উবার চড়ে যাচ্ছি কোথায়?

খুব বেশিদিন আগের কথা বলছি না, কলকাতায় একটা সময় ছিল যখন গাড়ি চড়ে কোথাও যাবার মানে ছিল হয় প্রাইভেট গাড়ি বা টেক্সী। কিন্তু স্মার্টফোন ভিত্তিক আপ-এর দৌলতে ২৮ ঘন্টা  তত্ক্ষণিক ভাড়া গাড়ি বুকিং ব্যবস্থা ভারতের কিছু কিছু শহরের এক বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উবার বা ওলা গোছের কোম্পানিগুলি এখানে খুবই ভালো ব্যবসা করছে।  এছাড়া তাদের জোরদার বিজ্ঞাপনের ফলে তাদের নাম ছড়িয়েছে যথেষ্ট। আমাদের এই বাংলাদেশের পশ্চিমাংশে  তাদের এমনই রমরমা ব্যবসা যে উবার কোম্পানি জানিয়েছে যে মার্কিন কলকাতাই তাদের  বাড়তে থাকা বাজার এবং তাদের এই বৃদ্ধির হার তাদের লন্ডনের ব্যবসার চেয়েও বেশি। ভারতে  কলকাতার পরে তাদের সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা বাজার হলো মুম্বইর। এই ধরনের পরিষেবা বিশ্বের অনেক জায়গাতেই চিরাচরিত লাইসেন্স প্রাপ্ত টেক্সী ব্যবসার লাভের গুড়ে থাবা বসিয়েছে। সেটা এখানকার ক্ষেত্রেও সত্যি। ফ্রান্স থেকে দক্ষিন আফ্রিকা, নানা জায়গায় ট্যাক্সি চালক তথা মালিক ইউনীয়ন্গুলি উবারের ব্যবসা পদ্ধতিকে অনৈতিক ও বে-আইনি বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে – যে ধরনের সরকারী নজরদারির স্বীকার সাধারণ তেক্সীরা, বা যতরকমের কর তাদের দিতে হয়, তার ফলেই উবারদের সাথে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। উদাহরণ স্বরূপ, টেক্সী না যেতে চাইলে আইনে জরিমানার ব্যবস্থা আছে, উবারদের ক্ষেত্রে এমন কোন আইন-ই নেই। সাধারণ টেক্সীগুলি বেসরকারী মালিকানাধীন হলেও সে ব্যবসা বেশ ভালো পরিমানে সরকারী নিয়ন্ত্রনের আওতায়।  টেক্সী ভাড়ার তালিকাও সরকারের সাথে বোঝাপড়া করে ঠিক হয়। উবার-ওলারা তাদের রেট্ ঠিক করে ও বদলে নিজেদের ব্যবসা মাফিক, নানারকম ছাড় ও অন্যান্য বিপণন-ফন্দিরও তারা সাহায্য নিয়ে থাকে, যা সাধারণ টেক্সী আইনত পারে না।

এই ভাবে যখন কোথাও এক ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বেসরকারী পরিবহণ ব্যবসার একটা রেকর্ড প্রসার ঘটে, তখন সেই জায়গার গণ-পরিবহণের অবস্থা ও মান সম্পর্কে প্রশ্ন মনে চলেই আসে। তাই ভারতের প্রধান শহরগুলির গণপরিবহনের মান বিশ্বের নিরিখে দেখে নেওয়া যাক। ‘ফিউচার অফ আর্বান মোটিলিটি ২.০’ নামের বিশদ একটি জরিপ-ভিত্তিক গবেষণার ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। এই জরিপ রিপোর্ট-টি প্রনিধানযোগ্য কারণ এতে বাজার-আদর্শ ও শ্বেতাঙ্গ-বিশ্ব ‘প্রগতি’ ও ‘উন্নয়ন’ বলতে যা বোঝায় (মূলতঃ চওড়া রাস্তা ধরে হুস-হুস করে যাওয়া রাশি রাশি সমাজ-বিছিন্ন প্রাইভেট গাড়ি) , তার কিছুটা বাইরে গিয়েও গণপরিবহনের মানের একটা মানাঙ্ক কষা হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরকে মাথায় রেখে। এই সব ফ্যাক্টরের কয়েকটি হলো – মোট যাত্রা-সংখ্যার মধ্যে গণপরিবহনের সাহায্যে করা যাত্রার হিস্যা, স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার, রাস্তার ঘনত্ব, গণপরিবহনের বৈচিত্র এবং সেগুলি কত সময় অন্তর অন্তর আসে, সরকারী পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ, ইত্যাদি। সারা বিশ্বের ৮৪টি বৃহৎ শহরে এই নিয়ে গবেষণা ও জরিপ চালানো হয়।  তার থেকে পাওয়া ফলগুলি এইরকম। ভারতে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী মুম্বই-এর হাল মার্কিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি-র চেয়ে সামান্য ভালো, লস এঞ্জেলেস পিছিয়ে আছে চেন্নাই-এর থেকে। অনেকের ধারনায় ভারতে ‘উন্নত’ দিল্লির হাল এই বহুমাত্রিক গণমুখী ফ্যাক্টরগুলির নিরিখে বেশ খারাপ – সেটির স্থান ৮৪টি শহরের মধ্যে শেষের দিক থেকে ৫ম। কলকাতা হলো ভারতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ – ৮৪র মধ্যে তার স্থান ৩১, যার মানে আমরা নিউ ইয়র্ক, মন্ট্রিয়ল, টরন্টো ও সিডনির থেকে এগিয়ে আছি। জনসংখ্যার অনুপাতে ব্যক্তিগত গাড়ি মালিকানার হার ভারতের মেট্রো শহরগুলির মধ্যে কলকাতায় সবচেয়ে কম। পয়লা স্থান অধিকার করে হংকং। প্রসঙ্গত এই পরিমাপে ঢাকার রেঙ্ক করাচীর থেকে খারাপ কিন্তু বেঙ্গালুরু বা ওসাকা বা মায়ামির থেকে ভালো। এই রেঙ্কগুলি আমাদের যদি অবিশ্বাস্য লাগে, তার থেকে এই বোঝা যায় যে দুনিয়ায় উন্নয়ন ও প্রগতির জনবিরোধী হেজিমনিক ধারণা আমাদের কল্পনা ও ইপ্সাকে কতটা গুলিয়ে দিয়েছে যার ফলে আমরা সামনে ঘটমান বাস্তবকে দেখেও দেখি না, হাঁ করে অন্যত্র তাকাই। মাথার মধ্যে ভালো-খারাপ-গণমুখী-জনবিরোধী এইসব ব্যাপারগুলি কেমন গুলিয়ে মিলিয়ে দিয়েছে বাজার ও ক্ষমতার যুগলবন্দীতে তৈরী আমাদের এই ‘কমনসেন্স’। আর কলকাতা ও মুম্বই-এর তুলনামূলক ভালো স্থানের কারণে এরই রহস্যময় ও বেমানান লাগে সেই প্রাথমিক তথ্যটি – যে ভারতে উবার যে ধরনের  ব্যক্তিগত পরিবহণ ব্যবসা করে খায়, তাতে তারা সবচেয়ে সফল ঠিক এই কলকাতা ও মুম্বই-তেই।  আসলে ঘটছে তা কি? আমার কিছু আন্দাজ আছে।  আর সেই আন্দাজের হাত ধরে মনে আসে কিছু আশঙ্কা।

ভারতের শহরগুলির প্রায় সবকটিই অতি বিভক্ত শহর – বিভক্ত শ্রেণী, জাত ও অন্যান্য নানা ফেক্টর দ্বারা। আমরা এলিট বলতে বুঝি টাটা-বিড়লা।  আর বাকি সকলেই নিজেদের মনে করে মধ্যবিত্ত – অথচ এই মধ্যবিত্ত প্রায় কিছুতেই কোন কিছুর মধ্যস্থান অধিকার করে না – অর্থ-সামাজিক ভাবে তো নয়-ই। এই উপমহাদেশে এই গোষ্ঠিকে তুলনামূলক-ভাবে কম এলিট বলা যেতে পারে, কিন্তু এলিট তারা বটেই।  এই গোষ্ঠির নিজের গাড়িতে চেপে সবসময় সবজায়গায় যাবার সামর্থ্য নেই, যার ফলে তাদের অনেক ক্ষেত্রেই না চাইলেও অগত্যা গণ-পরিবহণের শরণাপন্ন হতে হয়। তাদের জীবনের এই অংশটি তাদের খরুচে ‘ট্রেন্ডি’ জীবনযাত্রার সাথে খাপ খায় না। গণপরিবহনে তাদেরকে এমন সমস্ত মানুষজনের পাশে বসতে হয়, এমন সমস্ত মানুষের গায়ের গন্ধ ঘামের গন্ধ নাকে আসে, ভিড়ের মান্ঝে এমন মানুষের থেকে ঠেলা ও গুঁতো খেতে হয়, নিজে দাঁড়ানো অবস্থায় এমন সব মানুষকে বসা অবস্থায় দেখতে হয়, যাদের কিনা তারা তাদের জীবনের অন্য সকল অঙ্গন থেকে নির্বাসিত করেছে সফলভাবে – নানা ধরনের প্রকাশ্য বা ছদ্ম ভৃত্য ভূমিকা ছাড়া। উবার-ওলার সাফল্যকে এই আঙ্গিকে দেখা প্রয়োজন। প্রথমতঃ।এর ফলে ‘পাবলিক’ থেকে নিজেকে স্থানিক-ভাবে আলাদা করা যায় – অর্থাৎ একই জায়গায় বসে যাতাওয়াত করতে হয় না, একই যানের মধ্যে বসে। দ্বিতীয়তঃ, পাবলিকের থেকে কালিক ভাবেই আলাদা হওয়া যায় – তাদের ২৪ ঘন্টা তত্পর পরিষেবার কারণে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যে সময় গনপ্রবহনের অপ্রতুলতার জন্য বেশি ঘোরাফেরা করতে পারে না, যেমন ধরা যাক গভীর রাত, এই শ্রেণী সেই সময়গুলিকে কেন্দ্র করে নিজেদের জীবনধারা সাজিয়ে নেয়। সমাজের কিছু পাত্র-পাত্রীর মধ্যে জনসাধারণের থেকে নিজেদের আলাদা করে স্থান-কালের মালিকানা নেবার যে মানসিক ইপ্সা, উবার-ওলারা সেই বৈকল্যের ইচ্ছা-নদীতে সাঁকোর কাজ করে।  তার উপর দিয়ে আমাদের মত কিছু মনুষ তরতরিয়ে চলে যায় ইপ্সিত ওপারে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, সুরক্ষিত ভাবে। বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি থেকে লেটনাইট পার্টি করে হিন্দুস্থান পার্কে ফেরত আশা হয়ে যায় জলভাত। শহরেরএলিটদের  জীবনে কিছু নতুন স্রোতের জন্ম হয়। কে কোথায় কখন কি ভাবে আসছে-যাচ্ছে, তাতে কারোর কিছু এসে যেত না, যদি না এই অর্থ-সমাজিক গোষ্টির প্রভাব ও প্রতিপত্তি তাদের সংখ্যার তুলনায় দৃষ্টিকটু ভাবে অনেক বেশি না হতো। কিন্তু বাস্তবে, তাদের উদ্বেগকে পাত্তা দেওয়া, তাদের সুরক্ষাকে সিরিয়াসলি নেওয়া, তাদের ইছাগুলিকে প্রশমিত করা হয়ে ওঠে  নগরের সরকারী ও বেসরকারী অধিপতিদের প্রথম কর্তব্য – কারণ যে মাছের মুড়ো এরা. তারই পেটি হলো উবার-ওলা শ্রেণী।  সংবাদমাধ্যমের বড় অংশও এই ক্ষুদ্র অংশের উদ্বেগ-সুরক্ষা ইত্যাদিকে এমন ভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে একটা ‘গণ’ চরিত্র দেবার চেষ্টা করে যে মনে হতেই পারে যে আমরা ইতিমধ্যেই একটি আর্থ-সামাজিক বৈষম্যহীন মিডিল ইনকাম সমাজে পরিণত হয়েছি।

এর একটি কুফল দেখা গেছে সম্প্রতি।  যখন ভারতে রাস্তা-ঘাটে নারী নিরাপত্তার মত একটি গুরুত্তপূর্ণ বিষয় নিয়ে বেশ একটা জনমত তৈরী তৈরী হচ্ছিল, উবারের একজন চালক দ্বারা এক মহিলা যাত্রীর ধর্ষিত হবার ফলে নারী নিরাপত্তা সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি এই প্রতাপশালী গোষ্টির উদ্বেগের জোরে পর্যবসিত হলো উবার গাড়ির নিষিদ্ধকরণ ও উবার চালকদের নিয়োগের আগে পূর্ব অপরাধ বিষয়ক খোজখবর নেওয়া গুরুত্ব ইত্যাদিতে। ভারতে, নারীদের এক বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের কাছে  ভাড়া করা বা নিজ মালিকানাধীন গাড়িতে একা চলাফেরার সুবিধে-বিপদ সংক্রান্ত যে আলোচনা, তা একদমই অপ্রাসঙ্গিক কারণে তাদের জীবনের বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই। অথচ ‘নারী নিরাপত্তার’ মোড়কে মিডিয়ায়ে আদতে চলল এলিট নারীদের নিরাপত্তার পুঙ্খানুপুন্ক্ষ আলোচনা।

যখনই সমাজের ক্ষমতাধারী ও গনপরিসরে-কি-আলোচিত-হবে-তা-নির্ণয়কারী গোষ্ঠীগুলি সর্বসাধারণের জন্য তৈরী পরিষেবাগুলি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তখন সেই সেই পরিষেবার মান নিম্নগামী হয়। কারণ পরিষেবাগুলি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিলেও সেই পরিসেবা চালনা সংক্রান্ত সকল ক্ষমতা এই গোষ্ঠীই কুক্ষিগত করে রাখে। তখন এদের নির্দেশে-উপদেশে সরকার যা করে তা হলো অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক ভাবে বন্টিত গণপরিষেবা থেকে অর্থ শুষে বার করে তারা ঢুকিয়ে দেয় এমন সব পরিষেবায় যা আপাত ভাবে সর্বসাধারণের জন্যে হলেও বাস্তবে কাজে লাগে মূলতঃ এলিট শ্রেনীর-ই। পূর্ব্বে উন্নত মানের এবং নির্ভরযোগ্য সংস্থা যেমন বৃহৎ সরকারী হাসপাতাল বা সরকারী ইস্কুল এই গোত্রে পড়ে। এলিট শ্রেণী এক-কালে এসব জায়গায় যেতো।  তারপর যখন তারা সরকারী ভর্তুকি ব্যবহার করে নিয়ম বদলিয়ে বেসরকারী পুঁজি দিয়ে এসব ক্ষেত্রে নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা করলো, তখন সরকারী সংস্থাগুলিতে তাদের আর কোন আগ্রহ রইলো না।  যে সর্বসাধারণের গরুর দুধ তারা রোজ খেতো এবং সেই কারণে বিচালি দিত, পরিষ্কার করত, সেই গরুর দুধ বেচে তারা তৈরী করলো নিজেদের মালিকিনাধীন গরুর  প্রাইভেট গোয়াল। কলকাতায়, টিবি হাসপাতাল ১ টাকা দিয়ে বেসরকারী সংস্থাকে বেছে তৈরী হলো কেপিসি হাসপাতাল।  ঢাকুরিয়ার এএমআরআই হাসপাতাল ও সরকারী মালিকানা থেক বেসরকারী মালিকানায় দেওয়া হলে ১ টাকার নাম-কে-ওয়াস্তে অঙ্কের বিনিময়ে।  শর্ত থাল এখানে একটা বড় শতাংশ বেদ থাকবে গরিবের জন্য সংরক্ষিত।  বলাই বাহুল্য, সেই সংরক্ষণ থেকে গেছে কাগজের পাতায়, এগ্রিমেন্টের দলিলে। আমি যেটা বলতে চাই সেটা এই যে ভারতে সরকারী হাসপাতাল বা ইস্কুলের মানের নিম্নগামী মানের সাথে এলিট শ্রেণীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নিজ বিকল্প করে তলার ব্যাপারটি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। দুটো আলাদা ঘটনা নয়। তাই আশঙ্কা হয়, হারত সরকারের জোরদার প্রাইভেট গাড়ি তৈরী ও বিক্রির ক্ষেত্রে নানা রকম আর্থিক উত্সাহপ্রদানের যুগে উবার-ওলার বিস্ময়কর ব্যবসায়িক সাফল্য দেশের মোটামুটি ভাবে চলনসই গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য কোন অশনি সংকেত বয়ে আনবে ? আরেকটু ব্যাপক ভাবে বলতে হলে, যে দেশ ও সমাজের শক্তিশালী নীতিনির্ধারক অংশ ব্যাপক গণ-মানুষের কোনরকম ছোয়া থেকে নিয়েজদের দূরে রাখতে চায়, এমন বৈসম্যযুক্ত সমাজপতি-ওয়ালা সমাজের ভবিষ্যত কি?

Leave a comment

Filed under বাংলা, Bengal, Democracy, Dhaka, Elite, Kolkata, Urbanity

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s