerilla warfare. Guerilla action takes heart, takes nerve, and he doesn’t have that. He’s brave when he’s got tanks. He’s brave when he’s got planes. He’s brave when he’s got bombs. He’s brave when he’s got a whole lot of company along with him, but you take that little man from Africa and Asia, turn him loose in the woods with a blade. That’s all he needs. All he needs is a blade. And when the sun goes down and it’s dark, it’s even-steven.’

There was a time when the 1905 Japanese naval victory over the Russians broadened the chest of many a brown people. There was a time when a significant number of middle-class brown people too considered themselves Asians. The idea of Asia and Asian-ness is long-gone from the subcontinent. The great-grand children of such brown Asians have their mindscapes dominated by video games and films and shows, with white winners, white saviours, white sexiness, white ruggedness, white determination, white failings, white sacrifices, white sadness and a million other minute shades of white-human personhood. To this generation, the Asian is a term for folks with ‘slit eyes’ – such is the pernicious grip of whiteness on bankrupt minds. Part of the reason that the subcontinent is saddled with false gods and extreme alienation is that we never had our own General Giap. Which is why, when this towering personality breathed his last, we did not know that we had lost our very own. The Vietnamese got a national liberation army. We got folks who pride themselves on being patted on the back for killing colored people, at home and in faraway land, for the British monarch.

My own city, Kolkata, had a special connection with General Giap and Vietnam. Even before partition, the students of Kolkata observed Vietnam Day in January 1947 in solidarity with the Vietnamese anti-colonial struggle. The brown British police killed 2 protesting students. The same police would be designated loyal enforcers of law in about 8 months time. General Giap visited the city more than once and then, as a school student, I had the good fortune of seeing him with my own eyes. Thousands had assembled to catch a glimpse of him that day. I feel it is not unrelated that removing slums is still the hardest in that metropolis. Many browns have a peculiar interest in the twists and turns of the World Wars. That the chivalrous white man dropped more bombs in Vietnam to crush them than they dropped in each other in Europe during the Second World war is one of those details that do not break into brown consciousness due to the ideological predilections we have to due other kinds of story-telling that we have become specifically atuned to, as an enslaved people. We know about white successes and white failings, white truths and white fictions, but that’s about it. In our enslaved heads, we can love or critique Rambo and other ‘world’-saving White creatures, real and imagined, but many coloured people were saved for the likes of General Giaps, big and small. Let us expand our heads to accommodate our heroes.

 

Leave a comment

Filed under Bengal, Colony, History, Kolkata, Memory, Nation, Obituary, Sahib

Paying the price for a gory ideology of hostage theory / Vague vengeance driving terror / Vague vengeance and Pakistan church blast

[ Daily News and Analysis, 1 Oct 2013; Millenium Post, 7 Oct 2013; Shillong Times, 7 Oct 2013; Echo of India, 9 Oct 2013 ]

“Ekbar matir dike takao,

 Ekbar manusher dike”

 (Once, take a look at the ground beneath your feet. Then, look at human beings)

 –  Birendra Chattopadhyay, Bengali poet (1920-1985)

 

In the most murderous attack on what is left of the ever-terrorized Christian population in Pakistan, Islamic terrorists have killed at least 85 worshippers at the All Saints Church in Peshawar on September 22nd. Inspired suicide bombers were the weapon of choice to target the Christian congregation. The death count is still rising, as more people succumb to their injuries in the hospitals. Outright murder represents the sharpest edge of what Christian and other ‘constitutionally’ non-Muslim people endure in Pakistan. Their daily life in a nation-state that officially considers them unequal in various ways to official Muslims is not pretty. Usurpation of property, blasphemy charges, attacks and destruction of places of worship, rape and subsequent forced conversion (or the reverse order) of womenfolk form the visible tip of a much broader systemic antagonism.

Thankfully, the minorities are not completely friendless in Pakistan. At huge personal risk, people like IA Rahman, Asma Jehangir, Abid Hasan Minto and many others have been standing in solidarity with religious minorities of Pakistan, protesting on the streets, for decades together. The threat to their lives is real, as was shown by the brutal murder of Salman Taseer, governor of West Punjab, and someone who had expressed solidarity with a Christian woman, Aasia Bibi, phonily charged with blasphemy against Islam and given a death sentence. The recent anti-Christian massacre has brought the predictable protestors to the streets – human rights activists, left activists and the Christian community itself. But in addition to this, a somewhat broader segment also has protested. These groups have demanded that there be no dialogue or negotiations with Islamic terrorists behind this attack.

While shunning dialogue, the society in Pakistan may do well to initiate a broader dialogue. Directed not at the clearly-defined demons like the Taliban, this dialogue may point to a broader disease that emanates uncomfortably from the holy-cows of that nation-state. Only the society-at-large can initiate such a dialogue that explores the contours and content of inherited socio-political ideology, things that take a providential status as foundation-myths of any nation-state. Should one take a closer look at holy cows and foundation myths to diagnose the disease?

Jundallah, the Islamic terrorist group that claimed responsibility for the Peshawar massacre, laid out in no uncertain terms how it justifies the attack. ‘‘All non-Muslims in Pakistan are our target, and they will remain our target as long as America fails to stop drone strikes in our country.’’ So, non-Muslims in Pakistan are, in their understanding, more America’s than Pakistan’s and if America cared enough for its ‘own’ in Pakistan, it had better stop doing things to Muslims in Pakistan. This equation of America = Christian = some hapless Suleiman Masih in Peshawar has widespread appeal, not only for its simplicity, but also for its antiquity. For those who have a somewhat longer memory, the subcontinent has known this for some time – most famously as the pernicious ‘hostage’ theory.

The ‘hostage’ theory has been around for some time. This was enunciated most explicitly by Mohammad-Ali Jinnahbhai, the quaid of the All India Muslim League, as a macabre formula for peace. By this notion, the safety of religious ‘minorities’ in the then still-to-be-born Pakistan and India would be ensured by the fact that the majority community A wont attack minority community B, because in other places, community A is a minority where B is the majority, and hence vulnerable to ‘retributive’ counterattack. Hence, it would ensured (or so it was thought) that violence would not happen locally, as communities that imagine themselves non-locally, would see that this could go tit for tat for ‘themselves’ elsewhere. A minority then is a hostage of the majority. If there are two hostage takers, peace will be ensured. Rather then hostage-driven peace, the subcontinent has witnessed many instances of what can be called retaliatory hostage torture. The massacre of Hindus in Noakhali on Kojagori Lakshmi puja day, the massacre of Muslims at Garhmukteshwar, the reciprocal train-massacres crossing the Radcliffe border of the Punjab, the massacres in Dhaka and Barisal – the list goes on. The list shows that hostage torture enjoyed a broad currency. The Muslim League was simply brazen enough to state it as such. Other groups also used it to their advantage to the hilt.

A tacit acknowledgement of the ‘hostage’ status of minorities was the basis of the Nehru-Liaquat pact – to protect the minorities in West Bengal and East Bengal. The hostage theory lives on when the Babri mosque demolition causes hundreds of temples to be destroyed in the Peoples Republic of Bangladesh. This is why a Hindu there is more India’s than theirs – sort of an unreasonable remnant that ideally shouldn’t have been there. The hostage theory is an ideology of the book and not of the soil. The question of a human’s belonging, in that heartless scheme of things, is not with the soil beneath his ground, but with someone faraway bound by similar ideology. This binds people from disparate soils similarly, and divides people from the same soil. The modern dominance of universalist, extra-local ideologies of community definition, as opposed to the local and the ecological, has taken a very heavy toll on humanity. Peshawar shows that the ideology of the hostage theory is alive and well in the subcontinent. Jundallah is its bloody edge. The softer margins include a very many among us.

Leave a comment

Filed under Bengal, Dhaka, Foundational myths, Identity, India, Kolkata, Our underbellies, Pakistan, Partition, Religion, Scars, Terror, Under the skin

Cities that are easy on the eye / Swanky dreams and apartheid by other means

[ Daily News and Analysis, 30 Apr 2013 ]

Flights connecting the gulf-countries with Mumbai, Kolkata, Delhi, Cochin and other cities form a large portion of the international air-traffic between them. I have been in these flights a few times. Many of the travelers are labourers coming back to their families for a vacation after being away for months, sometimes years. Because they form a large part of the air-traffic, they also provide a large part of the airport revenue. Very few of the labourers I have interacted with can read English fluently, if at all . That most if not all of the airport, its nook and crannies, only make complete sense only to an English literate person, makes one wonder which ‘public’ did the planners have in mind when designing this public utility space. The unwashed masses and their squat latrines have no place here. The architectural language of these places conform to a ‘global’ idiom, however alien that may be to most desis. Airports and sites such as these are so-called ‘gateways’ of a place that would ideally exude an up-market, ‘international’ look – never mind that non-English literates form a significant part of the market. Such places are the product of a certain imagination – that conceive places like air-ports not only as places where people catch air-planes but also where a certain kind of people should ideally be able to enter. It is also symptomatic of nationalist anxieties – of being ‘up to standard’ to the west, so that the occasional gora who steps in should not feel confused in the least. Some of us browns know English anyways and empathize deeply with that discomfort. For the rest of the brown, frankly, who cares? They walk about hesitantly in the mirror chamber of its alien interiors. There is an invisible wall and often thinly veiled disgust in the face of coconut (brown outside, white inside) desis. This invisible wall has an invisible sign hanging on it which says ‘Unwelcome’ or ‘Unfit to be the kind of Indian that South Bombay is proud of’. What am I talking about is not about airports, signage or English – the disease is deeper and more serious.

There is something deeply troubling about the nature of our imagination of the city, including the idea of urban citizenship, who is included in that imagination, who is not, who is the city for. And how ”we’ appear to the West captures an inordinately large part of those concerns. City elites are obsessed in proving that they are tropic-burnt brothers of goras – and they wish that the tropic-burnt others, whose land and labour pay for such obsessions, ideally should vanish. Given that this is not an ideal world, splendid use has been made of their control over the bureaucracy and policy circles, to make others vanish, if not from the city, but at least out of sight. It is a hard task to make a city of their wish – a city easy on their eyes – but they do try.

During the commonwealth games, that ill-fated coming-of-age ritual of a diseased and demented nation-state with ‘super-power’ fantasies, its capital city was ‘beautified’. Among other things, it involved ‘garib hatao’. Thus the urban poor were kicked out and judicial officers moved around in police vans to sentence beggars. The normally slow judiciary knows where its priorities lie. If that were not enough, large sheets have been put up in many areas of Delhi, especially near bridges, to block out ‘unsightly’ (read poor people’s) areas so that the upwardly mobile residents and visitors can enjoy a virtual-reality show on its roads. The soul of this wall is made out of the same material that the invisible wall of the airport is made up of. The T3 airport terminal does not allow legally licensed auto-rickshaws to come near it lest phoren visitors have a ‘good impression’. In Kolkata, bicycles have been banned from plying in most of its main streets. Hand-pulled rickshaws are being pushed out.They say it is ‘inhuman’ and heart-wrenching, as if loss of employment is heart-warming.  Beyond the Indian Union, residents of Baridhara, one of the elite areas of Dhaka, have banned cycle-rikshaw-wallas who were the lungi. Shame about one’s people and feeling alienated from one’s broader environ is a nasty disease that afflicts whole of the subcontinent.

The dream of being counted as a part of the global cosmopolitan class has led to the blatant exclusion of people from public spaces who do not ‘fit the bill’. This forcible homogeneity of being ‘cool’ and ‘international’ finds its twin in the Hindi-ization of various subcontinental identities – in the name of being ‘traditional’ and ‘swadeshi’. Thus emerges the new desi – Bollywood loving, English speaking, having wholesome family fun eating McAloo Tikki. In many ways, the gated community, that pinnacle of contemporary desi urban aspirations, is a concrete form of this dystopic vision. It is safe inside, we are surrounded by people like us, we talk in English and Hindi and cheer for European football leagues There is a word that sums of all this that may sound quite bitter and might hurt those with ‘liberal’ and ‘inclusive’ sensibilities. It is called apartheid.

Leave a comment

Filed under Class, Elite, India, Kolkata, Language, Our underbellies, The perfumed ones, Under the skin, Urbanity

Bad moon rising / A dangerous connivance /

[ The Hindu, 6 Apr 2013 ; The Friday Times (Lahore), April 19-25, 2013 – Vol. XXV, No. 10 ; Kashmir Monitor, 25 Apr 2013 ; Himalayan Mirror (Gangtok), 12 Apr 2013 ; Himalayan Mail (Jammu), 7 Apr 2013; South Asia Citizen’s Web, 23 Apr 2013 ]

Many in West Bengal are looking to the Shahbag protests in Dhaka with a lot of hope and solidarity – as an important and necessary step that would usher in a rollback of the creeping communalism that has afflicted the People’s Republic of Bangladesh since 1975. 1971 is still fresh in the mind of many Bengalees from the West, when a massive relief and solidarity effort was under taken on that side of the border to reach out to a large mass of humanity trying to escape a situation that has been described variously – from ‘civil war’ to ‘genocide’. The then leaders of the Jamaat-e-Islami in East Bengal and its students wing organized murder and rape squads, at times in collaboration with the armed forces. The specific crimes include mass-murder, rape as a weapon of war, arson and forced conversions. They escaped prosecution due to the by generals who used them to cast an Islamic veneer of legitimacy over their illegal capture of power. They were gradually rehabilitated until the present Awami League led government came to power – whose manifesto among other things, promised the trial of war criminals. Thus started the proceedings against them in the War Crimes tribunal. The Shahbag protests have demanded maximum punishment for the guilty.

In West Bengal, a few meetings and assemblies have happened around Shahbag. However, to the shock and dismay of many, the largest of these assemblies was a massive rally held in central Kolkata’s Shahid Minar on 30th March, explicitly against the Shahbag protests and in support of the war criminals convicted by the tribunal. Various Muslim groups including the All India Milli Council, All Bengal Minority Youth Federation, West Bengal Sunnat Al Jamat Committee, Association of Protection of Civil Rights, Milli Ittehad Parishad, West Bengal Madrasa Students Union, Ashikane Rasul Committee, All India Minority Association, All Bengla Muslim Think Tank, All India Muslim Majlish E Mushawarat, Aminia Jamiat E Muttakin Committee, Ulama Parishad, Magribi Bangla Anzumane Wayejin, Bangiya Imama Parishad and All Bengal Imam Muazzin Assiciation convened the meeting. People had also arrived in buses and trucks from distant districts of West Bengal like Murshidabad and Nadia, in additional to those from the adjoining districts of North and South 24 Parganas, Haora and Hooghly, among others. Students of madrassas and the newly minted Aliah Madrassa University were conspicuous at the gathering.

They rallied because ‘Islam is in danger’ in Bangladesh. Never mind that that post-1947, that part of the world through all its forms ( East Bengal, East Pakistan, People’s Republic of Bangladesh) has seen a continuous drop in the population percentage of religious minorities, in every census since 1951.This rallying cry is not new. It was heard in 1952 when the mother language movement of was in full swing, in 1954 when the United Front led by Fazlul Haq and Maulana Bhashani challenged the Muslim League, in 1969 when the Awami League made its 6 demands and in 1971 when Bengalees fought for independence and now in the context of Shahbag in 2013 – basically during every secular movement for rights and justice. One of the main accused in the war-crimes trial, Golam Aazam (also the leader of the Jamaat in East Pakistan in 1971), had used this old trick in the hat when he has stated in 1971 “the supporters of the so-called Bangladesh Movement are the enemies of Islam, Pakistan, and Muslims”. Replace ‘Bangladesh’ with ‘Shahbag’ and ‘Pakistan’ with ‘Bangladesh’ and you have the same logic. Terming the struggle in Bangladesh to be one between Islam and Shaitan (Satan), it was announced at the meeting that they would cleanse West Bengal of those who were trying to support the present Prime-minister of Bangladesh and the war-crime trial effort. It was also threatened that those political forces that support Shahbag would ‘beaten with broom-sticks’ if they came to ask for votes from Muslims. Just like Taslima Nasreen and Salman Rushdie, Sheikh Hasina will also be kept out of Kolkata – they added. They also supported the anti-Shahbag ‘movement’ in Bangladesh. The last assertion is especially worrisome as this anti-Shahbag movement has let loose its fury on the religious minorities of Bangladesh. This has resulted in a wave of violent attacks on Hindus, Buddhists and secular individuals, with wanton burning and destruction of Hindu and Buddhist homes, businesses and places of worship. Amnesty International communiqué mentioned attacks on over 40 Hindu temples as of 6th March. The number is over 100 now and still rising.

Given the recent trends of politics in West Bengal, this large gathering and its pronouncements are not shocking. The writing has been in the wall for a while. A collapse in the Muslim vote of the Left Front is an important factor in its recent demise after more than three decades of uninterrupted rule. Various Muslim divines like Twaha Siddiqui of Furfura Sharif, have explicitly pointed that out as a point of threat to the present government. The Trinamool Congress wants to ensure a continued slice of this vote. The present government has tried to hand out sops to build a class of Muslim ‘community leaders’ who eat of its hand by its unprecedented move to giving monthly stipends to imams and muezzins. Very recently, it has been decided that such a cash scheme might be worked out for Muslim widows too. Given that it is beyond the ability of the debt-ridden, vision-poor government to solve the problems that are common to the poor, it has cynically chosen to woo a section of the marginalized on the basis of religion using handouts. These are excellent as speech-making points masquerading as empathy and social justice. This is dangerous politics to say the least. It sets into motion currents and gives fillip to forces whose trajectories are beyond the control of the present political groups. The Left Front’s political fortune has not improved after its humiliating defeat. It has cynically chosen not too oppose this communal turn to West Bengal’s politics, for it too, believes that silently waiting for the incumbent to falter is a better roadmap to power. The damage that is doing to the political culture of the state in immense and may well be irreparable. The incumbent’s connivance and the opposition’s silence are largely due to decades of erosion in the culture of democratic political contestation through grassroots organizing. Both the incumbent and the oppostition parties deal with West Bengal’s sizeable minority population primarily via intermediaries, often doing away with any pretense of political ideology while indulging in such transactions.

For their part, organizations owing allegiance to a particular brand of political Islam ala Moududi, have used this disconnect to the hilt. An emerging bloc of divines and ex-student leaders of certain organizations have used the students that they can amass at short notice to launch specific protests, aimed in getting a leverage in terms of policy. Sadly, this blackmailing is hardly aimed at uplifting the living standards of West Bengal Muslims in this world. Rather, its string of victories started with successfully driving out the famous persecuted humanist writer Taslima Nasreen during the Left Front regime. The most recent example was the governmental pressure that was exerted on their direction to keep Salman Rushdie out of a proposed event in Kolkata, after he successfully did such events in Bangalore, New Delhi and Mumbai. This slowly pushing of the envelope fits into a sequence of events that are increasingly stifling the freedom of expression. At the same time, its double-standards are explicit. On March 21st, a medium-sized group consisting of little-magazine publishers, human rights workers, theatre artists, womens’ organizations and peace activists had announced that they would march in solidarity with the Shahbag protests and express their support to the Bangladesh government’s war crimes trial initiative by marching to the deputy high-commission of Bangladesh. Even after prior intimation, the rally was not allowed to move by the police due to ‘orders’ and some of the marchers were detained. The same police provided security cover to pro-Jamaat-e-Islami organizations as they conducted a rally submitted a month earlier and again later when they submitted a memorandum to the same deputy high commission demanding acquittal of convicted war criminals. Last year, it issued a circular to public libraries to stock a sectarian daily even before its first issue had been published! The role of the state is explicit in these actions – it possibly thinks that it can play this game of brinksmanship with finesse. The flight of cultural capital from the self-styled cultural capital of India is but a natural corollary of such unholy alliances with the political class playing tactical spectators and tactical facilitators to apologists for one the largest mass-murders in the last century .

The recent bye-election to Jangipur, a Muslim majority constituency carried certain signals. Prompted by the elevation of Mr.Mukherjee to Presidency, this election saw the combined vote of the 2 main parties fall from 95% in 2009 to 78% in 2012. The major beneficiaries were the Welfare Party of India, a thinly veiled front organization of the Jamaat-e-Islami Hind and the Social Democratic Party of India, an even more radical group of a similar ilk. Such groups are armed with a programme of ‘tactical pluralism’, quite akin to the tactical defence of Taslima’s freedom of speech by majoritarian communal political forces in the Indian union. The rallying against Shahbag has blown the cover of faux pluralism. There was another significant beneficiary and predictable in the same election, the BJP. Communal tension has been on the rise in recent years – there has been serious disturbance by West Bengal standards in Deganga and Noliakhali. The majoritarian forces smell a subterranean polarization of the polity. Mouthing banalities about Bengal’s ‘intrinsically’ plural culture is quite useless – culture is a living entity, that is always in flux, created and recreated every moment. It is being recreated by the victimization discourse by fringe groups like Hindu Samhati. It is being recreated in certain religious congregations in parts of West Bengal of Aila where unalloyed poison produced by divines like Tarek Monawar Hossain from Bangladesh is played on loud-speakers. Thanks to technology, such vitriol produced in a milieu of free-style majoritarian muscle flexing in Bangladesh easily finds its way to a place where the demographic realities are different. Hence the popularity and consequent defence of one of the convicted war criminals, Delwar Hossain Sayedee, who in his post-71 avatar had become something of a superstar in the Bengali waz-mahfil (Islamic religious discourse congregation) circuit. What are the effects of the subterranean cultural exchange of this kind? The rally is a partial clue. A defence of Sayedee and claiming him to be innocent, as was repeatedly done in that rally, is like perpetrating Holocaust-denialism.

Just a day after the anti-Shahbag rally in Kolkata, almost as a divine reminder of starker realities beyond the defense of Islam, nearly 45 lakh unemployed youth, Hindus and Muslims, sat for the appointment as primary school teachers recruitment examination for 35000 empty posts. Roughly 1 in 128 will succeed. There is no employment exchange worth its name, including the ‘minority’ employment exchange set up by the incumbents, which would absorb the unsuccessful 44 lakh. West Bengal is one of the few states that have petitioned for a relaxation of the minimum qualifications for primary school teachers in the Sarva Shiksha Abhijan scheme, as stated in the Right of Children to Free and Compulsory Education Act of 2009. There is a rot at the base with every community affected. It has been long in the making. The promotion of religious education is hardly the way to empowerment and livelihood generation for minorities, especially in a state where they have been grossly under-represented in the all white-collar services. There are no short cut solutions to this.

Majority and minority communalism in West Bengal, though not generally overt, can be found easily by scratching the surface. A combination of circumstances can awaken it. Will more such circumstances arise, or will more responsible politics prevent a potential communal unraveling of West Bengal? Bengal’s past experience with communal politics is distinctly bitter, both in the west and the east.  The west lives with half-sleeping demons. In the east, the demons never really slept, and have been in and out of power.

 

 

Leave a comment

Filed under Bengal, Community, Democracy, Dhaka, History, Identity, Kolkata, Language, Pakistan, Polity, Religion, Scars

The heavenly duties of stones in our punyabhumi / Just the nature of my game / The life of stones

[ Daily News and Analysis, 16 Apr 2013;  Kashmir Reader, 20 Apr 2013 ]

Police forces in many areas of the Indian Union engage people in their area of activities by organizing football tournaments. By some heavenly design, these incidents almost always make it to the media, in a subcontinent where police atrocities find it hard to get reported. A smiling lion of a man handing a cup to some sweat-soaked youths. In other nations where police atrocities happen less frequently, police organize fewer football tournaments.

The recent months have seen passionate championing of the right of women not to be raped. The Justice Verma commission set up in the aftermath of the Delhi rape and murder incident invited responses from the public. It received many inputs from many quarters on their own. Not a single Director General of Police responded to the notices of the commission. They were probably busy giving away prizes at football tournaments. Image building exercises become important when exercises  to protect the rights of common people fail. But I am dirty-minded enough to suspect that there is more to this ‘failing’. I will simply ask the question – which domestic organization, in the business of providing monthly salaries and occasional bravery medals,  happens to employ the largest number of alleged rapists and serial abusers? Hint – such lions also fight against social vices by extracting money from sex-workers of all genders after raping them. Given that the ‘rule of law’ comes down hard when certain lines are crossed, I will not answer the question. Are you thinking what I am thinking?

This punyabhumi is choc-a-bloc full of men and women whose sensitivities are often bruised by the non-desi concept of a  sexual woman – in skin, in paint, on screen, in public. Stones have often been the weapon of choice against this anti-national evil. Where do these stones go after national duty like attacking artists is done? Since every inch of the land is punyabhumi, no wonder the stones also carry that near-heavenly quality. The national fervour that is deeply embedded in each and every such piece of stone does not decay like its slightly less masculine cousin of radioactivity. The stones simply march forward to Chhattisgarh to continue their holy duty.

Some of the stones made their way into the vagina and the rectum of one Soni Sori, held by Chhattisgarh police for 8 cases. In spite of the stones that were inserted deep in her vagina and rectum, the police could not prove the charges in 4 out of 8 cases. The other 4 are going on. The patriotic stones might have continued to torment an adibashi woman like Soni Sori unless her medical examination was shifted out of Chhattisgarh to less godly Kolkata. Soni Sori has also alleged that she has been repeatedly raped. But some of the prime witnesses, the patriotic stones, have been removed by the Kolkata doctors. Acharya Jagadish Chandra Bose of Kolkata, in his later years, started finding ‘the living response’ in many inorganic matters, including rocks. Nothing short of the expertise of that departed soul can help make sense of the testimony of the stones. Till such time, Soni Sori’s rape will remain ‘alleged’.

The charges against Soni Sori that were proven false in court included very specific things like opening fire and using explosives to blast the vehicles of Essar steel, attacking the police at Kirandul and blowing up a police station. If the state were a person that imagined such crimes from thin air, concerns about mental health would arise. If the state deliberately made up these cases, then it is sociopathic.The state, after failing to prove charges against Soni Sori ( incidentally, a  school-teacher), has started an enquiry to ascertain whether she should be sent to the mental asylum in Agra.

Lets concentrate on the football tournament instead. SP saheb has already arrived for the prize distribution ceremony. I think we should all stand up, clap and smile  because our culture teaches us that we should be respectful to elders, especially those who win gallantry medals. Brown women need  not fear – too many lions of Bharatmata are protecting them in every street.

1 Comment

Filed under Army / police, Class, Kolkata, Our underbellies, Power, Rights, Terror, Under the skin

Chavez – a subcontinental remembrance

[ Daily News and Analysis, 7 Mar 2013 ; Kashmir Reader, 11 Mar 2013]

I never met the just-deceased leader of the neo-Bolivarian movement of Venezuela, Hugo Chavez, in person. However, living in this subcontinent, somewhat fortuitously, I have seen him in various forms. What does his death mean to the subcontinent? Did he mean anything to us when he was alive? I have a couple of personal snapshots to offer. It can be considered a tribute.

When I say that I have never met Hugo Chavez, it is only half true. I had seen him up on the stage at a mass-rally in Kolkata in 2005. At that point, I was in Medical College, Kolkata and a member of an independent students association, which was regularly threatened and sometimes physically beaten by members of the ‘Party’s’ student wing. Rakesh, a class-mate of mine and now a humanitarian doctor at the Shramajibi Hospital in the Sundarbans, and I saw the posters in the city that the ‘Party’ was organizing a mass rally at the Lake Stadium and Chavez would speak. At that time, the coup that had briefly deposed him and his valiant and popular return had gained wide currency in our minds. We did not have too much access to the Internet and online videos never smoothly streamed anyways. But what we had seen and heard, from here and there, had made us realize that this would be an opportunity of a lifetime. A ‘red’ leader whose action, mannerism and style was in such contrast to the Dodos that walked about in Kolkata neighbourhoods back then – this was reason enough for us to go to his rally that evening.

I must confess that we were rather scared. Rakesh had been repeatedly threatened and assaulted by the ‘Party’ and I was a known face too. And here we were, among thousands of the Party faithful. We hoped nobody recognized us – realistically the chances were slim. Half-jokingly, half-nervously, I whispered to Rakesh that in this 10000 (or more) versus 2 scenario, we could be vanished without trace.

The event was nominally organized the government. But the ‘Party’s top brass was in full attendance – some on stage and some very near it. Events like these were a strange version of universalism that only Kolkata used to experience. Once, the city was also treated to an event where Che Guevara’s daughter had come visiting. Around the time of these events, the public posturing of the ‘Party’ and the tone of the columns in the ‘Party’ daily used to be such as if the dhoti-clad were very uncomfortable in their air-conditioned offices, and were itching to hit the trenches. The last installment of this periodic farce was when Maradona came to Kolkata.

And then Chavez spoke. There was an interpreter who translated his Spanish to Bangla realtime. That poor soul drew angry jeers from the ‘Party’ faithful when he said ‘Karlos Markos’ – a name Hugo Chavez had just mentioned in that form. And I perked my ears up. Over the cacophony of the mujahideen disgusted at the Holy Name being taken in a non-divine Spanish ( and not divine English, but not German, mind you), a different Hugo emerged to us. The person on stage had been engaging with Karl Marx, on his own terms, with a confidence that comes from being deeply embedded in one’s cultural ethos. Rakesh and I were won.

There were layers upon layers of irony that evening. In the Panchayat Elections held less than two years earlier, as many as 5030 Gram Panchayat seats were won ‘unopposed’ by the same party that was hosting the character who had unleashed the most democratic regime that part of the world had seen in recent times – even facing a recall election. At some point in his speech, Chavez mentioned Gandhi (I don’t remember whether it was the Father or the Mother). The crowd fell silent – evidently, Hugo had not been briefed about the time and place. Rakesh and I, dirty-minded as we were, deliberately chose to clap hard at that moment, amongst angry looks of people around us. Looking back, I feel, that bit of bravado was not worth the potential risk.

When he left the stadium, he stuck out his torso the car-window, waving spiritedly. For a moment, he waved directly at us, or so I thought. A day later, there was a picture of him in the ‘Party’ daily from one of the ‘agricultural progress’ tours they must have organized. He smilingly held a giant-sized pumpkin on top of his head – with the dhoti-wallas around him not sure how to react. That moment, from the unlikely vantage of a still-photo in a Party daily, he spoke directly to irreverents like us. Such was Hugo.

And then, 8 years later, I saw ‘Hugo’ again, in Shahbag, Dhaka. He was about 25, wore a similar beret cap, and was leading the sloganeering. I saw a few others in Shahbag, sporting the ‘Hugo’ look. Surely Hugo was more alive in the East, beyond the clutches of the dodos of the West.

On Hugo’s death, my friend Aiyan Bhutta of Lahore, improvised an old Pakistan People’s Party slogan that had originally been coined after the hanging of Zulfikar Ali Bhutto. ‘Har ghar se Hugo nikleyga tum kitnay Hugo maaro gai’. ( From every home a Hugo will emerge, how many Hugo’s will you kill?). I remembered the 25-year old Bengali at Shahbag. Indeed. Tum kitnay Hugo maaro gai. Har ghar se Hugo nikleyga.

Leave a comment

Filed under Americas, Bengal, Democracy, Kolkata, Obituary, Power

A matter of roads – elite panaceas and encroached commons : Emerging urban dystopias in the Subcontinent / Hope in jaywalkers

[ Himal SouthAsian Jan 2011; The Daily Star (Dhaka) Dec 4 2010; The Daily Mirror ( Colombo) Jan 4 2011; Down to Earth, 15 Oct 2013]

“ I have been to Houston and other American cities. Europe too. Traffic is fast. People wait for the traffic signal to walk. They are so disciplined.There are few people walking anyways. When will Kolkata become like that? Possibly never. Not with people like this. Not with so many people.They are not fit for a modern city.”

There is a certain angst at play when some look at Western cities and then look at cities of the subcontinent like Kolkata or Dhaka, only to sigh deeply (I exclude ‘planned’ dystopias like New Delhi from this discussion as they represent the defanging of the people at a very different level. I write about cities where there is still hope and obstinacy). Slow traffic, roads  of inadequate width, people on the streets, non-observance of traffic rules are cited as major reasons. Add to that rickshaws and bicycles – and  Paris like traffic looks like a perfectly unattainable dream. At this point, the nature of the voiced solutions should be predictable – widening of roads in the city but not tearing down middle-class homes, getting people off the streets by tightening and enforcing traffic rules and possibly, keeping rickshaws and bicycles off the busier areas. If some are already mentally nodding in agreement by now, there is something deeply troubling about the nature of imagination of our city we have, including the idea of urban citizenship, who is included in that imagination, who is not, who is the city for.

Among the upwardly mobile in the cities of the Subcontinent as elsewhere in the Southern World, there is an evolving homogenizing vision of what the future of global urbanity should look like – who is included, who is not. This vision has been long in the making , expressed privately in frustration at drawing rooms – now this progressively exclusive vision has the confidence of being forthright about itself, under the garb of urban  development  in the new century.

As a counter-force to this restrictive idea of urban citizenship,  one might ask, who  does the city really belong to?  And whether one likes it, cringes at it, celebrates it or wants them gone – some facts are worth mentioning. At least 40% of the population megalopolises of India like Kolkata and at least 50% of Dhaka live in slums (bostee). Slums are not only the underbelly of a city, they are a living critique of the dominant socio-political order of the sun-lit city. Hence the question of roads and traffic and the typical set of wants and frustrations that the elites express about the city is really another extended stage where the contestation of the question of ownership of the city is acted out. In such a contest, there really is a more plural view of the city from one side as opposed to a restrictive view – no slum ever dares or imagines that it will gobble up the quarters of the perfumed. The city that the slum and the lower middle-class imagines necessarily includes those who want to see the slums gone from the city and the jaywalkers gone from the street. The dominant urban vision has no time or imagination for such plurality in vision. The city that the perfumed classes of the Subcontinent want almost never looks like the city they live in. Many are ashamed of it. I grew up and lived in Chetla – a locality in Kolkata that is not really throbbing , in short, not ‘posh’. Some of the unfortunate ‘posh’ people who lived there used to say they lived ‘near New Alipore’ – New Alipore being a ‘posh’ area where much fewer people wearing lungi and brushing their teeth in the morning on the street could be found.This has interesting implications about how adjusted one is to reality in its full import. I wonder what some of these maladjusted would have thought about their great-grand father from the village, garu (water carrying vessel)  in hand, crossing a meadow in the morning to defaecate in the field but that is another question.

Given this, in contemporary times, the thrusts towards “cleaning-up” the cities and its streets have something holy at its core – distributive injustice. The city’s commons belong to everyone and so do its streets. The streets being common property to be used for transport, it deems fit that the proportion of a metalled road to footpath or side-walk in a given street should be commensurate with the nature of use. The proportion of people using the footpath to the proportion of people on cars on the streets are a good indicator of how common transport-intended land is to be divided in general , with adjustment space for specific situations. But has anyone every heard of footpath widening as opposed to road-widening ? What is especially ironic is how the shrinking , unmaintained footpath has become lower priority in the urban development discourse – this development is really a staking out of territory for some, the nature of thrust showing who is in charge. Footpaths are fast becoming in the mind of the upwardly mobile what government hospitals have already become to them – places they do not go to and hence they do not care about. Given its restrictive view of the urban future, the group wants to mark out a city for its own, within the city.This progressive loss of free walking space and the sophisticated and exclusionary plans of “urban development” represents this thrust to mark out a city for people-like-them, with ‘cleaner’ habits, ‘orderly’ manners and ‘refined’ sensibilities. There is an barely implicit collective will, laced with power and interest, and when those things combine, there surely is a way. The arc of that way, bends sharply towards to the interests of the new mandarins of the city- in whose vision, an increasing proportion of the city dwellers are quasi-traspassers.

In a situation where much of the city is considered trespassers to be avoided and given the stupendous majority of the city being formed by such ‘quasi-trespassers’, one sees the perfumed classes conjuring up a feeling of being besieged and finding ‘order’ and ‘security’ in that spectacular physical expression of this maladjustment to the living ecology of a city – the gated communities. An entire generation is growing up with limited or no consciousness of the bostee, jhupri, khalpar and rail-line jhupris and udbastu ( refugee) colonies. This lack of consciousness is not because they do not exist in the city, but the elites have now managed to carve off a sterilized existence where much of the city dare not show itself. Gated communities are also gates in the mind. All this would not have mattered if these elites were not disproportionately influential in conceiving the future of the whole city and not only their gated communities. Although these people have their gated communities, to much gritting of  teeth, there are not many gated roads – at least, not yet.

By top-down orders, increasing number of streets in Kolkata have seen bicycles being banned from plying on certain streets and consequent harassment of the bicyclists. Something is to be said of this ‘sanitization’ of streets of non-motorized transport. Given that the perfumed ones inhabit the same earth ( if not the same world) as those who smell from armpits, the central question of a sustainable ecological future is not really irrelevant to the future of our cities. Cornel West says that justice is what love looks like in public. In the context of urban resource allocation, distributive justice has to come from love of the city and all its people. This includes the rights of the pedestrian, the thhelawala ( cart-plyer), the bicylist and also the motorized. In case of the motorized, the question of passenger density is conceivably at the heart of the ecological question. With criminalizing non-motor transport and encouraging the rapid expansion of low passenger density private four-wheeler transport – the policy-makers show which world they belong to. They sadly, still belong to the same earth as before.

This brings us to jay-walking.The men and women behind the wheels hate these people- uncouth, running across streets, everywhere. They just keep on coming, running, getting into buses and now, horrendously, into underground railways too. And so there are calls for tightening traffic rules with more punitive fines and calls for more vigilant and numerous traffic police.In the absence of gated streets, at least one can ensure a semblance of that by keeping “jaywalkers” out of the streets. These filthy impediments of the city are partly what go into making the idea of a ‘long-drive’ so inherently appealing for some of the scions of the elite.And of course they also love the greenery in Amazon rain-forests as shown in the National Geographic channel. Some of them have also worn wrist-bands to “Save the Tiger”.

The traffic police make half-hearted attempts to control jay-walking. They recruit from schools with poorer children who spend days volunteering at busy traffic intersections of the city. A gaudy T-shirt from the Traffic Department, a badge of false-self importance saying “Traffic volunteer”, some stale snacks in a packet to take home – we have all seen them. The “Save the Tiger”s have better things to do – studying harder for engineering entrance, now that more seats are ‘reserved’. But the effort is bound to fail – the the hapless homeguard doubling up as traffic police, the child in the gaudy T shirt, their fathers, mothers, uncles, brothers, sisters are right there, right then, somewhere, on some other intersection, jay-walking across the street, holding up progress of fast traffic and smooth urbanity, crossing on to the other side, living to fight another day. No wonder the volunteers and their minders do not push hard, beyond a point. There is the rub- it is not a question of who is jaywalking the streets. Rather it is a mixture of contending ideas of who the city belongs to, of predictable eyesores counter-posed with the want of Paris and Singapores in Kolkata and Dhaka – the stuff of fantasies of resident non-Indians, as Ashis Nandy might put it.

But the jay-walkers keep on walking.The urban-industrial vision of the elites is a totalizing one-it brooks no dissent. It is distinctly irked by every interstice that is unfilled – it deems that as a nuisance at best and a law and order problem at worst. In our cities of ever decreasing interstices, of all crevices having been accounted for by census and survey, watched ever sternly by law, every such act of daily risk-taking, in that act of brisk jay walking restores a measure of dignity to vaunted idea of the city’s commons. In this act, they are joined by ‘other Wests’, like those espoused by the Reclaim the Streets (RTS) collective’s non-violent direct action street reclaiming and those that inspire the massive motor-traffic jamming bicycle-rides of Critical Mass.

I have a feeling that it is in those jay-walkers and in their haphazard trajectories, in their at-times-hesitant-at-times-wanton disregard of the impatiently honking Hyundai Santro, in their collective stoppage of a small fleet of Boleros, Marutis and Indicas to cross the street just in time even though the state has given a green-light, lie the multiple trajectories to plural, open and just futures for our beloved cities.

Leave a comment

Filed under Change, Class, Democracy, Elite, Open futures, Our underbellies, Urbanity

Long way from home – silent shuffles towards not sticking out

[ Agenda  – special issue on Migration and Displacement, July 2008 ; The Friday Times (Lahore), May 10-16, 2013 – Vol. XXV, No. 13 ]

A narrative set around the displacement during the partition of Bengal in 1947, exploring traumas not so explicit, adaptations not so consensual. And imprints of things thought to be lost.

***

I have crossed the border between the two Bengals multiple times. In February 2013, I took back my maternal uncle Bacchu mama to his ancestral home in East Bengal (now part of the People’s Republic of Bangladesh).He had fled after his matriculation, a little before the 1965 war. When we reached his 2-story modest tin-shed erstwhile home in the Janaki Singho Road of the Kawnia neighbourhood of Barishal town, I saw this mama of mine, trying to touch and feel dusty walls and stairs. He is by far the jolliest person I have seen. This was for the first time I have ever seen his eyes tear up. The story that follows is of his paternal aunt, or pishi.

Having had taken active interest and in some cases active participation in anti-displacement agitations of various sorts and hues, what does ring hollow to my privileged existence is the real trauma of the experience. I know the statistics, the caste break up of the internally displaced, the pain of being transformed from sharecroppers to urban shack dweller – raw stories of loss and displacement. The “on-the-face” ness of the accounts, unfortunately, has a numbing effect. With a populace numbed to the explicit, its sensitivity to things hidden is nearly non-existent. In spite of my association with causes of displacement, in my heart of heart, I empathize but don’t relate. Nobody I have grown up with seemed to have any psychological scar or trauma about it – at least none that they carried around, although I grew up around victims of one of the biggest mass displacements of all times – I am talking about the partition of Bengal in 1947.

When I grew up in Calcutta in the 80s, visits to my maternal grandparents’ place were a weekly feature. They were Bangals to my father’s extended family – we lived in a 30 something strong joint family, firmly rooted in West Bengal, very Ghoti. Bangals  are East Bengalis, a people with a culture less-sophisticated, in the minds of the Ghotis. In later years, especially post-1947, the term also came to mean refugees and hence evoked certain discomfiture about the presence of Bangals in West Bengali minds, if not outright animosity. With time, ties- political, amorous and otherwise were built between certain sections of the two communities. I am a child of mixed heritage – with a Ghoti father and a Bangal mother. Much of what I have said, except the last statement are generalizations, but they are useful in terms of broadly demarcating the space within which the narrative is set.

The people of my mother’s extended family had their displacement stories – not really of trauma, but a sense of material loss- the money they couldn’t bring, their land that had been expropriated ever since, the struggle of some families they knew, etc. Calcutta subsumed much of their selves now that they were here and most of them had been here in Calcutta for most of their lives. The character of importance here is my maternal grandmother, my Dida. She was married off to my maternal grandfather, my dadu, who I hear was visibly unwilling about the marriage at that time, if not the match itself – both were teenagers. When she came to Calcutta in tow with her husband, she was still quite young. My mother was born in Calcutta.

They lived in a rented place near Deshopriya Park. There was a certain air of dampness about the place – it connected to the metalled road by a longish and narrow path, not revolting but full of a strange smell of dampness. The path, gritty and dimly lit, was nearly metaphorical of my dida’s connection to her new world – connecting to the mainstream required a certain effort. Inside that house, it was strange and intriguing to me. The lingo was different – they spoke Bangal ( a Bengali dialect) with a Barishal twang ( Barishal was one of the more pupulous districts of East Bengal) called Barishailya. Dida referred to chokh ( eye) as tsokkhu and amader ( our) as amago. I used to pick these up and relate it to my Ghoti joint family, regaling them. Now I don’t think it is hard to imagine that many Bangals didn’t like the fact that other people found simple pronouncements in their dialect amusing and even comical.( Some comedians have used this aspect in Bengali comedy. I am reminded of black clowns with artificial and heightened mannerisms who regaled White audiences).

Dida cooked well and was known for it. What did she want to be known for? My mother related to me how her father was a great lover of letters and sciences. This was somewhat true – sometimes I abhorred going to him because he would not only tell me to do a math problem but also ask me why did I do it that way. He tried to get all his children formally educated – a Bangal signature of the time with imprints still continuing. Markedly different was his attitude towards Dida – I remember numerous instances of “o tumi bozba na” ( You wouldn’t understand that.) On her 50th marriage anniversary, her children got together for a celebration. The couple garlanded each other. She looked happy with her self and her world. “ Togo sara amar ar ki aase” (What else do I have but you people) was her pronouncement. Something happened a few years later that made me question the exhaustive nature of her statement..

Things happened in quick succession after this. The brothers and sisters split. The turn of events resulted in Dida staying with us . Our joint family had ceased to exist too. By now, I was a medical student. Dida was getting worse due to diabetes. So, I spent time with her. I remember her trying to speak ( and miserably failing) our non-Bangal Bengali dialect, to my paternal grandmother. She did try to mingle in, for circumstances demanded that she do. At the time, I   thought that she was extraordinarily fortunate. With my new-found sensitivity towards “identities”, I thought, she must have been very happy to speak Bangal until now. She did her groceries at a bazaar full of grocers who were themselves refugees from East Bengal. In fact one bazaar near my home in Chetla is actualled called the Bastuhara bajar ( the homestead loser’s bazar).Her husband’s extended family was essentially her social circle and they all chattered away in Bangal. They ate their fish their way and did their own thing. In spite of being displaced from East Bengal, she had retained her identity, her “self”. Or so I thought.

She suffered a cerebral stroke sometime later. A stroke is tragic and fascinating. It cripples and unmasks. The social beings we are, who care about what words to speak to whom, what state of dress or undress to be where and when, etc- this complex monument of pretense can come crashing down in a stroke. She had been for a day in what would medically be termed “delirium” , characterized by, among other things, speech that may be incoherent to the rest of us. She couldn’t move much and spoke what to us what was nearly gibberish- names we didn’t know, places we hadn’t heard of. To ascertain the stage of cerebral damage, one asks questions like Who are you? Where are we? What is the date? Etc. I was alone with her when I asked this first. Who are you? “Ami Shonkor Guptor bareer meye”.( I am a girl from Shonkor Gupto’s family).I repeated, and she gave the same answer. She couldn’t tell me her name. Shonkor Gupto wasn’t her father but an ancestor who had built their house in Goila village of Barisal, East Bengal. She recovered from the stroke and remembered nothing of the incident. When I asked her later, she replied “Jyotsna Sen” or  “Tore mare ziga” (Ask your mother).”Who are you” and “What’s your name” had become one and the same, again. She died sometime later. Another stroke felled her.

Displacement brings trauma with it. And the trauma can be cryptic. It can be hidden. It can be pushed down, sunk deep with the wish that it doesn’t surface. But displacement from home is a strange phenomenon – resurfacing in odd ways. And often an involuntary journey away from home is a journey away from one’s self too. The journey of displacement is hardly linear. It is more like a long arc. In most cases, the arc doesn’t turn back to where it started from. The journey looks unhindered by identities left back. But we can sometimes peer deeper. Nobody called my Dida  by the name Jyotsna Sen – she merely signed papers by the name. She had a name by which people called her before her marriage – “Monu”. This name had become hazy after her marriage and journey to her husband’s house and then essentially lost after she migrated to Calcutta. She had been doubly removed from the people, the household, the organic milieu that knew “Monu”. She had 3 children, 4 grandchildren, a husband, a new city. Where was she? And when all this was shorn off, what remained was a teenage girl from East Bengal village – a place she hadn’t been in 60 years, may be the only place where she will be much of herself. Monu of Shankar Gupto’s house.

At this point, I wonder, whether she silently bled all through. Would she have bled similarly if she had choices about her own life or at a bare minimum, if she had  an active participation in the  decisions that changed her life’s trajectory? The speculative nature of the inferences I draw from her “unmasking” story is not a hindrance to imagine what could have been. A little looking around might show such stories of long-drawn suppressions all around – suppressions we consider facts of life and take for granted. Who knows what she would have wanted at age 15 or at 22. Where was her voice, her own thing in the whole Calcutta saga that followed? The picture perfect 50th anniversary clearly didn’t capture all that she was. Her husband believed she had her due – what more does one need, he thought for her. My mother thought, with a well-intentioned husband that her father was, Dida must be happy. The identity-politics fired lefty in me had thought she hadn’t been displaced enough, given her Bangal milieu!  We were all wrong! A part of her lived repressed all along. In the microcosms we inhabit, there are stories of displacement, failed rehabilitation and denial of life choices. It is my suspicion that on learning about the Narmada valley displaced, a part of my Dida’s self would have differed vehemently with the Supreme Court judges Kirpal and Anand*1 – stances which often elude the nuanced mind of the intellectual.

*1 Justice Kirpal and Anand in their majority decision disposed off Narmada Bachao Andolan’s public interest litigation and allowed the resumption of construction of the Sardar Sarovar Dam and increasing of its height upto EL 90m, resulting in further displacements of many more families, in addition to the thousands already affected.

2 Comments

Filed under Bengal, Home, Identity, Kolkata, Language, Memory, Partition, Scars

The multiverse of loyalty

[ Himal SouthAsian, May 2007 ; Dhaka Tribune, 7 Feb 2014 ; Shillong Times, 23 Jan 2014 ; Echo of India, 28 Jan 2014 ]

The multiverse of loyalty: ethnicity, state and the Bangladesh-India cricket match.

 

 

For the West Bengali bhadralok, East Bengal continues to represent vastly different things to different people: a Muslim-majority country, an audacious dream of ethnic pride and secularism, a land vaguely culturally similar but distant in imagination, their forefather’s homeland, the place where cyclones aimed at West Bengal finally end up, a hub of ISI activity, the place of origin of the wondrous Ilish fish, the list, of course, goes on. While every West Bengali’s attitude towards East Bengal/Bangladesh is formed from one or more such memories and connotations, many of these have a limited acceptability in standard discourse, particularly in public expression. That does not make them any less potent, however, and forces their manifestation only under very particular instances.

 

One of those instances was 17 March, the day Bangladesh scored its historic win over India in the World Cup cricket match in the West Indies. I watched the Bangladesh-India game in an undergraduate house at Harvard University. With India being the odds-on favourite, the Bangladeshi team was widely expected to take a beating. Since live telecasts of cricket matches are not available on cable TV, the Harvard Cricket Club folks, comprised primarily of Indians (including this writer), had bought a special subscription. Watching along with me were two East Bengali friends. If truth be told, I only watched the Bangladeshi innings because I could not wake up in time for the Indian innings after a late night’s work. Regardless, while I was happy that West Bengal’s own Sourav Ganguly, the Indian team’s former captain, was in the process of scoring the highest number of runs for the Indian side, I was not very happy with the Indian total. But slowly, perhaps as I became more and more caught up in the action on the field that reaction changed.

 

With the Bangladesh Tigers prowling all over, I felt the first of many alarm bells going off in my head. I was surrounded by non-Bengali supporters of India, who were cursing the Indian team for its poor performance. But as the direction of the game became increasingly obvious, I did not really see the coming defeat as my own. In fact, I was busy asking  somewhat quietly and ashamedly questions about the Bangladeshi team: Oi batsman tar nam ki? (What is that batsman’s name?) By the time the match was nearing its end, I had become an unabashed Bangladeshi cheerleader. This led to a few strange stares, but I did not care. Nonetheless, it did all feel a bit odd. My cheers, after all, were not really for good cricket. There was nothing remarkable about a single run taken by Bangladesh, except perhaps that it was bringing the underdog a little closer to a win against the titan. And I was happy, long-forbidden loyalties were having a free ride, and the Bengali (not the West-Bengali Hindu) in me loved that we had won.

 

After the game ended, the general ambience in the room was distinctly dark. But I found that my own mood was not part of the gloom. My East Bengali friends treated me to a pint of beer, and we had a hearty, congratulatory talk. As I walked home that evening, I felt a nagging confusion- not about the anger of the Indians, nor about their reaction to my cheers for Bangladesh. Rather, of my own change of heart. A side of me had opened that only had so much space and time for loyalties. It is an easy call, perhaps, when Ganguly is on the team – he is an Indian Bengali. But even here I was found wanting. And more generally? In the games to come, would I continue to root for the Bangladeshi team? And what did this opening mean for India-Pakistan matches to come?

 

Primordial organic identity

The way that my reaction had publicly changed during the course of the game would have been inconceivable had I been watching the match anywhere within India or Bangladesh. The split self that I harbour and which, I believe, many others do as well , does not have a legitimate space for expression in any but the most liberal of establishments in the Subcontinent. But such dual identities remain within us, deep down in our hearts, where politically correct stances and obeisance to national symbols cannot cast a shadow.

 

Ethnicity is a category, as is identification with a nation state. However, these two differ in one important aspect. A nation state demands explicit loyalty, and de-legitimises everything else; those who balk at this explicit parade of fidelity are at best and parasites at worst, loyal to another nation state. The kind of fealty that ethnicity proposes, I like to believe, is at once more organic and primordial than that demanded by the nation state. In most cases, the loyalties to ethnicity and to nation state do not come into specific conflict with one another. But the varying degrees of distance between the two can be mapped as a continuum. On the one hand is the Naga, for instance, who has no nation state but is held within an all-consuming one, which goes to repressive lengths to extract explicit loyalty. At the same time there is the Hindi belt, an area that can explicitly declare its unflinching loyalty, as the points of declaration in its case do not interfere with claims of ethnicity. The Hindi belt is to the localities the natural claimant of the spot where the Indian pulse is to be felt, something that the rest of India only grudgingly acknowledges.

 

West Bengal is an interesting case in this regard, falling somewhere in the middle of this continuum. Together with the explicit declaration of loyalty to the Indian nation state, we find here a vague understanding and acknowledgement of ethnic kinship with Bangladeshis. But of course, almost all Hindu (and Muslim) West Bengalis would balk at a declaration of loyalty to the state of Bangladesh. And so the split self remains masked. Even among West Bengalis there would be a continuum of the exact extent to which this kinship is felt, irrespective of loyalty to the state of India. It is an interesting and open question: How does the barrier between Muslim and Hindu West Bengalis differ from that between West Bengali Hindus and East Bengali Muslims? For that matter, can any such difference be attributed to allegiance to India? Would the dynamics of West Bengali loyalty to India change if Bangladesh were not a state that bore the primacy of Islam in its Constitution? Further, did Hindu West Bengalis feel clear affinity with the Bangladesh that was still officially ‘secular’ before the 1988 constitutional amendment that made it ‘Islamic’?

 

The day after Bangladesh’s 17 March win, I was reading Sangbad Pratidin, a Bangla daily published in Calcutta. It reported that, following India’s loss, local cricket fans were not as grief-stricken as was the rest of the country. This same story was echoed in the national media. I could not help wondering whether I would have felt as positive as I did if my local Calcutta boy, Sourav Ganguly, had not scored well  indeed, had he not been the highest run-getter among all of the two team’s batsmen. How would I have taken to East Bengali bowlers cutting short Sourav’s innings?

 

Days later, the Bangladeshi team defeated South Africa, the world’s top-ranked squad, doing much to demonstrate that their win against India was not a fluke. West Bengal’s largest-circulating Bangla daily, Anandabazar Patrika, carried huge headlines trumpeting, “Bengalis stun the world’s best”. Bangladesh had the sudden chance of a glory run, and I found that I wanted to cheer it all the way , my conscience perhaps cleared by India’s elimination.

 

United in grief

An inward-looking state experiences great problems with transnational loyalties and animosities associated with those loyalties. Nowhere were the disadvantages of this seen more clearly than in this year’s Cricket World Cup. It is widely acknowledged that Southasia, specifically India and Pakistan, are the lifeblood of commercial cricket (See Himal November 2006, Cricket cooperation). Southasian interests are the major stakeholders in wooing sponsors, popularising the game, worshipping the players, studying the telecasts, watching the ads, performing related ceremonies, baying for the blood of fallen stars, critiquing the teams, purchasing the tickets, buying the players. The majority of this exuberance has not spilled over into other global cricket audiences, except possibly the West Indies in an earlier era.

 

In the 2007 Cricket World Cup, all of this was fantastically played up. India lost unceremoniously to an unrated but spirited Bangladesh. Pakistan lost to Ireland, one of the weakest teams in the series. The drama reached its bizarre crescendo after the Pakistani loss, when the South African coach of the Pakistani team, Bob Woolmer, was found murdered in his hotel room. Rumour had it that Woolmer had learned that the match had been fixed, and that he might have had specific names. The reaction in India and Pakistan was one of shellshock. Normally larger-than-life cricketers came back home as social outlaws under cover of darkness, to avoid the wrath of fans. Allegations flew wildly, as did dispensations on what had gone wrong. India’s coach Greg Chappell resigned days later, checking himself into a hospital, reportedly fearing for his life. Only one player received a hero’s welcome upon his return to India, and that was Sourav Ganguly. Some Bengalis might have taken satisfaction in the thought that they had not been the ones who had lost. In the West Bengal imagination, India had.

 

With an estimated 70 percent of global cricket viewership residing in India and Pakistan, the economic fallout of the losses of these two teams was enormous. International and national corporations had invested tens of millions of dollars in television commercials touting the country’s cricket stars, while broadcasters were charging up to three times more for advertising during Indian games. Following the losses, many advertisers pulled out, with some of the largest attempting to default on contracts. The poor showing from these two teams also hit the host West Indies hard. An overwhelming number of travel and accommodation bookings had been made from India and Pakistan, and their near-simultaneous losses brought in a wave of cancellations and demands for refunds.

 

In the midst of all this, one heard oft-repeated laments of how invincible a combined India-Pakistan team would have been. In sleek television studios, ex-cricket stars frankly criticised their respective cricketing establishments, and even took the liberty of the moment to give advice to the other side. It was one of those rare moments when segments of the Indian and Pakistani populace were united in grief  and even sympathetic to the grief of the other.

 

These losses, however, did not have much direct emotional impact on me. I (along with many others, evidently) was still looking out for Bangladesh, and was finding doing so surprisingly easy. Given the relatively low expectation from Bangladesh, a loss did not bring sadness, but wins were unmistakably joyful. Segments of the Indian and Pakistani audiences may have broadly turned off emotionally from the game, but that only went to show how the ethnic continuums that spread across Southasian borders make it so tricky for the inward-looking nation states of Southasia to promote tendencies of crossborder solidarity.

 

Cricket in Southasia is not a game; it is serious business, and a regular metaphor for public imagination and expression. Cricket has been used as an acid test for loyalty to one’s country. In general, it does not leave much space to reach across and support the neighbours.

 

But primitive loyalties know no political frontiers, however strong the efforts of Southasian states to seek out exclusive loyalties. Rather, this more guttural type of devotion inevitably finds its own space in private imagination; crossborder organic connections, after all, predate the Southasian political landscape – not to mention cricket itself. But what can be used as a tool to solidify loyalty to a nation state can also act as an avenue of private, almost unconscious, subversion. Because the relationship between a country and its citizens has been moulded into one of either loyalty or defiance, this process inevitably comes with guilt.

 

Can we not imagine beyond this? If political identities in Southasia are largely imagined, then forceful transnational identities are potent triggers for an organic re-imagining of the region. Guilt makes the private dissident crave legitimacy, for intimate alternative identities do not like suppression. The dissident can only hope that organic continuities will eventually make states negotiate with transnational loyalties, with the audacious hope that such negotiations will be obligatory to the long-term survival of nation states in Southasia.

 

——————————————————————————–

 

Bangladeshi-Pakistani bhai-bhai?

Of course, the Southasian story in 2007 World Cup cricket did not end with the defeats of Pakistan and India. Perhaps just as significant as the losses of those titans were the surprising wins by Bangladesh and Sri Lanka. But while the series organisers must have prayed that the turn of events from these two teams would successfully retain the interest of the great mass of Indo-Pakistani audiences, they were to be disappointed.

 

There were widespread stories of Indians and other Southasians, once the smarting had subsided, changing their loyalties to cheer for either Bangladesh or Sri Lanka. This regional camaraderie and the denial thereof was unbeknownst to me, until I chanced upon it on the Internet. On a widely used social-networking website, a group of Pakistanis had formed a virtual community to cheer on what they called the ‘East Pakistanis’. This attempt at comradeship, of course, would not sit well with any Bangladeshi. The site called East Pakistan for World Champions included the line, After kicking India’s ass, they take on the world.

 

The forum quickly became a space for nationalist abuse and counter-abuse, all under the guise of sporting solidarity. After anger arose due to Bangladesh being referred to as ‘East Pakistan’, a Pakistani member retorted, ‘Ah, personal insults. I would expect nothing less from you, my less evolved, but still Pakistani brother.’ The thread of this type of baiting continued, with increasingly personal put-downs from both sides.

Leave a comment

Filed under Bengal, Dhaka, Foundational myths, Identity, Kolkata, Nation