আমার শহর, আমার আশা

সামনেই আমার শহর কলকাতার পৌর নির্বাচন। এ শহর আমার জন্মের শহর। এখানে বস্তিবাসীকে নিমেষে হটিয়ে দিয়ে শহর ‘পরিষ্কার’ করা যায় না – কাউন্সিলর এম-এল-এর বেনামীতে প্রমোটারী ব্যবসা সত্ত্বেও। এখানে প্রধান প্রধান রাজপথে লক্ষ লক্ষ্য হকার সৎ ভাবে আয় করেন – মানুষের পেটে লাথি মেরে সূর্যোদয়ের বিরূদ্ধে দাঁড়ায় এ শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এ শহরের পথে বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার গরীব খাটিয়ে মানুষ বাংলা ভাষার জ্ঞান ছাড়াই ক্ষুন্নিবৃত্তি করে। অন্য কিছু শহর যেমন বাঙ্গালিকে হিন্দুস্তানি বা ইংরেজি বুলি বলতে বাধ্য করে, আমার শহর সেই পংক্তিতে পড়ে না। এ শহরের মন বড়। এ শহর আমার গর্বের শহর। তাই শহরের পৌরসভায় আমার প্রতিনিধিত্ব করবে কে, এটা খুব এলে-বেলে একটা সিদ্ধান্ত নয়। তেরঙ্গা পতাকার রাষ্ট্রর থেকে এই শহর আমার রোজকার জীবনে অনেক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি বাস্তব।

আমার এ শহর নিয়ে ক্ষোভ আছে – যেমন মানুষের থাকে একদম একান্ত নিজের কিছুকে নিয়ে। আমার ওয়ার্ডের পৌরপিতা আমাদের এলাকার নতুন কাজ বা পরিকল্পনা নিয়ে অরাজনৈতিক নাগরিক সভা করেন না। আমার এলাকায় আমার প্রতিনিধি যিনি, তার কাছ থেকে এইটুকু কি আশা করা খুব অন্যায়। আপনারা যারা এবারও আমার পৌর-প্রতিনিধি হবার ইচ্ছা রাখেন, এলাকার নানা পরিকল্পনা দলের রং না দেখে, নাগরিক-দের সাধারণ সভা ডেকে করবেন – এমন কথা দেবেন? এই টুকু চাইব না? অথচ আমার করের টাকাতেই তো পুরসভা চলে। বাড়ির বাচ্চাকে আলু-বেগুন কিনতে বাজারে পাঠালে আমরা পাই-পয়সার হিসেব নিই, আর কোটি কোটি টাকার বরাতে কর্পোরেশনের বাজার-রাস্তা-ইস্কুল-ত্রিফলার হিসেব নেব না ? হিসেব চাইব আমি নাগরিক হিসেবে। শহরের সৌন্দর্যায়নে আমার আপনার মতামত নেওয়ার দরকার নেই আমাদের প্রতিনিধিদের? নইলে সে কেমন প্রতিনিধি ? আমার আপনার ভোটে জিতে সে তাহলে কার প্রতিনিধিত্ব করে?

যে চরিত্রহীন, তার হীনমন্যতাই তাকে বাধ্য করে অন্যের চরিত্র ধার করে নিজেকে চরিত্রবান প্রমাণ করাতে। যার গায়ে কাপড় নেই, সে অন্যের জমকালো কাপড় গায় জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করে। যারা কলকাতাকে লন্ডন-নিউয়র্ক বানাতে চান, তারা না চেনেন কলকাতাকে, না চেনেন লন্ডন-নিউয়র্ককে। তাই তো তারা পরমা আইল্যান্ডের ‘পরমা’ স্থাপত্যকে ভেঙ্গে দেন অবলীলায়, বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদ করে ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে আস্তানা গড়া বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ও সমাজচিন্তক জে বি এস হলডেনের নামাঙ্কিত রাস্তার নাম বদলের পায়তাড়া করা হয়। মধ্যমেধা ও মধ্যকল্পনার সাথে চাটুকারিতা ও দুনম্বরী মেশালে তিলোত্তমা গড়ার তিলের যোগান হয় না, লন্ডন-সিঙ্গাপুরের কয়েক তাল স্থুল অনুকরণ গড়া যায় ঠিকাদারী ব্যবসার মাধ্যমে। এ শহরের নিজস্বতা, এ শহরের প্রাণ-ভোমরা – শহর সাজাতে যদি তাকে যদি মন্থন না করা হয়, তখন সৌন্দর্য্য হয়ে ওঠে নগর ও নাগরিকের মধ্যেকার একটি দেওয়াল। সে দেওয়ালের উচ্চতা দেখে ভয় ও সমীহ হতে পারে, কিন্তু কেউ সেখানে গিয়ে চুমু খাবে না, আল্পনা দেবে না।

এ শহর দাঁড়ায় সিঙ্গুরের পাশে। তাই এ শহরে বিজনেস ক্লাসে উড়ে আসা লোক কম। আর খুব কম সম্বল করেও অমাবস্যার রাতে একটুখানি চাঁদের আলোর স্পর্শ পেতে চাওয়া লোকের সংখ্যা অনেক। আমার শহরের নায়কেরা শহরের নাম ভাঙিয়ে ক্রিকেট দল খোলে না , বিনোদন টেক্স বাকি রেখে নেচে কুদে ‘আই লাভ কলকাতা’ বলে বোম্বাই পালিয়ে যায় না। আমার শহরের আসল নায়কদের একজন হলো শমভু সিং। এ শহরের দক্ষিণে গগনচুম্বী বহুতলের খোপ-ঘরের আধুনিক হুল্লোড়ের উপর ঘুরপাক খায় জয় ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নিহত কর্মী শমভু সিং-এর বিদেশী আত্মা – অপরাজিত সৈনিকের মতো। এহেন শহরের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করা যে-সে কাজ না। এ শহর দিল্লি-বেঙ্গালুরু-নয়ডা-গুরগাঁও হতে চায় না। এ শহর এখুনো দোকানের নাম ও রাজনৈতিক পোস্টার লেখে মাতৃভাষায়। এ শহর হিন্দুস্তানের মরুভূমিতে মরুদ্যান নয়, ভাগীরথী-হুগলীর ব-দ্বীপের কোল ঘেঁসে গড়ে ওঠা মহা-গঞ্জ। এ শহর নিখিল বাংলাদেশের বৃহত্তম শহর। এ শহর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সকল বঙ্গবাসীর।

আমার শহরে থাবা বসিয়েছে অনেক দুর্বৃত্ত। তারা শহরের রাজপথে সাইকেল চালানোকে বে-আইনি ঘোষণা করেছে। তারা গাড়ি থামিয়ে মানুষকে সিগনাল পারাপার করতে একটু বেশি সময় চায় না। তাদের কাছে ট্রাফিক মানেই গাড়ি, রাস্তা মানে শুধুই গাড়ীর পথ। আমি চাই আমার পৌর-প্রতিনিধি এদের সমঝে দিক। আমি চাই আমার শহরে গাড়ি কমুক, বাস বাড়ুক, পথিক বাড়ুক। আমি চাই আমার আগামী প্রজন্ম সুস্থ থাকুক, ভালো ভাবে শহরে নিশ্বাস নিতে পারুক। যিনি আমার প্রতিনিধি হবেন, তার প্রতি আমার দাবি অনেক, আশা অনেক। তারা পারবেন-ও, যদি ইচ্ছা থাকে। আর যদি থাকে শহরের প্রতি ভালবাসা, শহরবাসীর প্রতি দরদ।

আমি চাই আমার ওয়ার্ডে আরো গাছ লাগানো হোক – ফলের, ফুলের। সবুজ রং দিয়ে শহর মুড়লে সবুজায়ন হয় না। নীল রং দিয়ে মুরলে নীলকন্ঠ হওয়া যায় না, পাপ পাপ-ই থেকে যায়। সাদা রং করে পবিত্র হওয়া যায় না – প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। লাল নিশান ওড়ালেই সংগ্রামী হওয়া যায় না – তাপসী মালিকের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। আসন্ন নির্বাচন পুরনো হিসেব বুঝে নেবার নির্বাচন, নতুন দাবি রাখার নির্বাচন।

আমার শহর দেশভাগের শহর। এ শহরে একাধিক বাজারের নাম বাস্তুহারা বাজার। এ শহরের অনেক হকার প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের রিফিউজি। এ শহর বিস্থাপিতের অভয়ারণ্য। এ শহর শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তদের দিয়ে তৈরী ‘বস্তিহীন’ হকার-হীন ‘ছিম-ছাম’ ও ‘শান্তিপূর্ণ’ নকল শহর না। বাস্তুহারা বাজারের প্রতিনিধিত্ব বড়বাজারের দ্বারা সম্ভব না। ওসব এখানে হয় না।

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Democracy, Kolkata, Urbanity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s